Book 1 || The Declaration of Independence of the United States of America by Thomas Jefferson




মেয়েদের ব্রতকথা

পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা-বিভাগ কর্তৃক প্রাইজ, লাইব্রেরী ও জনশিক্ষার জন্য অনুমোদিত।

INHIH

--

মেয়েদের

প্রত-কথা

লক্ষ্মী, ষষ্ঠী, চণ্ডী, কুমারী,- ত, সধবা-ব্রত, জিতাষ্টমী, মনসা-বত

প্রভৃতি বহুবিধ প্রয়োজনীয় এ‍ সম্বলিত।

আশুতোষ মজুমদার

দেব

সাহিত্য

কুটীর (প্রাঃ) লিমিটেড

মেয়েদের ব্রতকথা – আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

সম্পাদনা – অমিত ভট্টাচার্য

কথামুখ

প্রাচ্যতত্ত্ববিদ যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির উদ্ধৃতি দিয়েই শুরু করি—‘পূজা মাত্রই ব্রত, ব্রত মাত্রেই সংকল্প প্রধান। ব্রতধারণ দ্বারা আত্মার প্রসন্নতা হয়, চিত্তের সংযম অভ্যাস হয়, ইষ্টের প্রতি একাগ্র ভক্তি এবং সমুদয় নর-নারীর প্রতি উদার ভাব জাগ্রত হয়… ব্রত মাত্রেই দেবার্চনা আছে, দেবার্চনা মাত্রই ব্রত’ (বারোমাসে তেরো পার্বণ, বঙ্গদর্পণ, প্রথম, পৃ. ২৩৫ দ্রষ্টব্য)। ঋগবেদে ‘ব্রত’ পদটি কর্ম অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে একাধিকবার। হয়তো এর মূলে অভিপ্রায় ছিল, সব ধরনের কর্মই যেন যথাবিধি নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হয় (ঋগবেদ ২/৮/৩)। পরবর্তীকালে শাস্ত্রবিহিত নিয়ম ও উপবাসাদি লক্ষণান্বিত ধর্মাচরণকেই ব্রত বলা হল (অমরকোষ-টীকা দ্রষ্টব্য)।

বিবিদিষু পাঠক জানতে চাইতে পারেন ‘মেয়েদের ব্রতকথা’ নামকরণ কতদূর সংগত। বিশেষত আধুনিক যুগে মেয়েরা যখন পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে টক্কর দিয়ে ঘরে-বাইরে কর্মরতা এবং সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন তখন এই বিবিদিষা যে একেবারেই ভিত্তিহীন নয়—তা বলাই বাহুল্য। শাস্ত্রে তো স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্রতোদযাপনের কথাই বলা হয়েছে। স্বয়ং অগ্নি তো বশিষ্ঠকে বলেছিলেন লিঙ্গনির্বিশেষে ব্রত বিধেয়।

শাস্ত্রোদিত নিয়মকে ব্রত ও তপস্যা বলে। দমাদি ব্রতেরই বিশেষ বিশেষ নিয়ম। উপবাসাদি দ্বারা কর্তার সন্তাপ হয়—একারণে ব্রতকে তপ বলে এবং সকল ইন্দ্রিয়ের নিয়মন করে বলে ব্রতের নামান্তর নিয়ম। ব্রতানুষ্ঠানে দেবতারা প্রীত হয়ে ভুক্তি, মুক্তি প্রদান করেন। আমরা সহৃদয় পাঠককে মূল অগ্নিপুরাণে নিয়ে যাই, যেখানে অগ্নি-বশিষ্ঠের কথোপকথন সরাসরি উল্লিখিত:

তিথি-বারর্র্ক্ষ্যু-দিবস-মাসত্বব্দার্কসংক্রমে।
নৃ-স্ত্রীব্রতাদি বক্ষ্যামি বশিষ্ঠ শৃণু তৎ ক্রমাৎ
শাস্ত্রোদিতো হি নিয়মো ব্রতং তচ্চ তপো মতম।
নিয়মাস্তু বিশেষাস্তু ব্রতস্যৈব দমাদয়ঃ
ব্রতং হি কতৃসন্তাপাৎ তপ ইত্যভিধীয়তে।
ইন্দ্রিয়গ্রামনিয়মানিয়মশ্চাভিধীয়তে

অনগ্নয়স্তু যে বিপ্রাস্তেষাং শ্রেয়োভিধীয়তে।
ব্রতোপবাসনিয়মৈর্নানাদানস্তথা দ্বিজঃ
তে স্যুর্দেবাদয়ঃ প্রীতা ভুক্তি-মুক্তিপ্রদায়কা:।
(১৭৫তম অধ্যায়, ১-৫ শ্লোক)

সংক্ষেপে ব্রতাচরণ কীর্তি, সন্ততি, বিদ্যা, সৌভাগ্য, আরোগ্য, বৃদ্ধি এবং ভুক্তি ও মুক্তির জন্য সকলেরই অনুষ্ঠেয়। সুতরাং এহেন ব্রতানুষ্ঠান কেবল মেয়েদেরই অনুষ্ঠেয় এই ভাবনা কীভাবে সমাজে বদ্ধমূল হল!

লক্ষ্মণসেনের সভাপণ্ডিত গোবর্ধন আচার্য (দ্বাদশ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর আর্যাসপ্তশতীতে বলেছেন মেয়েরা হলেন বাড়ির শ্রী ‘গেহে শ্রীরিব’ (২০১)। আমার মনে হয়, নারীশিক্ষার প্রচলন যখন ছিল না তখনকার দিনে সময় কাটানো এক কঠিন সমস্যা ছিল বললে অত্যুক্তি হয় না। বর্তমান যুগের মায়েরা যেমন সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে সেই প্রতিষ্ঠানের সিঁড়িতে বসেই দিনের অনেকটা সময় কাটিয়ে দেন—অতীতে এরকমটি ছিল না। অথচ ভাববিনিময়ের জন্য, সংসারের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য অনেক পড়শির একত্রিত হওয়াও নিতান্ত জরুরি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ব্রত উদযাপনের মধ্যে দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যেরও বিকাশ হয়। আধুনিক বিজ্ঞানও শরীরের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে সমান বা ততোধিক গুরুত্ব দেয়।

নৈতিক আদর্শের গুরুত্বও ব্রতানুষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য। হাতে কাজ না থাকলে ঘুম পাওয়ার প্রসঙ্গ এনে রবীন্দ্রনাথ সহজপাঠেই বুঝিয়েছেন কাজের অপরিহার্যতা। সুচিন্তিত কল্যাণকর বিষয়ে মনকে নিবিষ্ট করতে পারলে মন-পাখি অচঞ্চল ও স্থির হয়। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট কাজ (ব্রত) উদযাপিত হলে এবং যথাসাধ্য আমন্ত্রিত অতিথি-অভ্যাগতের উপস্থিতিতে গৃহপ্রাঙ্গণ মুখরিত হলে যে আনন্দের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়—তাতে মেয়েদের ভূমিকাই মুখ্য হয়ে থাকে। ‘গৃহিণী গৃহমুচ্যতে’ বা ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ প্রভৃতি ভাবনাও পরিবারের সকলের মঙ্গলকামনায় মেয়েদের এগিয়ে রেখেছে।

একা খেয়ে যেমন আনন্দ নেই, একা থেকেও তেমন আনন্দ নেই। মানুষ মানুষকেই চায়, ব্রতানুষ্ঠান অপরকে পাওয়ার অনুষ্ঠান। বাড়ির কর্তারাও খুশিমনে মেয়েদের ব্যস্ত রাখতে এই ব্যাপারে দ্বিধা করতেন না। মেয়েরাও নির্দিষ্ট ব্রত উদযাপনে ইচ্ছাপূরণের সংকল্পে মেতে থাকতেন বরাবর। মেয়েদের ব্রতাচরণের সবচেয়ে খুশির দিকটা ছেলেবেলায় উপভোগ করতাম—যা কিনা এখনকার শৈশব অনতিক্রান্তরাও অনুভব করে থাকে। যেমন কখন ব্রতপারণ বা ব্রতসমাপ্তি বা ব্রতান্তভোজন হবে সেদিকে মুখিয়ে থাকা। ওই সাবু-নারকেল-দুধ-কলা মিশ্রিত মেনুটি বা দই-চিঁড়ে-ঘৃত-মধু মিশ্রিত মেনুটি কতই-না লোভনীয়! সত্যি কথা বলতে কী এই রেসিপি আজও বাজার মাতিয়ে রেখেছে। শেয়ার বাজারের ওঠাপড়া থাকলেও দশকর্মভান্ডারের বাড়বাড়ন্ত প্রত্যেকেরই নজর কাড়ে।

ব্রতকথা বাংলার লোকসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেসব দেবীর গরিমা এখানে বর্ণিত হয়েছে তাঁরা সকলেই পুরাণাদি শাস্ত্রে উল্লিখিত দেবী নন। প্রবাদপ্রতিম লোকসাহিত্যবিদ আশুতোষ ভট্টাচার্য স্মরণ করিয়েছেন, ‘ব্রতকথায় একই দেবতার দুইটি গুণ পরিকল্পিত হয়—অনিষ্ট করিবার শক্তি তাঁহার যেমন আছে, ইষ্ট করিবার শক্তি তাঁহার তেমনই আছে, কোন প্রকার অবহেলা করিলে তিনি যেমন ক্রুদ্ধ হইয়া অনিষ্টসাধন করিয়া থাকেন, আবার তাঁহাকে কোনরকমে প্রসন্ন করিতে পারিলে, তিনি তুষ্ট হইয়া প্রভূত কল্যাণসাধনও করিয়া থাকেন। দেবদেবী সম্পর্কিত এই বিশ্বাসই ব্রতকথার ভিতর দিয়া প্রচার করা হইয়া থাকে…অর্থাৎ দেবতা যখন ইষ্টসাধন করেন, তখন হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, গোয়ালে গোরু, মরাইয়ে ধান ইত্যাদিই বাড়িবে…এবং দেবতা যখন অনিষ্টসাধন করেন, তখন হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, গোয়ালে গোরু মরিবে, মরাইয়ে ধান শূন্য হইবে…অনেক ব্রত কেবলমাত্র ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া ব্যতীত আর কিছুই নহে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, বৈশাখ মাসে যে কয়টি প্রধান ব্রত উদযাপন করা হইয়া থাকে, যেমন—পুণ্যিপুকুরব্রত, অশ্বত্থপাতা ব্রত, পৃথিবী ব্রত ইত্যাদি সব কয়টিই ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া দ্বারা বৃষ্টিপাত করাইয়া ধরিত্রীর শস্যসম্পদ রক্ষা করিবার প্রবৃত্তি হইতে জাত’ (বাংলার লোকসাহিত্য, প্রথম খন্ড, পৃ. ৫০২-৫১২ দ্রষ্টব্য)।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সংকলিত মেয়েদের ব্রতকথা শীর্ষক গ্রন্থে লক্ষ্মী, মঙ্গলচন্ডী, ষষ্ঠী, মনসা প্রভৃতি ভেদে নারীদেবীর প্রসঙ্গ এসেছে। স্বভাবতই এদের উৎসসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়ে পুরাণসাহিত্যের দ্বারস্থ হয়েছি (পরবর্তী অনুচ্ছেদে বর্ণিত)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সংকলক কিন্তু সংস্কৃতবর্জিত সহজ গল্পকথার আদলে সমস্ত ব্রতকথা সংকলন করেছেন। কথ্যভাষায় সংকলিত হওয়ায় এবং সংস্কৃত মন্ত্রাদি অনুল্লেখের দরুন এগুলি সাধারণের কাছে সুবোধ্য এবং চিত্তাকর্ষক হয়েছে নি:সন্দেহে। তবে কুলকে কলঙ্করহিত করার দায়িত্ব কেবল মেয়েদের উপর ন্যস্ত করে যে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে—তা নি:সন্দেহে বলা চলে (কুলুই মঙ্গলবারের কথা)।

পাঠক প্রথমেই চলুন সূচিপত্র নির্দেশিত লক্ষ্মীর প্রসঙ্গে। লক্ষ্মীর সম্বন্ধে সাকুল্যে ছ-টি ব্রতকথা সংকলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘লক্ষ্মী, তুমি শ্রী, তুমি সৌন্দর্য, আইস, তুমি আমাদের হৃদয়-কমলাসনে অধিষ্ঠান করো। তুমি যাহার হৃদয়ে বিরাজ কর, তাহার আর দারিদ্র্যভয় নাই; জগতের সর্বত্রই তাহার ঐশ্বর্য। যাহারা লক্ষ্মীছাড়া, তাহারা হৃদয়ের মধ্যে দুর্ভিক্ষ পোষণ করিয়া টাকার থলি ও স্থূল উদর বহন করিয়া বেড়ায়। তাহারা অতিশয় দরিদ্র, তাহারা মরুভূমিতে বাস করে; তাহাদের বাসস্থানে ঘাস জন্মায় না, তরুলতা নাই, বসন্ত আসে না।

তুমি বিষ্ণুর গেহিনী। জগতের সর্বত্র তোমার মাতৃস্নেহ। তুমি এই জগতের শীর্ণ কঠিন কঙ্কাল প্রফুল্ল কোমল সৌন্দর্যের দ্বারা আচ্ছন্ন করিতেছ। তোমার মধুর করুণ বাণীর দ্বারা জগৎপরিবারের বিরোধ বিদ্বেষ দূর করিতেছ। তুমি জননী কিনা, তাই তুমি শাসন, হিংসা, ঈর্ষা দেখিতে পার না। তুমি বিশ্বচরাচরকে তোমার বিকশিত কমলদলের মধ্যে আচ্ছন্ন করিয়া অনুপম সুগন্ধে মগ্ন করিয়া রাখিতে চাও। সেই সুগন্ধ এখনি পাইতেছি; অশ্রুপূর্ণ নেত্রে বলিতেছি, ‘কোথায় গো! সেই রাঙা চরণ দুখানি আমার হৃদয়ের মধ্যে একবার স্থাপন করো, তোমার স্নেহহস্তের কোমল স্পর্শে আমার হৃদয়ের পাষাণ-কঠিনতা দূর করো। তোমার চরণ-রেণুর-সুগন্ধে সুবাসিত হইয়া আমার হৃদয়ের পুষ্পগুলি তোমার জগতে তোমার সুগন্ধ দান করিতে থাকুক!

এই যে তোমার পদ্মবনের গন্ধ কোথা হইতে জগতে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। চরাচর উন্মত্ত হইয়া মধুকরের মতো দল বাঁধিয়া গুন গুন গান করিতে করিতে সুনীল আকাশে চারিদিক হইতে উড়িয়া চলিয়াছে’! (রবীন্দ্ররচনাবলী, পঞ্চদশ খন্ড, পৃ. ৫৬)।

ব্রতপরায়ণার অবগতির জন্য জানানো প্রয়োজন যে, বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মীর ইঙ্গিত বেদ-এ পাওয়া যায়। ঋগবেদ-এ আছে স্ত্রী বা লক্ষ্মী তাঁর দক্ষিণে থাকেন (১/১৫৬/২)। পুরাণাদি শাস্ত্রগ্রন্থে লক্ষ্মীর উল্লেখ বহুবার হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ জানিয়েছে ব্রত হল বাঞ্ছিত সিদ্ধির বীজ ‘সর্ববাঞ্ছিতসিদ্ধীনাং বীজং জন্মনি জন্মনি’ (গণেশ খন্ড, ৪/৮২)। সেখানে নারায়ণ নারদকে মঙ্গলচন্ডীর উপাখ্যান শুনিয়েছেন। দক্ষা অর্থে চন্ডী এবং কল্যাণ অর্থে মঙ্গল। মঙ্গলকর বস্তুপ্রদানে দক্ষা বলেই ইনি মঙ্গলচন্ডী নামে প্রসিদ্ধা—

দক্ষায়াং বর্ততে চন্ডী কল্যাণেষু চ মঙ্গলম।
মঙ্গলেষু চ যা দক্ষা সা চ মঙ্গলচন্ডিকা
(ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্রকৃতিখন্ড, ৪৪/৩)

মতান্তরে পূজ্যাদের অন্যতমা বলে চন্ডী এবং মহীপুত্র মঙ্গলের আরাধ্যা তাই মঙ্গলচন্ডী। মতান্তরে সপ্তদ্বীপা পৃথিবীর অধীশ্বর মনুষ্যরাজ মঙ্গলের অভীষ্টদায়িনী এবং আরাধ্যা—এজন্য মঙ্গলচন্ডী। কৃপারূপিণী দুর্গাদেবীর মূর্তিভেদ মূলপ্রকৃতি ঈশ্বরী মঙ্গলচন্ডী। শোনা যায়, স্বয়ং মহাদেব ত্রিপুর-বধের জন্য তাঁর পূজা করেছিলেন। মহাদেবের স্তবে দেবী প্রীত হন। যে ব্যক্তি প্রতি মঙ্গলবারে একাগ্রচিত্তে মঙ্গলচন্ডী দেবীর স্তবগাথা শুনে থাকেন তার নিরন্তর মঙ্গল অবশ্যম্ভাবী। প্রথমবার মহাদেব, দ্বিতীয়বার মঙ্গলগ্রহ, তৃতীয়বার মঙ্গলরাজা এবং সর্বোপরি চতুর্থবারে মঙ্গলবারগুলিতে মায়েরা মঙ্গলচন্ডীর পূজা নিরবচ্ছিন্ন ধারায় বজায় রেখেছেন—

প্রথমে পূজিতা দেবী শিবেন সর্বমঙ্গলা।
দ্বিতীয়ে পূজিতা দেবী মঙ্গলেন গ্রহেণ চ
তৃতীয়ে পূজিতা ভদ্রে মঙ্গলেন নৃপেণ চ।
চতুর্থে মঙ্গলে বারে সুন্দরীভিশ্চ পূজিতা
(ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্রকৃতিখন্ড, ৪৪/৩৭-৩৮)।

দেবর্ষি নারায়ণের কাছে জানতে চেয়েছেন যথাক্রমে মঙ্গলচন্ডী, ষষ্ঠী, মনসা প্রমুখ দেবীদের চরিত্র। তাঁদের নামের এবং পূজনের মাহাত্ম্য। নারায়ণ বলে চলেছেন। ষষ্ঠী হলেন বালকগণের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বিষ্ণুমায়া প্রকৃতির ষষ্ঠকলা বলে ষষ্ঠী নামে সম্বোধিতা হয়েছেন। এই দেবী নিরন্তর শিশুসান্নিধ্যে থাকতেই পছন্দ করেন। প্রিয়ব্রত নামে স্বায়ম্ভূব মনুর পুত্রকে ষষ্ঠী জানিয়েছেন যে, তিনি ব্রহ্মার মনসিজা। বিধাতা আপন মন থেকে তাকে সৃজন করে কার্তিককে সম্প্রদান করেছেন। ইনি ষোড়শমাতৃকার মধ্যে স্কন্দপত্নী সুব্রতা দেবসেনা নামে এক মাতৃকা। জগতে ষষ্ঠী হল এঁরই নামান্তর। ইনি নি:সন্তানকে সন্তান, দরিদ্রকে ধনসম্পদ এবং কর্মহীনকে কর্ম প্রদান করে থাকেন। রাজা প্রিয়ব্রত প্রতিমাসের শুক্লপক্ষীয় ষষ্ঠী তিথিতে মহামহোৎসবে তাঁর রাজ্যে ষষ্ঠীদেবীর আরাধনায় নিজে যেমন উদ্যোগী হন তেমন প্রজাবৃন্দকে নবজাতকের কল্যাণকামনায় ষষ্ঠ এবং একবিংশতি দিনে শ্রদ্ধা সহকারে ষষ্ঠীদেবীর পূজার নির্দেশ দেন। সুতরাং সন্তানের কল্যাণার্থে ‘ওঁ হ্রীং ষষ্ঠীদেব্যৈ স্বাহা’ এই আট অক্ষরবিশিষ্ট মহামন্ত্র প্রবর্তিত হল—

ব্রহ্মণো মানসী কন্যা দেবসেনামীশ্বরী।
সৃষ্টা মাং মনসো ধাতা দদৌ স্কন্দায় ভূমিপ
মাতৃকাসু চ বিখ্যাতা স্কন্দসেনা চ সুব্রতা।
বিশ্বে ষষ্ঠীতি বিখ্যাতা ষষ্ঠাংশা প্রকৃতের্যতঃ
অপুত্রায় পুত্রদাহং প্রিয়দাত্র্যপ্রিয়ায় চ।
ধনদা চ দরিদ্রেভ্যোকর্মিণে শুভকর্মদা
(ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্রকৃতিখন্ড, ৪৩/২৫-২৭)।

প্রাচীনকালে জলাজঙ্গল পরিবেষ্টিত ভূভাগে সর্পভীতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। সাপের কামড়ে মৃত্যু আকছার হত বলে প্রজাকল্যাণে ব্রতী কশ্যপমুনি প্রজাপতি ব্রহ্মার আদেশে বেদোক্ত বীজানুসারে মন্ত্র সৃজন করলেন। মন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনসা ধ্যানকালে কশ্যপ মুনির মন থেকে উৎপন্ন হওয়ায় ‘মনসা’ নামে প্রসিদ্ধ হন। বিষহরণে সমর্থা বলে ইনি ‘বিষহরী’, মহাদেবের কাছে সিদ্ধিযোগ লাভ করায় ‘সিদ্ধযোগিনী’, আস্তিকমুনির জননী হওয়ায় ‘আস্তিকমাতা’, মুনিশ্রেষ্ঠ যোগীবর জরৎকারুর স্ত্রী বলে ইনি ‘জরৎকারুপ্রিয়া’ (ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্রকৃতিখন্ড, ৪৫-৪৬তম অধ্যায়)।

পরবর্তীকালে ‘আপন মনের মাধুরী মিশায়ে’ এই সমস্ত দেবীদের কাহিনির বহুল প্রচারের জন্য লোকজীবনকে স্পর্শ করে বিবিধ আভানক বর্ণিত হয়েছে। যেমন মা মনসা বলছেন, তিনি ফণীমনসা গাছে সর্বদা অধিষ্ঠান করেন। দশহরা ও নাগপঞ্চমীর দিনে ওই গাছ এনে যেন তাঁর পূজা করা হয় ইত্যাদি। পাঠক সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, লক্ষ্মী, মঙ্গলচন্ডী, ষষ্ঠী প্রভৃতি দেবীদের রকমফের এবং লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, সকল ব্রতকথারই মূল অভিপ্রায় আত্মকল্যাণের সঙ্গে পারিবারিক কল্যাণ। দুঃখের দুর্গম পথে প্রতিনিয়ত জর্জরিত মানুষ দেবীদের ভরসার আধাররূপে কল্পনা করেছেন মানবজীবনকে ঋদ্ধ করবার বাসনায়। আমার প্রতিবেশিনী অমুক ব্রত উদযাপন করে এই পেয়েছেন, এর যে কত সুদূরপ্রসারী ফল—তা ব্রতকথার আভানকেই স্পষ্ট।

কাঁথা, কুঁড়েঘর, সাত ছেঁড়া কাপড়, ময়লা চিরকুট চাদর, দরিদ্রদশা, একবেলা দুটি মুড়ি, একবেলা দুটি শাক-ভাত এধরনের দুর্দশা থেকে বর মেগে নেওয়া আবার ব্রত সমাপনে দুঃখু ঘুচে যাওয়া এবং সর্বোপরি দেবীর কৃপায় রাজা-রাণী হওয়া—প্রভৃতি অতিকষ্টে অন্ন জোটানো মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। এ ছাড়া খুদকুঁড়ো, লাউপাতা, লাউ, কলাগাছ, কলমিশাক, তিলফুল, ডালিম গাছ ধানের খেত, সরষের খেত, কড়াইসুঁটির খেত, পান্তাভাত, গোয়ালকাড়া, গোরু-ছাগল চরানো, হাল-হেলে কিনে দেওয়া, বীজধান নিয়ে যাওয়া, ক্ষেত্রদেবীকে মনপ্রাণে ডাকা, তেল-হলুদ মাখা, পুকুরপাড়ে হাঁড়ি রেখে নাইতে যাওয়া, নদীতে জাল ফেলা, চারিদিকে সাপের ফোঁস ফোঁস, কলা পেটোর ডিঙ্গি, মানের পাতা, গোয়ালের পেছনের ছাইগাদা, হাঁটুর ভেতর হাত গলিয়ে খেতে বসা, বনজঙ্গল, বাঘ-ভালুকের ভয়, বাঁশপাতা, উনুন জ্বালা—প্রভৃতি নি:সন্দেহে গ্রাম্য লোকজীবনের চিত্রপট।

একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, ব্রতকথার উদ্ভব আমজনতার কথা ভেবে। কিন্তু এর চৌহদ্দি ক্রমসম্প্রসারিত হয়ে সবশ্রেণির মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে কেবলমাত্র কথকতার গুণে। জাতপাতের আবেগ দিয়ে নয়, সমৃদ্ধকামী মানুষের কাছে কেবল বিশ্বাসের ডানায় ভর করে আভানকগুলি যে বিপুলভাবে জনসম্মোহনে একশোভাগ সফল তা নির্দ্বিধায় বলা চলে। হবেই না বা কেন! চিঁড়ে, মুড়ি, মুড়কি, খই, দুধ, দই, ছাতু, নাড়ু, কলা, পিটে, পাটালি, সন্দেশ, নারকেল, মুগকলাই, চালভাজা, দুধের সর, ফলার, গঙ্গার তীর—বিশেষ বিশেষ তিথিতে মাঝে-মধ্যে এসবে কে-না তৃপ্ত হন! রাজা, রানি, কোটাল, সন্ন্যাসী, গয়লা, ময়রা, কামার, নাপতিনী, শ্বশুর-শাশুড়ি, বউমা, বউঠাকরুন, ঝাড়ুদার, বনকন্যা, সওদাগর, কবিরাজ, পুরোহিত, কর্তা, গিন্নি, নাতি, নাত-বউ, ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণী, ঝি, কানা, খোঁড়া ভেদে সকল শ্রেণির মানুষ ব্রতকথায় স্থান করে নিয়েছে। ব্রতকথার ফলাফল একারণে আমাদের সমাজের মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা আরোপ করে।

তবে ব্রতকথাকার দক্ষিণাদানের প্রসঙ্গে যেভাবে সোনা, রুপা দানের কথা বলেছেন বর্তমানে তা আমাদের সাধ্যের বাইরে। যেমন সোনার বেলপাতা (শিবব্রত), সোনার বেল (পুণ্যিপুকুর ব্রত), সোনার পাতা পাঁচটি (অশ্বত্থপাতা ব্রত), সোনা বা রুপার চরণ (হরির চরণ ব্রত), একছড়া সোনার কলা (কলাছড়া ব্রত), সোনার পদ্মপাতা (পৃথিবী ব্রত) প্রভৃতি। অভাবে কাঞ্চনমূল্য দানও গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষের কাছে অসম্ভব বললেই চলে। তথাপি ‘অভাবে দাম ধরে দিতে হয়’ ঘোষণায় (পৃথিবী ব্রত) মানুষজন স্বস্তি পান এবং বৈকল্পিক ব্যবস্থায় নমনীয় মনোভাবের পরিচয়ে তৃপ্ত হন। সত্যি কথা বলতে কি জুতো, ছাতা, কাপড়, চাদর, গামছা, পাঁচনবাড়ি এসব দিয়েই ইদানীংকালে ‘নমো নমঃ’ করে ব্রত উদযাপিত হয়ে থাকে।

পরিশেষে বলি, আলপনা-সজ্জিত গৃহাঙ্গনে নৈবেদ্যর ডালা সাজিয়ে যথাশক্তি ব্রতোৎসবে কৃতাঞ্জলিপুটে মায়েরা যখন গরদের লালপেড়ে শাড়িতে (অভাবে সাধারণ সাদাজমির লালপেড়ে শাড়িতে) সমগ্র পরিবারের ভুক্তি-মুক্তি প্রার্থনা করেন—তখন তা ব্যক্তি বা পরিবার বিশেষকে ছাপিয়ে এক নৈর্ব্যক্তিক আনন্দের জন্ম দেয়—যা যুক্তিতর্কের সীমারেখার অনেক অনেক দূরে। সুতরাং ‘নীতিযুক্তং মনোহরং বচনং শ্রুতিসুন্দরম’ পাঠের জন্য আমরা প্রবৃত্ত হই। বন্দে ব্রতকথাম।

অমিত ভট্টাচার্য

ভূমিকা

ধর্মগত-প্রাণা হিন্দু ললনাগণ ধর্ম ও অর্থ কামনায় আজীবন নানাবিধ ব্রত-নিয়মের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। ব্রত শব্দের অর্থ পাপক্ষয়কর পুণ্যজনক নিয়ম। এই নিয়মের বশবর্তী হইয়া আমাদের গৃহলক্ষ্মীগণ নানাবিধ পুণ্যকর্ম করিয়া গৃহের অশেষ মঙ্গলসাধন করিয়া থাকেন। তাঁহারা স্বামী-পুত্র লইয়া সুখে সংসার করিবেন বলিয়া, বাল্যে—কুমারী অবস্থা হইতেই—শিবপূজা, পুণ্যিপুকুর, যমপুকুর, গোকুল, হরির চরণ, সেঁজুতি প্রভৃতি নানারূপ ব্রত করিয়া থাকেন। বিবাহের পর—এয়ো সংক্রান্তি, অক্ষয় সিন্দূর, গুপ্তধন, ফলগচানে প্রভৃতি পুণ্যব্রত করেন। কিন্তু ইহাতেও তাঁহাদের ধর্ম-জীবনের আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত হয় না। তখন তাঁহারা সাবিত্রী, পঞ্চমী, তালনবমী, দূর্বাষ্টমী, অনন্তচতুর্দশী প্রভৃতি শাস্ত্রসংগত বৃহৎ যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া জীবন সার্থক জ্ঞান করেন। এতদ্ভিন্ন লক্ষ্মীপূজা, ষষ্ঠীপূজা, মঙ্গলচন্ডী, ইতু, সো-দো, মনসা প্রভৃতি নৈমিত্তিক নানাবিধ ব্রত অর্চনাদি করিয়া তাঁহাদের হৃদয় ধর্মময় করিয়া থাকেন।

সুতরাং দেখা যাইতেছে আমাদের দেশের কুললক্ষ্মীগণ আমাদেরই মঙ্গলের নিমিত্ত চিরকাল কুমারী অবস্থা হইতেই আজীবন নিত্য নিত্য নানাবিধ পুণ্যব্রত করিয়া সংসারে সুখ ও শান্তি স্থাপনা করিয়া আসিতেছেন। এই ব্রত-নিয়ম-উপবাস অবলম্বনে হিন্দু রমণীগণ বাল্যকাল হইতেই স্বামীভক্তি, গুরুভক্তি, ধর্মে বিশ্বাস, গৃহধর্মে আস্থা, ইন্দ্রিয় সংযম প্রভৃতি সদগুণ শিক্ষা করিয়া সচ্চরিত্রা ও পতিপরায়ণা হইয়া থাকেন। তাঁহাদের চরিত্র গঠনের নিমিত্ত আর্যঋষিগণ এই সকল ব্রতের উপদেশপূর্ণ শাস্ত্রীয় কথার সৃষ্টি করিয়াছেন; আর কতকগুলি সুধামাখা নীতিপূর্ণ কথা ব্রতপরায়ণা রমণীগণের দ্বারাই রচিত হইয়াছে। এই সমস্ত মেয়েলি কথা শুনিয়া রমণীগণের চিত্ত অধিকতররূপে ব্রত উপবাস করিতে অগ্রসর হয়। ইহার পুণ্য-কাহিনিতে অবলা-হৃদয় স্বতঃই ভক্তিরসে উচ্ছ্বসিত হইয়া থাকে।

সুতরাং এই ব্রতকথাগুলির রচনা-কৌশল ও রহস্য, ইহার আভ্যন্তরিক মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস, বৈচিত্র্য ও মূলতত্ত্ব আলোচনা করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, এক ব্রত ভিন্ন অবলা রমণীর হৃদয় ধর্মময় করিবার ও চরিত্র গঠন করিবার অন্য উপায় নাই। তাঁহাদের হৃদয়ে ধর্ম ও নীতি শিক্ষা দিবার নিমিত্ত আধুনিক কিণ্ডারর্গাটেন প্রণালী শিক্ষার মতো আমাদের পূর্বপুরুষগণ বহুপ্রাচীনকাল হইতে এই ব্রতপদ্ধতির নিয়ম প্রচলন করিয়া গিয়াছেন। সেগুলিকে অবজ্ঞার চক্ষে দেখা বা উপেক্ষা করা কোনো হিন্দু সন্তানেরই কর্তব্য নহে। এই অপূর্ব শিক্ষারীতির গুণেই আমাদের সংসার এত সুধাময় হইয়াছে। গৃহে গৃহে আনন্দস্রোত প্রবাহিত করিবার পক্ষে সমাজবিহিত চিরন্তন এমন সুন্দর প্রথা আর কোনো দেশে নাই।

কিন্তু দুঃখের বিষয় কালের স্বধর্মে ইহার গতি অন্যরূপ হইতেছে। ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব এক্ষণে আমাদের অন্তঃপুরে প্রবেশলাভ করিয়াছে। ইহার বিষময় ফলে হিন্দু রমণীগণের ধর্মানুষ্ঠান ক্রমশ শিথিল হইয়া আসিতেছে। ধর্ম ও পুণ্য অর্জনের একমাত্র উপায়স্বরূপ বার-ব্রত-নিয়মাদি আমাদের দেশ হইতে ক্রমশ লোপ পাইতে বসিয়াছে। পুরোহিত-সাপেক্ষ যাজ্ঞিক ব্রতের শাস্ত্রীয় সংস্কৃত কথা আছে; কিন্তু লক্ষ্মী, মনসা, ইতু, সো-দো, ষষ্ঠী প্রভৃতি পারিবারিক ব্রতের মেয়েলি কথাগুলি এক্ষণে বিস্মৃতির গর্ভে নিমজ্জিত হইতে বসিয়াছে। এই সকল মেয়েলি কথায় অভিজ্ঞা প্রাচীনা রমণী এক্ষণে আর দেখিতে পাওয়া যায় না। সেকালে কত প্রাচীনা গৃহিণী, ব্রতপরায়ণা রমণীবৃন্দে পরিবেষ্টিতা হইয়া, বৃহৎ অঙ্গনে ব্রতকথা শুনাইতেন। পল্লির কত ব্রতপরায়ণা শুদ্ধান্তচারিণী মহিলা এসকল কথা শ্রবণ করিবার নিমিত্ত উৎকর্ণ হইয়া সমস্ত দিন উপবাস করিয়া বসিয়া থাকিতেন। হায়, সেদিন আর নাই! এক্ষণে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে সমস্ত লোপ পাইতে বসিয়াছে। কিছুদিন পরে ইহার কণামাত্রও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। লুপ্তপ্রায় এই ব্রতকথাগুলিকে ধ্বংসের হস্ত হইতে উদ্ধার করাই বর্তমান গ্রন্থের উদ্দেশ্য।

এই সমস্ত ব্রতকথা সংগ্রহ করিতে কতদূর কৃতকার্য হইয়াছি তাহা বলিতে পারি না। কারণ এই সমস্ত মেয়েলি কথা এক-এক দেশে এক-এক প্রকার। বিশেষত পূর্ববঙ্গের সঙ্গে এদশের কথার আদৌ মিল নাই। এমনকি ব্রতের নাম ও পদ্ধতি পর্যন্ত স্বতন্ত্র। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রমণীগণের দ্বারা রচিত হইয়াছে বলিয়া ইহা বিভিন্নাকার ধারণ করিয়াছে। তজ্জন্য আমি হুগলি, বর্ধমান, যশোহর, রাজশাহি, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কামাখ্যা প্রভৃতি বহু-স্থান হইতে এই সমস্ত কথা সংগ্রহ করিয়া উপদেশ ও নীতিপূর্ণ কথাগুলি নির্বাচন করিয়া লিপিবদ্ধ করিলাম।

সংগৃহীত কথাগুলি ভিন্ন ভিন্ন বিভাগে বিভক্ত করা হইয়াছে; যেমন লক্ষ্মীর কথার মধ্যে ভাদ্র, কার্তিক, পৌষ, চৈত্র, কোজাগরী প্রভৃতি সমস্ত লক্ষ্মীর কথা একস্থানে সন্নিবেশিত হইয়াছে। এইরূপ মঙ্গলচন্ডীর অন্তর্গত হরিষ মঙ্গলচন্ডী, জয় মঙ্গলবার, বারোমেসে মঙ্গলচন্ডী প্রভৃতি প্রদত্ত হইয়াছে। ষষ্ঠীর মধ্যে অরণ্য ষষ্ঠী, চাপড়া ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী, অশোক ষষ্ঠী প্রভৃতি সমস্ত ষষ্ঠী একস্থানে সজ্জিত হইয়াছে। অবশিষ্ট কথাগুলি বিবিধ শিরোনামে সন্নিবেশিত হইয়াছে; যেমন—মনসা, ইতু, অমাবস্যা, পূর্ণিমা প্রভৃতি।

ব্রতকথাগুলিকে দিব্য আভরণে সজ্জীকৃত করিবার মানসে কতকগুলি সুন্দর সুন্দর হাফটোন চিত্র প্রদত্ত হইয়াছে। এই পুস্তকখানির অঙ্গসৌষ্ঠবের নিমিত্ত যত্ন, পরিশ্রম ও অর্থব্যয় কিছুরই ত্রুটি করা হয় নাই। এক্ষণে যাঁহাদের জন্য এই গ্রন্থখানি রচিত হইল, সেই পতিপরায়ণা লক্ষ্মীস্বরূপা রমণীগণের নিকট আদৃত হইলেই শ্রম সফল জ্ঞান করিব।

গ্রন্থকার

.

লক্ষ্মীপূজা প্রায় প্রত্যেক মাসেই হইয়া থাকে। বৃহস্পতিবারই লক্ষ্মীপূজার প্রশস্ত দিন। অনেকে রবিবারেও করিয়া থাকেন। কোজাগরী ও কার্তিক মাসের পূজা রাত্রিকালে যথাদিনে হইয়া থাকে। আমাদের দেশে সাধারণত নিম্নলিখিত মাসে মা লক্ষ্মীর পূজা হইয়া থাকে:

ভাদ্র মাস
কার্তিক মাস (অমাবস্যা রাত্রিতে)
পৌষ মাস
চৈত্র মাস
কোজাগরী (আশ্বিন পূর্ণিমার রাত্রিতে)
ক্ষেত্র ব্রত (অগ্রহায়ণে)।

ভাদ্র মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা

প্যাঁচা-প্যাঁচির গল্প

এক ব্রাহ্মণী আর তার একটি ছেলে ছিল। ব্রাহ্মণী বিধবা, কাটনা কেটে খান, আর ছেলেটিকে মানুষ করেন। অতিকষ্টে দিন যায়, কোনো রকমে শাক-ভাত খেয়ে জীবন ধারণ করেন। ব্রাহ্মণীর বাড়ির সামনে পুকুর ধারে একটি অশ্বত্থগাছ ছিল। ছেলেটি ওই গাছতলায় এসে রোজ খেলা করত। একদিন এক গয়লা ওইখান দিয়ে ক্ষীর বেচতে যাচ্ছিল। ছেলেটির ক্ষীর খাবার ভারি ইচ্ছে হল। সে গয়লাকে তার মার কাছে ডেকে নিয়ে এসে বল্লে, ‘মা, গয়লা ক্ষীর বেছতে এসেছে, আমায় একটি পয়সা দাও না মা, আমি ক্ষীর কিনে খাব। ব্রাহ্মণী বল্লেন, ‘কোথায় পাব বাবা, পয়সা থাকলে কি দিই না বাবা।’ ছেলেটি বড়ো কান্নাকাটি করতে লাগল, কিছুতেই শুনলে না। ব্রাহ্মণী কত খুঁজে পেতে কাটনার ডালা থেকে চার কড়া কড়ি দিলেন। ছেলেটি ওই চার কড়া কড়ি নিয়ে গয়লার কাছে গিয়ে বললে, ‘এই চার কড়া কড়ি নিয়ে আমাকে একটু ক্ষীর দাও না ভাই।’ গয়লা বললে, ‘চার কড়া কড়ির ক্ষীর কেমন করে দিই ভাই?’ ছেলেটি বললে, ‘দাও ভাই, দাও।’ কথা বলতে বলতে গয়লা তাকে এক ভাঁড় ক্ষীর দিলে। ছেলেটি ক্ষীর নিয়ে আহ্লাদে ওই গাছতলায় গেল। গাছে প্যাঁচাপ্যাঁচির দুটি ছানা ছিল। প্যাঁচাপ্যাঁচি চরতে গেছে, ছানা দুটি খিদেয় ছটফট করছে আর চেঁচাচ্ছে। ছেলেটি এই না-দেখে, ছানাদের গাছ থেকে পেড়ে ক্ষীর খাওয়ালে। তারপর তাদের মুখ মুছিয়ে আবার গাছে তুলে রাখলে। নেবে এসে যে ক্ষীরটুকু ছিল সেইটুকু আপনি খেলে। সন্ধ্যাবেলা প্যাঁচাপ্যাঁচি চরে এসে ছানাদের জিজ্ঞাসা করলে, ‘হ্যাঁরে, তোরা যে বড়ো আজ খিদেয় চিঁ চিঁ কচ্ছিস না? একটিও কথা কচ্ছিস না? কী হয়েছে বল?’ তখন ছানারা বললে, ‘মা, ওই যে ব্রাহ্মণের ছেলে রোজ খেলা করতে আসে, সে আজ আমাদের খুব ক্ষীর খাইয়েছে। বড়ো পেট ভরেছে, কথা কইতে পারি না। ওরা বড়ো গরিব মা, ওদের ভালো করতে হবে। ব্রাহ্মণের জিনিস খেয়ে থাকতে নেই, ওদের কিছু দাও মা।’

তখন প্যাঁচি বললে, ‘আর ওদের কষ্ট থাকবে না, মা লক্ষ্মীকে বলে ওদের ভালো করব।’ প্যাঁচাপ্যাঁচি রোজ ভোরবেলায় মা লক্ষ্মীর বাগানে চরতে যায়, আর সন্ধেবেলায় বাসায় আসে। ব্রাহ্মণীর ছেলে প্রায় রোজই কিছু-না-কিছু ওই ছানাদের খাওয়ায়। কোনো দিন চালের পিটুলি, কোনো দিন ডালবাটা, কোনো দিন একটু দুধ, এইসব জিনিস এনে, রোজ গাছে উঠে ছানাদের খাইয়ে আসে। প্যাঁচাপ্যাঁচি দেখলে বাস্তবিকই ওই ব্রাহ্মণের ছেলে ছানাদের বড়ো যত্ন করে।

ভাদ্র মাস, শুক্লপক্ষ, বৃহস্পতিবার, ব্রাহ্মণী অনেক দুঃখকষ্ট করে সেদিন মা লক্ষ্মীর পূজা করেছে। ছেলেটি মা লক্ষ্মীর প্রসাদ নিয়ে সেই গাছতলায় গিয়ে ছানাদের খাওয়ালে। সেদিন ছানারা পেট ভরে নানা রকম ফল খেলে, ক্ষীরের পিটুলি খেলে, দুধ খেলে; খেয়ে চুপ করে দুজনে বসে রইল। প্যাঁচাপ্যাঁচি আসতেই ছানারা বললে, ‘তোমরা দুজনে ওর কিছুই করলে না। ওই যে গরিব ব্রাহ্মণের ছেলে, রোজ রোজ আমাদের কত জিনিস এনে খাওয়াচ্ছে, তা তোমরা ওদের কোনও উপকার করলে না। যাও তোমাদের সঙ্গে আর আমরা কথাও কব না, কিছু খাবও না।’ তখন প্যাঁচা বললে, ‘আচ্ছা বাবা, আর তোমরা রাগ করো না, এইবার ওদের দুঃখ দূর হবে। নারায়ণের দয়া হয়েছে। ওর মা আজ লক্ষ্মীপূজা করেছে, আর ওদের কষ্ট থাকবে না।’ প্যাঁচি বললে, ‘কাল সকালবেলা যখন এই গাছতলায় ছেলেটি খেলা করতে আসবে, তখন আমায় বোলো।’

তার পরদিন সকাল হল, যেমনি ছেলেটি গাছতলায় খেলা করতে এসেছে, অমনি ছানারা চেঁচিয়ে উঠল, ‘মা, ওই ছেলেটি এসেছে।’ তখন প্যাঁচি তাকে ডেকে বললে ‘ও বাছা! তুমি এদিকে এসো।’ ছেলেটি প্যাঁচির কাছে গেল, যেতেই প্যাঁচি বললে, ‘আর তোমাদের কষ্ট থাকবে না, এইবার তোমাদের দুঃখ দূর হবে। তোমাকে আজ এক জায়গায় নিয়ে যাব, সেখান থেকে একটি জিনিস আনলেই বড়ো মানুষ হবে।’ ছেলেটি বললে, ‘আচ্ছা’। প্যাঁচি বললে, ‘তুমি আমার পিঠের উপর চোখ বুজে বসো। আমি তোমাকে যেখানে নিয়ে যাব, সেখানে কেউ যদি তোমাকে ধনদৌলত দিতে চায়, তুমি নিও না। যখন বলবে তুমি কী নেবে? তখন তুমি বলো যে আমি তিল-ধুবড়ি নেব। তখন তিনি তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। যেখানে দেখবে আলপনা দেওয়া, তির পোঁতা, ঘট পাতা, চৌকির উপর একটি পুঁটুলি আছে; সেই পুঁটুলিটি নিয়ে আমার কাছে আসবে। আমি তোমাকে আবার এখানে পিঠে করে নিয়ে আসব। ওই পুঁটুলিটি এনে রোজ পূজা করলেই বড়ো মানুষ হবে।’

এই কথা বলে প্যাঁচি ছেলেটিকে পিঠে করে মা লক্ষ্মীর বাগানে নিয়ে গেল। যেখানে লক্ষ্মী ও নারায়ণ বসে আছেন সেইখানে ছেলেটিকে নামিয়ে দিলে। সে লক্ষ্মী ও নারায়ণকে দেখে, গলায় কাপড় দিয়ে, ভূমিষ্ঠ হয়ে, ঠুক করে একটি প্রণাম করে জোড় হাতে দাঁড়িয়ে রইল। মা লক্ষ্মীর বড়ো দয়া হল—বললেন, ‘তুমি কে বাছা? কী চাও, এখানে কেন এলে?’ ছেলেটি বললে, ‘মা, আমি বড়ো গরিব, তিল-ধুবড়ি নিতে এসেছি, যদি দয়া করে দাও মা!’ লক্ষ্মী তখন তাকে সঙ্গে করে যত ধনদৌলত দেখাতে লাগলেন, বললেন, ‘এইসব ধন আছে, তুমি যত পারো নিয়ে যাও।’ ছেলেটি বললে, ‘না মা! আমি ওসব কিছুই চাই না, আমি তিল-ধুবড়ি নেব।’ মা লক্ষ্মী বললেন, ‘তবে তিল-ধুবড়ি নেবে চলো।’ যেখানে তিল-ধুবড়ি ছিল সেখানে গিয়ে মা লক্ষ্মী বললেন, ‘এই নাও তিল-ধুবড়ি। একে রোজ পূজা করো, তাহলে খুব বড়ো মানুষ হবে।’ ছেলেটি মা লক্ষ্মীকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে তিল-ধুবড়ি নিয়ে প্যাঁচির কাছে এল। প্যাঁচি তাকে পিঠে করে এনে তার বাড়ির কাছে নামিয়ে দিলে। ছেলেটি বাড়িতে এসে তার মাকে বললে, ‘মা শীঘ্র স্নান করে এসো। তিল-ধুবড়ি পূজা করতে হবে।’ মা স্নান করে এলেন, ঘরে গঙ্গাজল ছড়িয়ে, ঘট পেতে, পিঁড়িতে আলপনা দিয়ে, তার উপরে তিল-ধুবড়ি রেখে, মায়ে-পোয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। তারপর ধূপ-ধুনা জ্বেলে নৈবেদ্য করে ভক্তিভরে দুজনে পূজা করলেন। মা বললেন, ‘এ তুমি কোথায় পেলে?’ ছেলে বললে, ‘মা ওই গাছে প্যাঁচাপ্যাঁচি থাকে, ওরা লক্ষ্মী-নারায়ণের বাগানে রোজ চরতে যায়। আজ আমাকে পিঠে করে নিয়ে গেছল। মা লক্ষ্মী দয়া করে এই তিল-ধুবড়ি দিলেন। রোজ পূজা করতে বলেছেন, তাহলে আমাদের দুঃখ ঘুচবে।’ এই কথা শুনে মার আরও ভক্তি হল, ছেলেকে চুমু খেয়ে বললেন, ‘একথা কাকেও বলো না বাবা।’ ছেলে বললে, ‘না মা, যে কষ্ট করে এনেছি, একথা আর কি কাউকে বলি!’

ব্রাহ্মণী রোজ সকালে উঠে ছড়া ঝাঁট দিতে লাগলেন, ঘর, দরজা ধুয়ে পরিষ্কার করে সাঁজে সকালে ধুনো দিতে লাগলেন। এই রকমে ভক্তিভরে দুজনে রোজ রোজ তিল-ধুবড়ি পূজা করে প্রণাম করেন। ক্রমে মা লক্ষ্মীর দয়া হল। তাঁর কৃপাদৃষ্টিতে ঘরবাড়ি, জায়গা, জমি, পুকুর, দালান হল। ক্রমে হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, গাড়ি-জুড়ি, টাকা-কড়ি, ধনদৌলত, লোকজন, চাকর-বাকর প্রভৃতি রাজার মতন অতুল ঐশ্বর্য হল। পাড়ার লোকে বলতে লাগল এরা কী করে এত বড়োমানুষ হল। সকলেই সন্ধানে থাকে কিন্তু কেউ কিছুই ঠিক করতে পারলে না। তখন সকলে মনে মনে ঠিক করলে, ওই পুঁটুলিটির এত গুণ, তা না-হলে রোজ এত ঘটা করে পুঁটুলিটির পূজা করে কেন? নিশ্চয়ই ওই পুঁটুলি হতে ওদের এত সুখ হয়েছে। ক্রমে এই কথা রাজার কানে উঠল। রাজা ভাবলেন, তাইত গরিব ব্রাহ্মণ এত বড়োমানুষ হল, দেখচি আমার রাজত্বও দিন কতক পরে কেড়ে নেবে। আর নিশ্চিন্ত থাকা ভালো নয়। এই ঠিক করে রাজা একদিন ব্রাহ্মণের বাড়ি লুট করে সেই তিল-ধুবড়ি নিয়ে গেলেন। লক্ষ্মীর ছলনায় তৎক্ষণাৎ সেই তিল-ধুবড়ি রাজ-ভান্ডার হতে লক্ষ্মীর ভান্ডারে চলে গেল। রাজার অত্যাচারে ব্রাহ্মণীর ও ছেলেটির যে দুর্দশা সেই দুর্দশা হল।

প্যাঁচাপ্যাঁচির ছানাগুলি একদিন তাদের মাকে বললে, ‘মা! ওদের আবার কষ্ট হয়েছে। আর একদিন মা লক্ষ্মীর কাছে নিয়ে যাও। ওদের কি দোষ বলো! রাজা লুটপাট করে কেড়ে নিয়ে গেলেন তা ওরা আর কী করবে?’ প্যাঁচি বললে, ‘না বাছা, ওরা রাখতে পারলে না, আর কি মা লক্ষ্মীর দয়া হবে! মিছে নিয়ে গিয়ে কী হবে?’ ছানা দুটি কাঁদতে লাগল। প্যাঁচি কী করে! কাজে কাজেই আবার ব্রাহ্মণের ছেলেকে পিঠে করে নিয়ে মা লক্ষ্মীর বাগানে গেল। প্যাঁচি বললে, ‘দেখ তুমি যেন অন্য কিছু নিও না, কেবল সেই তিল-ধুবড়িটি নেবে।’ খানিক পরে প্যাঁচি ছেলেটিকে লক্ষ্মী-নারায়ণের বাগানে নাবিয়ে দিলে। লক্ষ্মী-নারায়ণকে দেখে ছেলেটি সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল। লক্ষ্মী বললেন, ‘তুমি আবার কেন এসেছ?’ ছেলেটি বললে, ‘মা, রাজা আমায় মেরে ধরে তিল-ধুবড়ি কেড়ে নিয়ে গেছে।’ লক্ষ্মী বললেন, ‘তা আমি আর কী করব বাপু! তোমায় দিলে তুমি তো রাখতে পারবে না। এই ধনদৌলত কিছু দিচ্ছি, নিয়ে যাও।’ ছেলেটি খুব কাঁদতে কাঁদতে বললে, ‘না মা, এবার আমি খুব যত্ন করে রাখব, কেউ জানতে পারবে না। আমাকে দয়া করে তিল-ধুবড়ি দাও মা, আমি ধনদৌলত কিছু চাই না।’ নারায়ণ বললেন, ‘লক্ষ্মী, আর একবার দাও, তারপর আর দিও না।’ কাজেই লক্ষ্মী, ছেলেটিকে তিল-ধুবড়ি দিলেন। আর বলে দিলেন, ‘দেখো এবার যেন কেউ কেড়ে না-নেয়। এবার এলে আর পাবে না।’ ছেলেটি লক্ষ্মী-নারায়ণকে প্রণাম করে বিদায় হল।

তারপর সে প্যাঁচির পিঠে উঠে বাড়িতে এসে মাকে বললে, ‘মা, আবার তিল-ধুবড়ি এনেছি।’ মা দেখলেন সত্যি! ছেলেকে আদর করে চুমু খেয়ে বললেন, ‘বাবা, এবার যেন আর কেউ না-টের পায়, খুব সাবধান!’ তারা আবার তেমনি করে ঘট পেতে শুদ্ধ আচারে পূজা করতে লাগল। ক্রমে দুঃখ দূর হল, যেমন ছিল তেমনি হল। পাড়ার লোক দেখে অবাক। তখন সেই দেশের রাজা রাজত্ব যাবার ভয়ে ব্রাহ্মণীকে বলেকয়ে তাঁর ছেলের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিলেন। হিরে মতি যৌতুক দিয়ে, হাতি ঘোড়া সঙ্গে দিয়ে, নানারকম জিনিসপত্র দিয়ে, বাজনা বাজিয়ে, খুব ঘটা করে মেয়ে-জামাই পাঠালেন। ব্রাহ্মণী মনের আহ্লাদে বউ-বেটাকে বরণ করে ঘরে তুললেন। গাঁয়ের সকলকে নিমন্ত্রণ করে খুব খাওয়ালেন। মা লক্ষ্মীর কৃপায় ধুলো মুঠো ধরতে কড়ি মুটি হতে লাগল।

কিছুদিন পরে ব্রাহ্মণীর জন্যে স্বর্গ হতে রথ এল। ব্রাহ্মণী স্বর্গে যাবার সময় বউকে বলে গেলেন, ‘মা, ভাদ্র মাসে, কার্তিক মাসে, পৌষ মাসে আর চৈত্র মাসে মা লক্ষ্মীর পূজা করবে। আর এই তিল-ধুবড়ির রোজ পূজা করবে, তাহলে কখনো কোনও কষ্ট থাকবে না। আর রোজ ভোরে উঠে, ছড়া ঝাঁট দেবে। বেলা পর্যন্ত কখনও ঘুমুবে না, সন্ধ্যা হলেই ধূপ ধুনা গঙ্গাজল দিয়ে ঘরে ঘরে আলো জ্বালবে। কখনও খন খন ঝন ঝন কোরো না, চলে গেলে যেন পায়ের শব্দ না-হয়। সর্বদাই লক্ষ্মী-নারায়ণকে মনে মনে স্মরণ করবে, তাহলে মা লক্ষ্মীর দয়া হবে।’ এইসব বলে ব্রাহ্মণী স্বর্গে গেলেন। ছেলে খুব ঘটা করে মায়ের শ্রাদ্ধ করলে। বউ শাশুড়ির আজ্ঞামত কথা পালতে লাগল। ক্রমে তাঁদেরও ছেলে-মেয়ে হল। মা লক্ষ্মীর কৃপায় কিছুকাল সুখভোগ করলেন। তারপর যখন স্বর্গে যাবার সময় হল তখন স্বর্গ থেকে দুজনের দু-খানি রথ এল। আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হতে লাগল। তখন বউ, বেটা, জামাই, নাতি, পুতি জাজ্জ্বল্যমান। ব্রাহ্মণী যেমন স্বর্গে যাবার সময় বউ-বেটাকে লক্ষ্মীপূজার উপদেশ দিয়ে গেছলেন, এঁরাও তেমনি ছেলে, মেয়ে, বউকে ডেকে নানা উপদেশ দিয়ে, পৃথিবীতে লক্ষ্মীপূজা প্রচার করতে বলে গেল। তাঁরা দুজনে স্বর্গে গেল। সেই অবধি চারিদিকে লক্ষ্মীপূজার প্রচার হল।

ভাদ্র মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা সমাপ্ত।

কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা

এক দেশে এক রাজা ছিলেন, তাঁর পাঁচ মেয়ে। রাজা একদিন রানি, দাস-দাসী ও মেয়েদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কার ভাগ্যে খাও? রাজার মন রাখবার জন্যে সকলেই বললে আমরা মহারাজের ভাগ্যে খাই। কেবল তাঁর ছোটোমেয়ে বললে, মানুষ উপলক্ষ মাত্র, মা লক্ষ্মী সকলকে খাওয়া-পরা দেন। মানুষ নিজের ভাগ্যেই খায়। রাজা ছোটোমেয়ের কথা শুনে ভারি রেগে গেলেন; বললেন, ‘তোর এত বড়ো স্পর্ধা! তুই আমার মুখের সামনে বললি আমি নিজের ভাগ্যে খাই! ভালো আমিও দেখব তুই কেমন করে নিজের ভাগ্যে খাস। আমি প্রতিজ্ঞা করলুম, কাল সকালে যার মুখ দেখব, তারই সঙ্গে তোর বিয়ে দেব। দেখব তোর লক্ষ্মীই বা কেমন! আর তোর কপালই বা কেমন!’ রানি, রাজার এই কথা শুনে নগরের সকলকে সকালে উঠতে, হাটবাজার দোকান খুলতে বারণ করে পাঠালেন।

এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ, রাজার প্রতিজ্ঞার কথা শুনে ভাবলেন, ‘রাজা যদিও মেয়ের উপর রেগেছেন, তা বলে একেবারে যে তাড়িয়ে দেবেন, তা হতে পারে না। অন্তত যৌতুক-স্বরূপ কিছু ধন জামাইকে দেবেন।’ ব্রাহ্মণ তাঁর ছেলেটিকে সঙ্গে করে ভোরবেলা রাজবাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। ব্রাহ্মণ নিজে একটু দূরে লুকিয়ে রইলেন। রাজা সকালে উঠে ব্রাহ্মণপুত্রকে দেখে, জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি এখানে কেন? কী চাও?’ তখন ব্রাহ্মণ ছুটে এসে বললেন, ‘মহারাজ! আপনি যে প্রতিজ্ঞা করেছেন, প্রথমে যাকে দেখবেন তাকেই কন্যা দান করবেন; এটি আমার ছেলে, আপনি আগে এর মুখ দেখেছেন।’ রাজা নিজের প্রতিজ্ঞা স্মরণ করে ছোটোমেয়েটিকে যৎকিঞ্চিৎ যৌতুক দিয়ে ব্রাহ্মণপুত্রকে দান করলেন। রাজা মেয়েকে এই কথাটি বললেন, ‘যাও বাছা, এত দিন আমার ভাগ্যে খাচ্ছিলে, এখন নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করো।’ রাজকন্যা বাপের এই কথা শুনে কিছু না-বলে প্রণাম করে বিদায় গ্রহণ করলেন। রাজকন্যা স্বামী ও শ্বশুরের পেছনে পেছনে গিয়ে অনেক দূরে অন্য রাজার দেশে বনের মধ্যে একটি কুঁড়েঘরে গেলেন। শাশুড়ি বরণ করে বউকে ঘরে তুললেন। রাজকন্যা হাসিমুখে ওই কুঁড়েঘর, ছড়া ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে রইলেন। রাজকন্যা শ্বশুর, শাশুড়ি ও স্বামীকে খুব ভক্তি করেন; দুঃখেকষ্টে দিন কাটান, তাঁদের খাওয়া হলে পাতে যা কিছু থাকে তাই আপনি খান।

একদিন রাজকন্যা শ্বশুর ও স্বামীকে বললেন, ‘দেখুন আপনারা শুধু হাতে ঘরে আসবেন না। সামনে যা দেখতে পাবেন তাই নিয়ে আসবেন। রাস্তায় একটি কুটি পেলেও যত্ন করে নিয়ে আসবেন।’ তাঁরাও বউটির কথামতো যেদিন যা পান ঘরে নিয়ে আসেন। একদিন তাঁর স্বামী একটা মরা কেউটেসাপ এনে রাজকন্যাকে বললেন, ‘এই দেখো কি এনেচি?’ বউ বললেন, ‘তা বেশ করেছ, ওই মাচার উপর ফেলে রাখো।’ কিছুদিন পরে সেই দেশের রাজার ছেলের বড়ো ব্যারাম হল। কত ডাক্তার কবিরাজ এল, কেউ ভালো করতে পারলে না। একজন ভালো কবিরাজ এসে বললেন, ‘আমি এখনই এই ছেলেকে ভালো করতে পারি, কিন্তু একটি মরা কেউটেসাপের মাথা চাই।’ রাজা ভাবলেন মরা কেউটেসাপের মাথা আর কোথায় পাব যে, আমার ছেলে প্রাণ পাবে! মন্ত্রী তখন ঢেঁড়া পিটিয়ে দিলেন—‘যে একটা মরা কেউটেসাপের মাথা দিতে পারবে, সে যা চাইবে তাকে তাই দেওয়া হবে।’ তখন রাজকন্যা তাড়াতাড়ি শ্বশুরকে বললেন, ‘বাবা, ঢেঁড়া ধরুন, আমি কেউটেসাপের মাথা দেব।’ শ্বশুর ঢেঁড়া ধরলেন, বউ অমনি সেই কেউটেসাপটা এনে দিলেন। তারা সাপটা নিয়ে চলে গেল। কবিরাজ ওষুধ খাওয়ালেন, রাজার ছেলে ভালো হল।

কিছুদিন পরে রাজা ব্রাহ্মণকে ডেকে পাঠালেন। বউ বলে দিলেন, ‘বাবা, রাজা যদি কিছু দেন আপনি নেবেন না। মা লক্ষ্মী না-দিলে সে ধন থাকবে না। আপনি এই কথা বলবেন—‘আমি কিছুই চাই না, কেবল কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাতে রাজবাড়িতে বা কোনো প্রজার বাড়িতে কেউ আলো জ্বালতে পারবে না।’ ব্রাহ্মণ রাজবাড়িতে গিয়ে একথা বলতে রাজা ঢেঁড়া পিটে দিলেন, ‘কার্তিক মাসে অমাবস্যার রাতে আমার রাজ্যে কেউ আলো জ্বালতে পারবে না।’ কার্তিক মাস অমাবস্যা, লক্ষ্মীপূজা, কারো বাড়িতে একটিও আলো নাই। ব্রাহ্মণের বউটি ঘরটি বেশ পরিষ্কার করে আলপনা দিয়ে, চৌকি পেতে, ঘট বসিয়ে, নৈবেদ্য করে, ফুল, চন্দন, ফুলের মালা, সব আয়োজন করে, সমস্ত দিন উপবাস করে, চারিদিকে আলো জ্বেলে মা লক্ষ্মীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

মা লক্ষ্মী প্যাঁচার পিঠে চড়ে রাজ্যের চারদিকে ঘুরে বেড়ালেন, কোথাও আলো দেখতে না-পেয়ে সে রাজ্য থেকে অন্তর্ধান হলেন। প্যাঁচা বনের ভিতর আলো দেখতে পেয়ে সেই কুঁড়েঘরে মা লক্ষ্মীকে নিয়ে গেল। লক্ষ্মী আসতেই রাজকন্যা জোড়হাত করে, ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। লক্ষ্মী বললেন, ‘কী আশ্চর্য! পৃথিবীতে আজ আমার পূজা হয়, কিন্তু আজ যেখানে যাচ্ছি সেখানেই দেখছি অন্ধকার। তাই তোমার এখানে আলো দেখতে পেয়ে এসেছি।’ রাজকন্যা লক্ষ্মীকে ঘরে নিয়ে গিয়ে চৌকিতে বসিয়ে ভক্তিভরে পূজা করলেন। বললেন, ‘মাগো! কী দিয়ে আপনার পূজা করব মা, আমরা বড়ো গরিব, এই সামান্য আয়োজনে সন্তুষ্ট হন।’ মা লক্ষ্মী খুশি হয়ে বললেন, ‘আর তোমাদের কোনো কষ্ট থাকবে না। আমার পায়ের নূপুর রেখে যাব। ভাদ্র মাসে, কার্তিক মাসে, পৌষ মাসে, চৈত্র মাসে এমনি করে আমার পূজা করো। কখনও ঝন ঝন খন খন করো না, নখে কুটো ছিঁড়ো না, নেই নেই করো না, শুদ্ধ আচারে থাকবে,’ এই বলে মা লক্ষ্মী চলে গেলেন। লক্ষ্মীর কৃপায় তাঁদের কুঁড়েঘরের বদলে রাজার মতন বাড়ি হল, হাতিশালে হাতি হল, ঘোড়াশালে ঘোড়া হল, অতুলঐশ্বর্য হল! রাজকন্যা বেশ মনের সুখে ঘরকন্না করতে লাগলেন।

একদিন রাজকন্যা শ্বশুরকে বললেন, ‘দেখুন, এখন আমরা খুব বড়ো মানুষ হয়েছি, সুতরাং দেশের লোককে, গরিব দুঃখীকে কিছু দান করা উচিত। আপনি একটি পুকুর প্রতিষ্ঠা করুন, দেশ-বিদেশের ব্রাহ্মণ-পন্ডিতদের নিমন্ত্রণ করুন।’ রাজকন্যার কথায় ব্রাহ্মণ পুকুর কাটালেন। পুকুর প্রতিষ্ঠার দিন, দেশ-বিদেশ থেকে দলে দলে ব্রাহ্মণ-পন্ডিত, দেশের সকল লোক, ফকির, কাঙাল সব আসতে লাগল। বাড়িতে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হল। রাজকন্যা জানালার পাশে বসে লোকজনের খাওয়া-দাওয়া দেখতে লাগলেন। রাজকন্যার বাপ লক্ষ্মীকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করায় লক্ষ্মীর কোপে পড়ে রাজ্য-ধন সব হারিয়েছেন। এমনকি নিজের পেটের অন্নের জন্য লোকের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষে করতে লাগলেন। রাজকন্যার দানের কথা শুনে তিনি সেখানে গেলেন।

রাজকন্যা জানালার ভিতর থেকে বাপকে দেখতে পেয়ে চিনতে পারলেন। তখন তিনি শ্বশুরকে বললেন, ‘বাবা, ওই লোকটিকে আমার কাছে ডেকে আনুন।’ শ্বশুর তাঁকে ডেকে রাজকন্যার কাছে নিয়ে এলেন। রাজা আপনার মেয়েকে চিনতে পারলেন না। মেয়ে বাপের পা ধুইয়ে গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিলেন। বসতে রূপার পিঁড়ি দিলেন, সোনার গেলাসে জল ও সোনার থালে ভাত দিলেন। রাজা মনে মনে ভাবলেন, ইনি আমায় এত যত্ন করছেন কেন? রাজা একগ্রাস করে ভাত খান, আর এক-একবার রাজকন্যার মুখের দিকে চান। তিনি দেখলেন এঁর মুখটি ঠিক তাঁর ছোটোমেয়ের মতো। তখন তাঁর চক্ষের জলে বুক ভেসে যেতে লাগল। রাজকন্যাও বাপকে কাঁদতে দেখে নিজেও কাঁদতে লাগলেন। শেষে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কাঁদছেন কেন? আপনার দুঃখের কারণ কী?’ রাজা তখন বললেন, ‘মাগো! বলতে বুক ফেটে যায়, আমিও এক সময় রাজা ছিলুম। আমার অন্নে কত লোক প্রতিপালিত হয়েছে; আজ আমি নিজের পেটের অন্নের জন্য পথের কাঙালি। আর ঠিক আপনার মতো আমার একটি মেয়ে ছিল। হায়! আমি তাকে অতিনিষ্ঠুরের মতো এক দরিদ্র ব্রাহ্মণপুত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলাম; এখন সে বেঁচে আছে কিনা কোনো সন্ধান পাইনি। হায়! না-জানি সে কত কষ্ট পেয়ে মরে গেছে।’

তখন রাজকন্যা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বাবা! আমিই সেই আপনার হতভাগিনী কন্যা; যাকে আপনি নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে বলেছিলেন। এখন দেখুন, মানুষ নিমিত্ত মাত্র, মা লক্ষ্মী সকলকে আহার দেন। যে যার ভাগ্যে খায়।’ রাজা শুনে আরও কেঁদে বললেন, ‘মা! আমাকে আর লজ্জা দিস না। আমার অপরাধ হয়েছে, তখন বুঝতে পারিনি, এখন বেশ বুঝতে পাচ্ছি। আমায় মাপ কর মা, আমি মহাপাপিষ্ঠ। মাগো আজ আমি হারানো ধন পেলুম।’ এই বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন। মেয়ে বললেন, ‘বাবা, মা লক্ষ্মী আপনার প্রতি বাম হওয়াতে আপনার এত কষ্ট হয়েছে; আপনি লক্ষ্মীপূজা করুন, আপনার আবার রাজ্য-ধন সব হবে।’ রাজা মেয়ের কাছে বিদেয় নিয়ে বাড়ি গিয়ে রানিকে সব বললেন। তারপর রানি এই কথা শুনে মেয়েকে আনালেন। অনেক দিনের পর মেয়েকে পেয়ে মা কাঁদতে লাগলেন। মায়ে-ঝিয়ে কত দুঃখের সুখের কথা হল। রাজা লক্ষ্মীর পূজা আরম্ভ করলেন। লক্ষ্মীর কৃপায় আবার রাজ্য, ধনদৌলত সব হল। আবার সুখের দিন এল। তারপর তিনি কিছুদিন সুখে রাজত্ব করে, মেয়ে-জামাইকে রাজ্য দিয়ে স্বর্গে চলে গেলেন। মা লক্ষ্মীর কৃপায় মেয়ে-জামাই সেই দেশের রাজা-রানি হলেন। কিছুদিন রাজত্ব করে তাঁদের স্বর্গে যাবার সময় হলে, তাঁরা তাঁদের ছেলে-মেয়েকে লক্ষ্মীপূজার কথা বলে গেলেন। সেই থেকে পৃথিবীতে লক্ষ্মীপূজা প্রচার হল।

কার্তিক মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা সমাপ্ত।

পৌষ মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা

এক ব্রাহ্মণীর বড়ো কষ্ট, পাঁচটি ছেলে আর একটি মেয়ে। মেয়েটি বড়ো; ছেলেগুলি ছোটো, তাদের বাপ নেই, কাজেই অতিকষ্টে একবেলা একমুঠো অন্ন জোটে। একদিন মেয়েটি বললে, ‘মা! তুমি মামির কাছে যাও না, যদি তিনি কিছু পয়সাকড়ি দেন।’ তখন কোলের ছেলেটিকে কোলে করে ব্রাহ্মণী আপনার ভাজের কাছে গেলেন। ভাজ বললেন, ‘কীগো! কী মনে করে?’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘আর বোন, খেতে পাইনি, ছেলে-মেয়ে না-খেতে পেয়ে মারা গেল। বউ, দাদা যদি দয়া করে কিছু দেন তাই এসেছি।’ বউ বললেন, ‘তাঁকে আর এসব কথা কী বলব, তুমি রোজ এসে আমার কাজকর্ম করে, চালডাল ঝেড়ে দিয়ে যেও, আর খুদ-কুঁড়ো যা পড়বে নিয়ে যেও।’ ব্রাহ্মণী পেটের জ্বালায় রোজ রোজ তাই করেন। একদিন তিনি বললেন, ‘বউ! দুটি লাউ পাতা দেবে?’ বউ বললেন:

ঢোলা ঢোলা লাউয়ের পাতা।
তোমার ভাইয়ের গোণা গাঁথা।।

তবে, ‘যদি আমার মাথার দুটো উকুন বেছে দিয়ে যেতে পারো, তাহলে দুটো লাউ পাতা দেব।’ ননদ বললেন, ‘বউ! আজ লক্ষ্মীবার উকুন যে দেখতে নেই, কাল এসে উকুন বেছে দেব, ছেলেরা আমার সমস্ত দিন না-খেয়ে আছে, আমি এখন যাই বউ।’ তখন লাউ পাতা দেওয়া দূরে থাক; খুদগুলিও আঁচল থেকে কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘মর আবাগী, নিজের মঙ্গলটি জানো আর ভাইয়ের মঙ্গল খোঁজো না? আজ লক্ষ্মীবার, বাড়ি থেকে খুদগুলো বার করে নিয়ে যাচ্ছ?’ ননদ তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির বার হয়ে চলে গেলেন।

পথে যেতে যেতে তিনি ভাবলেন, আজ যা সামনে পাব তাই খাব। দেখেন একটা খুব খুব বড়ো কেউটেসাপ মরে পড়ে আছে। সেই সাপটাকে নিয়ে বাড়ি গেলেন, মনে করলেন, আজ এই সাপটাকে সিদ্ধ করে খেয়ে সবাই মরব। কুটি কুটি করে কুটে একটা নতুন হাঁড়িতে করে উনুনে চড়িয়ে জ্বাল দিতে লাগলেন। যতই জ্বাল দেন ততই সোনার ফেনা উঠে, ক্রমে ঘর-দরজা সব ভরে গেল। আহ্লাদে আর তখন ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই। বড়ো ছেলেটি এক খুরি ফেনা নিয়ে সেকরার দোকানে গেল, সেকরা এক খুরি টাকা দিলে। সেই টাকায় চাল, ডাল, নুন, তেল সব কিনে আনলে। তখন তাঁদের লক্ষ্মীপূজা করবার ইচ্ছা হল। গিন্নি বললেন, ‘আজ লক্ষ্মীবার, যখন আমাদের এত টাকা হল তখন মা লক্ষ্মীর পূজা করি।’ এই ঠিক করে তিনি স্নান করে এসে শুদ্ধ আচারে রান্না করলেন; ঘরে চৌকি পেতে আলপনা দিয়ে নতুন ধান এনে পিঠে-পায়েস করে মা লক্ষ্মীর পূজা করলেন; ব্রাহ্মণ খাওয়ালেন, পাড়ার সকলকে প্রসাদ দিয়ে শেষে নিজেরা খেলেন। সেই সোনাতে সকলের দুঃখ-কষ্ট দূর হল। ক্রমে দাস-দাসী, লোক-লশকর, হাতি, ঘোড়া, রাজার বাড়ির মতো বাড়ি হল, ছেলেদের বিয়ে হল, প্রতিমার মতো বউ এল; মেয়েটিকে সে দেশের রাজার ছেলে বিয়ে করে নিয়ে গেলেন। আর কোনো কষ্ট নেই, সকলে সুখেস্বাচ্ছন্দ্যে থাকেন। ভাজ এইসব কথা শুনে ভাবলেন, ঠাকুরঝি এর মধ্যে এত বড়োমানুষ কী করে হল? একদিন তাদের সকলকে নিমন্ত্রণ করে পাঠালেন। তাদের বউ-ঝি সকলেই গায়ে এক-গা গয়না পরে, নিজেদের ঘরে খেয়ে, পালকি চড়ে নিমন্ত্রণ রাখতে গেল। তারা আসতেই বউ ‘ভাগনি, ভাগনি’ বলে বউদের মুখে চুমু খেয়ে আদর করে ঘরে নিয়ে গেলেন। তারপর আসন পেতে ঠাঁই করে পঞ্চাশ ব্যঞ্জন ভাত বেড়ে দিলেন। বউয়েরা গায়ের সব গয়না খুলে আসনের উপর রেখে বলতে লাগল:

সোনা-দানার বড়ো মান্য,
সোনার কল্যাণে নেমতন্ন।
ঢোলা ঢোলা লাউয়ের পাত,
খাও সোনা পিঠে ভাত।

তখন ব্রাহ্মণীর ভাজ বললেন, ‘ঠাকুরঝি! তোমার ঝি-বউয়েরা সব কী বলছে গো? ওরা কিছু খাচ্ছে না কেন?’ ননদ বললেন, ‘তুমি ত ওদের খেতে বলোনি? সোনা-দানাকেই নিমন্ত্রণ করেছ। যখন আমার দুঃখ-কষ্ট ছিল, দুটো লাউয়ের পাতাও দিতে পারোনি, আঁচল থেকে খুদগুলি পর্যন্ত ঢেলে নিয়েছিলে, মনে আছে কি?’ তখন ভাজ ননদের হাত ধরে কাঁদতে লাগলেন; সুখের সময় ভাই-ভাজ আপনার হল। তিনি আপনার বউ-ঝি নিয়ে ঘরে গেলেন। কিছুকাল সুখে-স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে তিনি স্বর্গে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, ‘তোমরা সব আমার মতো মা লক্ষ্মীর পূজা করবে, তাহলে তোমাদের কখনও কোনও কষ্ট হবে না।’ সেই অবধি পৃথিবীতে লক্ষ্মীপূজা প্রচার হল।

পৌষ মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা সমাপ্ত।

চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা

একদিন নারায়ণ রথে চড়তে যাচ্ছেন, এমন সময়ে লক্ষ্মী বললেন, ‘তুমি কোথায় যাবে প্রভু? আমি তোমার সঙ্গে যাব।’ নারায়ণ বললেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে কোথায় যাবে? মেয়েমানুষ নিয়ে পথে যেতে নাই, পদে পদে বিপদ ঘটে। তুমি ঘরে থাকো, আমি একবার জগতের লোকে কী করছে দেখে আসি।’ লক্ষ্মী কোনোকথা শুনলেন না। নারায়ণ কী করেন, বললেন, ‘যেতে চাও চলো, কিন্তু আমি যা বলব তা শুনো, যা বারণ করব তা করতে পারবে না।’ লক্ষ্মী বললেন, ‘আমি কি কখন তোমার অবাধ্য হয়েছি?’ এই বলে হাসতে হাসতে দুজনে রথে উঠলেন। কতদূর যাচ্ছেন, যেতে যেতে একজায়গায় রথ রেখে নারায়ণ বললেন, ‘লক্ষ্মী, তুমি এইখানেই থাকো, আমি এখনই আসছি। দেখো লক্ষ্মী, আমার কথা যেন ভুলো না, সব দিকে চেয়ো, কেবল দক্ষিণদিকে চেয়ো না, তাহলে বিপদ ঘটবে।’ নারায়ণ চলে গেলেন, লক্ষ্মী মনে মনে ভাবলেন যে, নারায়ণ সকল দিকে চাইতে বললেন, কিন্তু দক্ষিণদিকে চাইতে কেন বারণ করলেন? মেয়েমানুষের মন, লক্ষ্মী সেই দক্ষিণদিকেই আগে চেয়ে দেখলেন, দেখেন যে একখানি তিলখেত সাদা ধপধপে ফুলগুলিতে যেন আলো করে রয়েছে। তিনি আর থাকতে পারলেন না, অমনি রথ থেকে নেমে এক আঁচল ফুল তুলে এনে, খোঁপায় দিলেন, কানে দিলেন, শেষে গলায় পরে রথে চড়ে বসে রইলেন।

নারায়ণ এসে দেখে বললেন, ‘লক্ষ্মী, সর্বনাশ করেছ? আমি যা বারণ করেছি, তুমি তাই করেছ; এখন যাও তিল-সন খাটো। কারুর খেতে নেমে তিলফুল তুলতে নেই, তিলফুল তুললে বারো বছর তিল-সন খাটতে হয়। তাই তোমায় দক্ষিণ দিকে চাইতে বারণ করে গেছলুম। এখন আমি আর কী করব বলো।’ একেই বলে স্ত্রী-বুদ্ধি! লক্ষ্মী কাঁদতে লাগলেন। নারায়ণ বললেন, ‘আর কী হবে বলো, যেমন আমার কথা শোনোনি এখন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণীর বেশ ধরো।’ তিনিও বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশ ধরে, ‘এ কার খেত গো! এ কার খেত গো!’ এই বলে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। এক ব্রাহ্মণ এসে বললেন, ‘কেন গো? এ আমার খেত?’ নারায়ণ বললেন, ‘বাপু! এ মেয়েমানুষটি তিলফুল তুলেছে, তাই তিল-সন খাটবে, তুমি একে তোমার ঘরে নিয়ে যাও, পাতের এঁটো খেতে দিও না, আর ছাড়া কাপড় কাচতে দিও না।’ এই বলে নারায়ণ চলে গেলেন।

লক্ষ্মী ব্রাহ্মণের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে গেলেন। ব্রাহ্মণের গিন্নি ও তিন বউ বেরিয়ে এলেন, ব্রাহ্মণ সব বুঝিয়ে বললেন। গিন্নি বললেন, ‘আমরাই খেতে পাই না, আবার এই ব্রাহ্মণীকে কেমন করে রাখব গো!’ কর্তা বললেন, ‘তা থাক আমাদের জুটলে ওঁরও এক মুঠো জুটবে, তোমরা ওঁকে বেশ যত্ন করো।’ এই বলে কর্তা বাইরে গেলেন। সবাই চুপ করে বসে রইলেন। তখন লক্ষ্মী বললেন, ‘তোমরা বসে রইলে কেন মা? বেলা হয়েছে, তেল মাখো, নেয়ে এসো, রান্না-টান্না করো।’ গিন্নি বললেন, ‘তেল কোথায় পাব মা, যে তেল মাখবো, কাপড় কোথায় পাব যে কাপড় পরব, চাল-ডাল কোথায় পাব যে রান্না হবে? ছেলেরা ভিক্ষে করতে গেছে, এলে তারপর সব হবে।’ লক্ষ্মী বললেন, ‘ঘরের ভেতর গিয়ে দেখো সবই আছে।’ বড়ো বউ ঘরের ভেতর গিয়ে দেখলেন—আলনায় কাপড়, ভাঁড়ভরা তেল, সকল জিনিসই ঘর ভরা রয়েছে। দেখে খুব আহ্লাদ হল, সকলকে ডেকে দেখালেন—দেখে অবাক। ভাবলেন, বুঝি ইনি কোনো দেবতা। তখন সবাই স্নান করে এলেন, রান্না-টান্না করে খুব যত্ন করে আগে লক্ষ্মীকে খাওয়ালেন। তারপর ছেলেরা ভিক্ষে করে এসে সব শুনলে, তারাও খুব যত্ন করতে লাগল। এই রকমে দিন যায়, কেবল মেজো বউ একটু খিট খিট করে। বলে মাগি দাসীবৃত্তি করতে এসে, পাতের এঁটো খাবেন না, ছাড়া কাপড় কাচবেন না, সুখ দেখে আর বাঁচি না। মেজো বউ কিছু দিলে লক্ষ্মী খান না, যা দেন সব ডালিম গাছের গোড়ায় পুঁতে রাখেন। এমনি করে বারো বছর কেটে গেল।

একদিন গিন্নি বললেন, ‘মা, আজ বারুণী, চলো আজ সকলে গঙ্গাস্নান করে আসি।’ লক্ষ্মী বললেন, ‘আমি যাব না মা, আমি বাড়িতে থাকি, তোমরা যাও। আমার এই পাঁচ কড়া কড়ি নিয়ে যাও, গঙ্গার পূজা দিও।’ তখন সকলে গঙ্গাস্নানে গেলেন, স্নানকরে খুব ঘটা করে সকলে পূজা দিলেন। বড়ো বউ যেমন আসবেন অমনি তাঁর পিঠে কি ঠক করে উঠল। খুলে দেখলেন সেই পাঁচ কড়া কড়ি, অমনি তাঁর পূজার কথা মনে পড়ল। তিনি বললেন ‘পাঁচ কড়া কড়ির আর কী কিনে পূজা দেব, ওই কড়ি গঙ্গায় ফেলে দি।’ তখন তিনি যেমন সেই পাঁচ কড়া কড়ি গঙ্গায় ফেলে দেবেন, অমনি মা গঙ্গা চার হাত বার করে ধরে নিলেন। তখন সকলকার মনে সন্দেহ হল, বললেন, ‘আমরা এত জিনিস দিয়ে পূজা করলুম, কই মা গঙ্গা ত হাত পেতে নিলেন না! তবে কি উনি মানুষ নন। নিশ্চয়ই কোনো দেবী আমাদের ছলনা করতে এসেছেন।’ এই রকম বলাবলি করতে করতে সকলে বাড়িতে যেতে লাগলেন।

ওখানে নারায়ণ গণনা করে দেখলেন যে, বারো বছর পূর্ণ হয়েছে। অমনি তিনি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশ ধরে এসে লক্ষ্মীকে বললেন, ‘লক্ষ্মী চলো, আজ তোমার বারো বৎসর পূর্ণ হয়েছে। দেবতাদের নিমন্ত্রণ করেছি, তুমি না-গেলে কে অন্ন দেবে?’ লক্ষ্মী বললেন, ‘এদের বাড়িতে এত দিন আছি, না-দেখা করে কি যাওয়া উচিত?’ এদিকে মেয়েরা গঙ্গাস্নান করে বাড়িতে এসে দেখেন যে, মা লক্ষ্মী এক পা রথে, এক পা পথে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। গিন্নি তখন তাঁর চরণ ধরে বলতে লাগলেন, ‘মাগো! তোমায় চিনতে পারিনি, অপরাধ মার্জনা করো মা। আমাদের ছেড়ে কোথাও যেও না মা!’ মা লক্ষ্মী বললেন, ‘আমার আর থাকবার জো নাই। ওই দেখো, নারায়ণ আমায় নিতে এসেছেন। আমি চললুম, ডালিমতলায় যা আছে, তুলে নিও, তাতে তোমাদের দুঃখ দূর হবে। আর মেজো বউয়ের ঝাঁপির মধ্যে যে হার আছে তাকে নিতে বলো। ভাদ্র মাসে, কার্তিক মাসে, পৌষ মাসে, চৈত্র মাসে, লক্ষ্মীর পূজা কোরো, তোমাদের কোনো কষ্ট থাকবে না।’ এই বলে লক্ষ্মী-নারায়ণ অন্তর্হিত হলেন। গিন্নি ডালিম গাছের তলা খুঁড়ে দেখলেন, পচা ভাত-তরকারি সব সোনা হয়ে আছে। মেজো বউ হারের লোভে যেমনি ঝাঁপি খুলেছেন, অমনি একটা কেউটেসাপ তার ভেতর থেকে বেরিয়ে কামড়ে দিলে। তখন সকলে বলতে লাগল, আহা মেজো বউ চিনতে পারলে না, যেমন অচ্ছেদ্দা করতে তেমনি হল। হায়! হায়! করে সকলে কাঁদতে লাগল। মেজো বউ মরে গেল। আর সকলে সুখে ঘরকন্না করতে লাগল। সেই অবধি চৈত্রমাসে মা লক্ষ্মীর পূজা চারদিকে প্রচার হল।

চৈত্র মাসের লক্ষ্মীপূজার কথা সমাপ্ত।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার কথা

এক দেশে এক রাজা ছিলেন। তাঁর হাটে যে সকল জিনিস বিক্রি হত না, তিনি তা মূল্য দিয়ে কিনে নিতেন। একদিন এক কামার, একটা লোহার স্ত্রীমূর্তি গড়ে হাটে বিক্রি করতে এসেছিল, সেটা কেউ কিনলে না। তখন সে ব্যক্তি রাজপথে ফিরি করতে বেরুল। ‘তোমরা কেউ অলক্ষ্মী নেবে গো?’ এই বলে চীৎকার করতে লাগল। রাজা শুনতে পেয়ে সেই লোকটিকে ডাকিয়ে, তাকে উচিতমূল্য দিয়ে সেই মূর্তিটি কিনে নিলেন। তারপর তিনি সেইদিন সন্ধ্যার সময় তাঁর বাড়িতে একটি স্ত্রীলোকের কান্না শুনতে পেলেন। রাজা তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখেন যে, ঠাকুরঘরে লক্ষ্মীর মতো একটি সুন্দরী স্ত্রীলোক বসে বসে কাঁদছেন। রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কে মা? কেন কাঁদছ?’ সেই স্ত্রীলোক বললেন, ‘আমি রাজলক্ষ্মী। অনেক দিন তোমার বাড়িতে আছি, আর থাকতে পারব না, তাই কাঁদছি।’ রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি যাবে কেন মা? আমি কী অপরাধ করেছি?’ রাজলক্ষ্মী বললেন, ‘তুমি অলক্ষ্মী কিনেছ; আর আমি থাকব না। তবে তোমার বাড়িতে অনেক আদর-যত্ন পেয়েছি, তাই তোমাকে এই বর দিয়ে যাই যে, তুমি পশুপক্ষী, কীটপতঙ্গের কথা বুঝতে পারবে। আর আমার এই কথাটি স্মরণ রাখবে:

মানুষের সার আচার-ব্যবহার,
নারীর সার দমন।
ভোজনের সার ঘৃত,
নিশির সার জাগরণ।।

এই বলে মা লক্ষ্মী অন্তর্হিত হলেন। রাজা আর রাত্রে নিদ্রা যান না। একদিন দেখেন একটি স্ত্রীলোক বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কে মা? কোথায় যাচ্ছ?’ সেই রমণী-মূর্তি বললেন, ‘আমি ভাগ্যলক্ষ্মী। তুমি অলক্ষ্মী কিনেছ, আমি আর থাকব না।’ এই বলে চলে গেলেন। রাজা আর একদিন একজন স্ত্রীলোককে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি যশলক্ষ্মী। তুমি অলক্ষ্মী কিনেছ, তাই আমি তোমায় ছেড়ে যাচ্ছি।’ তার পর একদিন রাত্রে একটি পুরুষ-মূর্তি আর একটি স্ত্রী-মূর্তি বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছেন দেখে, রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কে?’ রমণী বললেন, ‘আমি কুললক্ষ্মী।’ পুরুষ-মূর্তি বললেন, আমি ধর্ম। ‘তুমি অলক্ষ্মী কিনেছ, তাই আমরা আর থাকব না।’ রাজা ধর্মকে বললেন, ‘ধর্ম! আমি সত্য প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবার জন্য অলক্ষ্মী কিনেছি, আপনার বলেই রাজলক্ষ্মী, ভাগ্যলক্ষ্মী, যশলক্ষ্মীকে বিদায় দিয়েছি; কুললক্ষ্মীও ইচ্ছা করলে যেতে পারেন, কিন্তু আপনার কোনও মতে যাওয়া উচিত নয়। কারণ আমি তো আপনার মর্যাদা নষ্ট করিনি। যে সত্যধর্ম পালন করে, তাকে ত্যাগ করতে নেই।’ কুললক্ষ্মী চলে গেলেন; রইলেন কেবল ধর্ম।

রাজা যখন আহার করতে বসেন, তখন অনেকগুলি পিঁপড়ে এসে পাতের কাছে জমে। প্রতিদিন এরূপ হয়, রাজার দিন দিন অবস্থা মন্দ হতে লাগল। একদিন রানিকে বললেন, ‘দেখো আজ আমার কোনও তরকারিতে ঘি দিও না, ভাতেও ঘি দিও না।’ রানি রাঁধুনিকে বারণ করলেন, সেদিন রাজার কোনও খাবার জিনিসে ঘি দেওয়া হল না। রাজা আহারে বসলেন, সেই সময়ে সেই পিঁপড়েগুলি এসে পাতের কাছে ঘুরে-ফিরে বেড়াতে লাগল। আর পরস্পর বলতে লাগল, ‘দেখ ভাই, রাজা অলক্ষ্মী কিনে একেবারে গরিব হয়ে গেছে। আর ঘি পর্যন্তও খেতে পায় না।’ রাজা কথাটি শুনে হেসে ফেললেন। রানি বললেন, ‘মহারাজ! আপনি হাসলেন কেন?’ রাজা বললেন, ‘সে-কথা তোমায় বলব না; বললে আমি মরে যাব।’ রানি বললেন, ‘না, আপনাকে বলতেই হবে, আমি কোনও মতেই ছাড়ব না।’ রাজা বললেন, ‘তুমি যদি আমায় না-চাও, কেবল এই কথাটি জানতে চাও, তবে গঙ্গার তীরে চলো; যদি মৃত্যু হয় সেখানেই হবে।’ এই বলে রানিকে সঙ্গে করে নিয়ে গঙ্গার তীরে গেলেন। গিয়ে বললেন, ‘রানি, তুমি আমায় চাও, না, কথা চাও?’ রানি বললেন, ‘আমি কথা চাই।’ সেইখানে একটা ছাগল আর ছাগলি চরছিল, আর গঙ্গার মাঝখানে একটা ঘাসের মোট ভেসে যাচ্ছিল ছাগলি ছাগলকে বললে, ‘ওই ঘাসগুলো আমায় এনে দাও না, আমি খাই।’ ছাগল বললে, ‘আমি তোমার জন্যে ডুবে মরি আর কী! আমি তো আর রাজার মতো বোকা নই! রাজা যেমন স্ত্রীর কথায় মরতে এসেছে।’ রাজা তখন ছাগলের কথা বুঝতে পেরে রানিকে খুব প্রহার করে, সেই গঙ্গার তীরে জঙ্গলের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। রানি সেই গঙ্গার তীরে বনে বনে কেঁদে বেড়ান। রাজা আর কোনো খোঁজখবর করেন না। রানির আর দুর্দশার সীমা নেই।

একদিন সন্ধ্যার সময় শঙ্খঘণ্টার শব্দ শুনে রানি সেখানে গিয়ে দেখেন কতকগুলি মুনিকন্যা পিটুলির লক্ষ্মী ঠাকুর গড়ে তাতে রং মাখিয়ে ফুল তুলে চন্দন ঘষে নৈবেদ্য করে চিঁড়ে, পাটালি, নারিকেল দিয়ে পূজা করছেন। দেখে রানি বললেন, ‘তোমরা কী করছ গা?’ তাঁরা বললেন, ‘আজ আশ্বিন মাসের কোজাগরী পূর্ণিমা, তাই আমরা লক্ষ্মীপূজা করছি।’ রানি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ পূজা করলে কী হয়?’ তাঁরা বললেন, ‘লক্ষ্মীর কাছে যে-যা বর মাগে তাই হয়; অলক্ষ্মী দূর হয়, মা লক্ষ্মীর কৃপা হয়।’ তখন রানি তাঁদের কাছে একটু পিটুলি চেয়ে নিয়ে, লক্ষ্মীঠাকুর গড়ে, পূজা করে, সেই লক্ষ্মীর প্রসাদ চিঁড়ে, নারিকেল খেয়ে, তাঁদের সঙ্গে সেইখানে রাত্রি জাগরণ করে রইলেন। ওখানে রাজার বাড়িতে যে লোহার অলক্ষ্মী ছিল, সেটা বিদেয় হল। যেমন হাতি, ঘোড়া, ধন, রত্ন ছিল, তেমনি আবার সব হল। রাজা সকালে উঠে ভাবছেন, হঠাৎ আমার আবার এসব কী করে হল! ধর্ম বললেন, ‘মহারাজ! ওই অলক্ষ্মীটা কিনেই আপনার অমঙ্গল ঘটেছিল। রানি বনে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা করেছেন, তাই অলক্ষ্মী দূর হয়ে রাজলক্ষ্মীর কৃপা হল। কেবল সত্যের কৃপায় আবার আপনার সব হল।’ তখন রাজা ধর্মকে নমস্কার করে নিজে সেই গঙ্গার তীরে বনে গিয়ে রানিকে খুঁজে, অনেক যত্ন করে সঙ্গে নিয়ে এলেন। বাড়িতে এসে খুব ঘটা করে লক্ষ্মীর পূজা করলেন; ভাগ্যলক্ষ্মী, যশোলক্ষ্মী, কুললক্ষ্মী আবার ফিরে এলেন। সেই থেকে পৃথিবীতে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা প্রচার হল।

কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার কথা সমাপ্ত।

ক্ষেত্র ব্রতকথা

এক ব্রাহ্মণের ছেলে পাঁচ বছরের হতেই তার বাপ মারা যায়। তার মা ছেলেটি নিয়ে ভাই-ভাজের ঘরে এসে রইলেন। ননদ আসতেই ভাজ দাসী ছাড়িয়ে দিলেন, রাখাল ছাড়িয়ে দিলেন। ছেলেটি ছাগল, গোরু চরায়। তার মা গোয়াল কাড়ে, সমস্ত পাট-ঝাঁট করে, রেঁধে রাখে; ভাজ সকলকে ভাত দেন। ছেলেটি একটু বড়ো হতেই তার মামা ডেকে বললেন, ‘ওরে বিশে! চাষ করতে পারবি? না বসে বসে অন্ন ধ্বংসাবি?’ বিশু বললে ‘পারব মামা।’ তখন মামা হাল-হেলে কিনে দিলেন, বিশু চাষ করতে লাগল। বিশু সারাদিন চাষে খাটে, কোদাল পাড়ে, কাঠ কাটে, কিন্তু খেটেখুটেও পেটভরে খেতে পায় না। ভাতের ওপর একটু তরকারিও পায় না। মায়ের প্রাণে কত সয়! কেবল চোখের জল মোছেন, আর ভগবানকে ডাকেন। ছেলেটি সকাল হলে গোরু, ছাগল, ভেড়া নিয়ে, লাঙল ঘাড়ে করে মাঠে চলে যায়। কে জানে শীত, কে জানে বর্ষা, কে জানে রোদ, ছেলের বিশ্রাম নেই। একটু বেলা হলেই মায়ের প্রাণ ছটফট করতে থাকে। তার মা মুড়ি, চালভাজা, চিঁড়ে, মুড়কি, মূলা, কাঁকুড়, শশা যে দিন যা হয়, তাই নিয়ে এক ঘটি জল নিয়ে সেই মাঠে গিয়ে দিয়ে আসেন। বিশু ক্ষেত্রদেবীকে নিবেদন না-করে খায় না। মা ছেলের গায়ের ঘাম মুছিয়ে, মুখে লক্ষ লক্ষ চুমু খেয়ে, গলায় কাপড় দিয়ে মা ক্ষেত্রদেবীকে সঁপে দিয়ে বাড়ি আসেন। বলেন, ‘হে মা ক্ষেত্রদেবী! দুখিনীর ধন আমার বিশুকে তুমি রক্ষা কর।’ মা বাড়ি চলে আসেন, বিশু বেলা আড়াই প্রহরের সময় আসে, দুটি পাতের-নাতের যে যা না খেতে পারে, তাই খেয়ে বিশু আবার মাঠে যায়। ব্রাহ্মণের ছেলে লাঙল করে বলে, সকলে তাকে ‘লাঙলে বিশে’ বলে ডাকে।

একদিন লাঙলে বিশু ভাত খেতে পারছে না দেখে তার মা দুধ থেকে সর তুলে দিয়েছিলেন। বিশুর মামি চটে লাল, মুখে যা এল তাই বললেন। ভালো জ্বালা হয়েছে, ভালো আপদ হয়েছে, ঘরে কিছু থাকবার যো নেই। দুধের সরটুকু পর্যন্ত আহ্লাদে ছেলেকে খাইয়ে রেখেছেন। স্বামীকে সব কথা চৌগুণ মাত্রায় বাড়িয়ে বলা হল। আর বলেন, ‘দেখো! ওদের পেছনে মাসে কত বেশি খরচ পড়ে, তার চাইতে চাষি, চাকর রাখলে কত কাজ পাওয়া যায়।’ এই কথা শুনে বিশুর মামার মাথা ঘুরে গেল। তার পরদিন বিশুকে আর কাজে যেতে দিলেন না, বিশুর মাকেও কোনো কাজে হাত দিতে দিলেন না।

সে দিন অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের শনিবার; বিশু ও বিশুর মা দুজনে কিছুই খেতে পায়নি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে মাঠে বসে কাঁদছে। এমন সময় ক্ষেত্রদেবী বৃদ্ধ ব্রাহ্মণীর বেশে লাঙলা বিশুকে দেখা দিয়ে বললেন, ‘বিশু, তোমার শাপে বর হয়েছে বাছা! তুমি কেঁদো না। এই ধান কয়টি নিয়ে মুদির দোকানে যাও; চিঁড়ে মুড়কি এনে খেয়ে ওই যে জলার ধারে কুঁড়েঘরটি দেখা যাচ্ছে, ওই ঘরে দুই মায়ে বেটায় আজ শুয়ে থাকোগে। আর এই বীজধানগুলি নিয়ে যাও। কাল সকালে উঠে ওই মাঠে ঘাটে সব ছড়িয়ে দিও, তাহলে আর তোমাদের কষ্ট থাকবে না।’ তখন বিশু বীজধানগুলি মায়ের আঁচলে ফেলে দিয়ে, অপর ধানগুলি নিয়ে দোকানে গেল। দোকানি মুড়ি, চিঁড়ে, মুড়কি, ছাতু, নাড়ু, দই, দুধ সব দিলে। সেইগুলি নিয়ে মাকে সঙ্গে করে কুঁড়েঘরে গেল। স্থানটি পরিষ্কার করে সেইগুলি সব ক্ষেত্রদেবীকে নিবেদন করে, মায়ে বেটায় অর্ধেক খেয়ে, অর্ধেক পরদিন খাবার জন্য রেখে দিলে। তার পরদিন স্নান করে শুদ্ধাচারে বীজধানগুলি ঘাটে মাঠে ছড়িয়ে দিলে। তারপর বাসি চিঁড়ে, মুড়কি যা ছিল, দুজনে খেয়ে শুয়ে রইল।

তার পরদিন সকালে মায়ে পোয়ে উঠে দেখে যে, এক দিনেই ধানের গাছ হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখে ধানগাছে সোনার ধান ফলেছে। কতকগুলো লোক গিয়ে সেই দেশের জমিদারকে খবর দিলে। জমিদার সেখানে এসে, স্বচক্ষে দেখে বিশুর আদ্যোপান্ত বৃত্তান্ত সমস্ত শুনে আশ্চর্য হলেন। আর বিশুকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিশুর পৈতা দিয়ে, তাঁর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, সেইজমি বিশুকে যৌতুক দিলেন। বিশু সোনার ধান কেটে মরাই বাঁধলে; কতক হাটে বেচলে, কতক কুঁড়েঘরে তুলে রাখলে। বিশুর সুখ আর ধরে না। ক্রমে বিশুর খুব বড়ো বাড়ি আরম্ভ হল। দেশ-দেশান্তর থেকে রাজমজুর এসে খাটতে লাগল। ওখানে বিশু বাড়ি থেকে চলে আসায়, তার মামা-মামির লক্ষ্মী ছেড়েছে, ক্ষেত্রদেবী বিরূপ হয়েছেন। মামা মামি খেতে না-পেয়ে খাটতে বেরিয়েছেন। অপর গ্রামে এক নূতন জমিদার বাড়ি করছে শুনে সেখানে গেলেন। তাঁরা সেখানে খোয়া ভাঙছেন, তাগাড় মাখছেন, ইট বইছেন, এমন সময় বিশু দেখতে পেয়ে, মাকে বললে, ‘ওমা! সর্বনাশ হয়েছে, মামা-মামি খাটতে এসেছে। যাও, শীঘ্র ওঁদের আদর করে নিয়ে এস, ওঁরাই আমার ঐশ্বর্যের মূল।’

তখন বিশুর মা, দাসী পাঠিয়ে তাঁদের দুজনকে বাড়ির ভিতর আনালেন। বিশু ও বিশুর মাকে দেখে মামা-মামি কেঁদে ফেললেন। বিশু মামা-মামিকে প্রণাম করে সকল কথা জিজ্ঞাসা করলে। তারপর তাঁদের তেল মাখিয়ে, স্নান করিয়ে, গরদের কাপড় পরিয়ে, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন ভাত খাইয়ে, কিছুদিন বাড়িতে রেখে আদর যত্ন করলে। আবার অগ্রহায়ণ মাস এল, শুক্লপক্ষ শনিবারে মামা-মামিকে দিয়ে ক্ষেত্রব্রত করালে। তারপর মামা-মামিকে ধনদৌলত দিয়ে, দাসদাসী সঙ্গে দিয়ে পালকি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিলে। ক্ষেত্রদেবীর কৃপায় মামা-মামির ক্ষেত্রভরা ধান হল, গোয়ালভরা গোরু হল, দাসদাসী, হাতি, ঘোড়া হল। কিছুদিন পরে মামা-মামি, বিশু আর বিশুর মাকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে আনালেন, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন ভাত, পিঠে পায়েস করে খাওয়ালেন। মামির সেদিন আর বিশুকে খাইয়ে আশ মেটে না। খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আবার মামি এক বাটি দুধ সর এনে বিশুর মুখে ধরে বললেন, ‘খাও বাবা! ওবেলা ভাত খেতে পারোনি, এইটুকু খাও।’ বিশু তখন হাসতে হাসতে বললে:

মামা মামির লাঙলা বিশু
জলার ধারে ঘর।
এখন কেন বিশুর মুখে
বাটি ভরা সর?

মামি তখন লজ্জায় মুখ তুলতে পারলেন না। এখন লাঙলা বিশুর হাতি, ঘোড়া, দাসদাসী, ধনদৌলত কিছুরই অভাব নেই। বিশু এখন বিশ্বনাথ। সেই থেকে বিশ্বনাথ আর তার মামা-মামি খুব ঘটা করে প্রতি বৎসর ক্ষেত্রব্রত করতে লাগলেন। সেই অবধি পৃথিবীতে ক্ষেত্রব্রত প্রচার হল।

ক্ষেত্রব্রত কথা সমাপ্ত।

মঙ্গলচন্ডী

মঙ্গলচন্ডী ৯ প্রকার। ১ম বারোমেসে মঙ্গলচন্ডী, ২য় হরিষ মঙ্গলচন্ডী, ৩য় জয়মঙ্গলচন্ডী, ৪র্থ কুলুই মঙ্গলচন্ডী, ৫ম সংকট মঙ্গলচন্ডী ৬ষ্ঠ সংকটা, ৭ম সোদো, ৮ম নাটাইচন্ডী, ৯ম মঙ্গল সংক্রান্তি।

১. বারোমেসে মঙ্গলচন্ডী: প্রতি মঙ্গলবারে এই পূজা করিতে হয়।

২. হরিষ মঙ্গলচন্ডী: ইহা কেবল বৈশাখ মাসের প্রত্যেক মঙ্গলবারে করিতে হয়।

৩. জয়মঙ্গলচন্ডী: ইহা কেবল জ্যৈষ্ঠ মাসে করিতে হয়।

৪. কুলুই মঙ্গলচন্ডী: ইহা কেবল অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে করিতে হয়।

৫. সংকট মঙ্গলচন্ডী: ইহা অগ্রহায়ণ বা মাঘ মাসের যে-কোনো মঙ্গলবারে করিতে হয়। ইহাকে উদ্ধারচন্ডীও বলে।

৬. সংকটা: সংকটে পড়িলে ইহা যে-কোনো শুক্রবারে করিতে হয়।

৭. সোদো: পৌষ মাসের সংক্রান্তির দিনে এই পূজা করিতে হয়।

৮. নাটাইচন্ডী: অগ্রহায়ণ মাসে প্রতি রবিবারে সায়াহ্নে এই পূজা করিতে হয়।

৯. মঙ্গল সংক্রান্তি: যে মাস ৩০ দিনে সেই মাসের সংক্রান্তি যদি মঙ্গলবারে এবং শুক্লপক্ষে হয় তবে তাহাকে মঙ্গল সংক্রান্তি বলে। ওই দিনে এই পূজা করিতে হয়।

বারোমেসে মঙ্গলচন্ডী

উজ্জয়িনী নগরে ধনপতি নামে এক সওদাগর ছিলেন। তাঁর ছেলে মেয়ে না হওয়ায়, তিনি আবার বিয়ে করলেন। বড়ো বউ-এর নাম লহনা, ছোটোর নাম খুল্লনা। দুই সতীনে খুব ভাব। বড়ো বউ সর্বদা মা মঙ্গলচন্ডীর কাছে প্রার্থনা করেন, কী করে খুল্লনার একটি ছেলে হবে! কত হোম-যাগ করে খুল্লনার গর্ভ হল। যখন পাঁচমাস গর্ভ, তখন ধনপতি বাণিজ্যের নৌকা সাজিয়ে লহনাকে বললেন, ‘আমি কাল সকালে সিংহল যাত্রা করবো। আমাদের বাপ, পিতামহ সকলেই বাণিজ্য করে জীবন কাটিয়েছেন। ঘরে বসে থাকলে কেমন করে চলবে!’ লহনা এই কথা শুনে, চোখের জল মুছে বললেন, ‘আমি তোমাকে এমন কথা বলতে চাই না যে, তুমি চিরকাল মেয়ে মানুষের মতো ঘরে বসে থাকো। তবে কিনা মা মঙ্গলচন্ডীর কৃপায় বোধ হয় খুল্লনা পোয়াতি হয়েছে। এ সময়ে তার প্রাণে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। তাই বলি, যা-হোক একটা ছেলে মেয়ে হলে তুমি দেখে তারপর যেও।’ ধনপতি খুশিহয়ে বললেন, ‘কই, এত দিন তো আমায় কোনো কথা বলোনি, তাহলে আমি যাবার এত আয়োজন করতাম না। এখন তো আর অন্যথা করবার উপায় নেই। তুমি থাকলেই খুল্লনা সুখে থাকবে; আমি জানি, আমার চেয়ে তুমি খুল্লনাকে বেশি ভালোবাস।’

খুল্লনা যে পোয়াতি, লহনা তাহা এতদিন ধনপতিকে বলেননি; ভেবেছিলেন কপাল তো তেমন নয়, এখন কোনো গোল করবো না। কথাটা পেটে রেখে এখন অনর্থ ঘটল, আর-তো উপায় নেই। রাত্রি প্রভাত হল, ধনপতি খুল্লনার হাতখানি লহনার হাতে সঁপে দিয়ে, বাণিজ্যের জিনিস নিয়ে, নৌকা সাজিয়ে, সিংহল যাত্রা করলেন। এখানে দশমাস দশদিনে খুল্লনা চাঁদের মতো একটি পুত্র প্রসব করলেন; কিন্তু ধনপতি সওদাগরের আর কোনো খবর পাওয়া গেল না। কেউ বললে, ‘মহাসমুদ্রে নৌকা ডুবে গেছে’; কেউ বললে, ‘দিকভ্রম হয়ে অন্যদিকে চলে গেছে।’ এই রকম নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল। লহনা ও খুল্লনা ছেলেটিকে বুকে করে দুঃখেকষ্টে দিন কাটাতে লাগলেন। ছেলেটিকে অতি সুন্দর শ্রীমান দেখে সকলে তার নাম রাখল শ্রীমন্ত।

শ্রীমন্ত দেখতে দেখতে পাঁচ বছরের হল। লহনা তার হাতে খড়ি দিয়ে তাকে পাঠশালে দিলেন। শ্রীমন্তকে পাঠশালে পাঠিয়ে দুই সতীনে মণিহারা ফণিনীর মতো পথপানে চেয়ে থাকেন। শ্রীমন্ত ঘরে এলে দুই সতীনে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পান। কী খাওয়াবেন, কীসে সন্তুষ্ট করবেন, কিছুই ঠিক করতে পারেন না। এমনি করে বারো বৎসর কেটে গেল। একদিন শ্রীমন্তর আসতে দেরী দেখে লহনা, খুল্লনা পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় শ্রীমন্ত কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি আসছে। লহনা তাড়াতাড়ি ছেলেকে কোলে করে কত আদর করতে করতে বলতে লাগলেন, ‘কী হয়েছে বাবা, কাঁদছ কেন যাদু, চুপ করো।’ এই বলে ঘরে এনে দুধ সন্দেশ খাওয়াতে বসলেন। ছেলে কিছুতেই খেলে না, অনেক সাধাসাধির পর শ্রীমন্ত বললে, ‘মা আমাকে যদি সত্যি কথা বলো, তবেই আমি খাব, নইলে আজই আমি মরব। আমি কার গর্ভে জন্মেছি, আর আমার বাবার নামই বা কী? আমাকে আজ পাঠশালার ছেলেরা বড়ো অপমান করেছে। আমায় রোজ রোজ কত কী বলে, তা তোমাদের কাছে কী করে বলবো।’

তখন লহনা কাঁদতে কাঁদতে সব কথা খুলে বললেন, ‘তুমি খুল্লনার ছেলে, কিন্তু আমাদের দুজনেরই প্রাণ। আমি তোমার সৎমা। যখন তুমি পাঁচ মাস পেটে, তখন তোমার পিতা ধনপতি সওদাগর, সপ্ততরী সাজিয়ে সিংহল যাত্রা করেছেন। ঠিক আজ চৌদ্দ বৎসর হল। এখন শুনতে পাই, সিংহল দ্বীপের রাজা শালিবান তোমার পিতার সমস্ত ধন কেড়ে নিয়ে তাঁকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছেন।’ এই কথা বলে লহনা খুল্লনা কাঁদতে লাগলেন। তখন শ্রীমন্ত কাঁদতে কাঁদতে বললে, ‘মা, এত দিন আমায় এ কথা বলনি কেন? এখন যা হবার তা হয়েছে, আমি একবার সিংহল দ্বীপে গিয়ে বাবার খোঁজ করবো। আমায় হাসি মুখে বিদায় দাও ভালোই, নচেৎ আমি তোমাদের না বলে পালিয়ে যাব। আমি ধনপতি সওদাগরের ছেলে হয়ে, কিনা দশজনের কথা শুনে মাথা হেঁট করে থাকব। ছি: ছি:, তা কখনোই হবে না! মা, তোমাদের কোনো ভয় নেই, আমাকে যেতে দাও, আমি নিশ্চয়ই বাবার খবর নিয়ে ঘরে ফিরে আসবো।’

লহনা-খুল্লনা এই-না শুনে শ্রীমন্তকে কোলে করে কত কাঁদলেন, কত বোঝালেন, তবু ছেলে কিছুতেই শুনল না। ছেলের এক কথা—আমাকে যেতে দাও ভালোই, নইলে না বলে পালিয়ে যাব। তখন লহনা-খুল্লনা আর কী করেন, কাজেই দুই সতীনে পরামর্শ করে বিশ্বাসী মাঝিকে ডাকালেন। লহনা-খুল্লনা মা মঙ্গলচন্ডীর পূজা করে শ্রীমন্তর সাজসজ্জা করে দিয়ে, মাথার তাজের ভিতর মা মঙ্গলচন্ডীর অর্ঘ্য দিলেন। আর বলে দিলেন, ‘দেখো বাবা, যদি কখনো কোনও বিপদে পড়, অমনি একমনে মা মঙ্গলচন্ডীর নাম করবে, তাহলে কোনো বিপদ থাকবে না। এই বলে দিয়ে তাঁরা পাড়ার সব এয়োসুয়ো নিয়ে শ্রীমন্তকে সঙ্গে করে নদীর ধারে ডিঙি বরণ করতে এলেন। সাতখানি নৌকা সাজিয়ে মাঝি অপেক্ষা করছিল, দুই সতীনে মাঝিকে বেশকরে বলে দিলেন, যেন কোনো অমঙ্গল না ঘটে। দুধের ছেলেকে বিশ্বাসী মাঝির হাতে সঁপে দিলেন। পাড়ার সব মেয়েরা শ্রীমন্তকে বরণ করে কাঁদতে লাগল। শ্রীমন্ত মায়ের ও বিমাতার পায়ের ধুলো নিয়ে, মা মঙ্গলচন্ডীর নাম স্মরণ করে, সকলের নিকট বিদায় নিয়ে নৌকায় যাত্রা করলেন। লহনা-খুল্লনা মা মঙ্গলচন্ডীকে ডাকতে ডাকতে বলতে লাগলেন, ‘দেখো মা দয়াময়ী, যেন আমাদের শ্রীমন্তের কোনো বিপদ না হয়। মা মঙ্গলচন্ডী, মঙ্গল করো মা!’ এই বলে তাঁরা চক্ষের জলে বুক ভাসালেন। এদিকে শ্রীমন্তর নৌকা কত দূরে ভেসে ভেসে যেতে লাগল। যখন আর দেখা যায় না তখন সকলেই কাঁদতে কাঁদতে মা মঙ্গলচন্ডীকে ডাকতে ডাকতে ঘরে ফিরলেন।

দিনের পর দিন যায় দুই সতীনে আহার নিদ্রা ত্যাগ করে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিন কাটাতে লাগলেন। এখানে শ্রীমন্ত কত নদনদী পার হয়ে, নানা দেশ দেখতে দেখতে যাচ্ছে, এমন সময় গঙ্গার মোহানায় এসে মঙ্গলচন্ডীর নাম ভুলে গেল। তখনই নৌকা পাখানায় পড়ে যায় যায় হল, একখানি মালের নৌকা ডুবে গেল। শ্রীমন্তর তখন মঙ্গলচন্ডীর নাম স্মরণ হল। অমনি মা মঙ্গলচন্ডীর দয়া হল, সকলের প্রাণরক্ষা হল। নৌকা এসে সাগরে পড়ল। সাগরে যেতে যেতে আবার আকাশে মেঘ দেখা দিলে। দেখতে দেখতে ঝড় উঠল, নৌকা যায় যায় হল; শ্রীমন্ত তখন ‘মা মঙ্গলচন্ডী রক্ষা করো,’ ‘মা মঙ্গলচন্ডী রক্ষা করো’ বলে আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে ডাকতে লাগল। মায়ের নামের এমনি গুণ, তাঁর দয়াতে সব ঝড় কোথায় উড়ে গেল। মাঝি, মাল্লা, নৌকা সব রক্ষা হল। শ্রীমন্ত মনের সুখে নির্ভয়ে আবার যেতে লাগল।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস যেতে লাগল। লহনা-খুল্লনা আধমরা হয়ে বেঁচে আছেন; কিন্তু প্রায় রোজই মা মঙ্গলচন্ডী স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, ‘তোমরা কেন কাঁদছ মা, কোনো ভয় নেই, শ্রীমন্ত বেশ ভালো আছে। কার সাধ্যি আমার শ্রীমন্তর অমঙ্গল করে!’ এই স্বপ্ন দেখে দুই সতীনে অনেকটা সুস্থ থাকেন। ওখানে শ্রীমন্ত নৌকা করে যেতে যেতে দেখলে জলের উপর একটি পদ্মফুল ফুটে আছে, সেই পদ্মের উপর একটি দেবী, হাতি কোলে করে তার শুঁড় গিলছেন, আবার উগরে ফেলছেন। শ্রীমন্ত এই-না দেখে আশ্চর্য হয়ে ‘জয় মা মঙ্গলচন্ডী,’ ‘জয় মা মঙ্গলচন্ডী’ বলে ডাকতে লাগল। ক্রমে যেতে যেতে নৌকা সিংহলে পৌঁছল। ঘাটে উঠে শ্রীমন্ত একেবারে শালিবান রাজার সভায় গেল।

রাজা শ্রীমন্তকে দেখে কাছে বসিয়ে নানা কথা জিজ্ঞাসা করলেন। শ্রীমন্ত মিষ্টি কথায় রাজার সব কথার উত্তর দিলে। শেষে রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি আসতে আসতে কিছু আশ্চর্য দেখেছ?’ শ্রীমন্ত, বললে, ‘মহারাজ! সমুদ্রে এক আশ্চর্য দেখেছি। পদ্মের উপরে বসে একটি স্ত্রীলোক হাতি গিলছে আবার উগরে ফেলছে।’ এই কথা শুনে রাজা রেগে বললেন, ‘কে আছিস রে? এই বেটাকে ধর তো, এ বেটাও আমার সঙ্গে চালাকি করছে। যত বেটা আসে, সকলেই ওই এককথা বলে, কিন্তু কোনো বেটা দেখাতে পারে না। ওহে বাপু! তুমি সমুদ্রে গিয়ে আমাকে ‘কমলেকামিনী’ দেখাতে পারবে?’ শ্রীমন্ত বললে, ‘কেন পারব না মহারাজ! আপনি আমার সঙ্গে চলুন, দেখাব।’ তখন রাজা লোকজন নিয়ে শ্রীমন্তর সঙ্গে সমুদ্রের ধারে এলেন, কিন্তু শ্রীমন্ত কিছুই দেখাতে পারলে না। তখন রাজা রেগে বললেন, ‘জহ্লাদ! এর মাথা কেটে নিয়ে এসে আমায় দেখাও।’ হুকুম পেয়ে চারিজন জহ্লাদ শ্রীমন্তের হাত দুখানি বেঁধে মশানে কাটতে নিয়ে গেল। রাজাও রাজসভায় চলে গেলেন।

শ্রীমন্ত কাঁদতে কাঁদতে জহ্লাদের সঙ্গে মশানে গেল। জহ্লাদেরা যখন খাঁড়া উঁচিয়ে কাটতে যায়, তখন শ্রীমন্ত কেঁদে বললে, ‘তোরা একটু অপেক্ষা কর, আমি আমার মাকে একবার ডেকে নিই।’ শ্রীমন্ত লহনা-খুল্লনার স্নেহ ও ভালোবাসা মনে করে অনেক কাঁদলে। তারপর মা মঙ্গলচন্ডীকে একমনে ডাকতে লাগল। তখন মা মঙ্গলচন্ডী আর থাকতে পারলেন না। তখন তিনি এক বুড়ির বেশ ধরে মশানে এসে শ্রীমন্তকে কোলে করে বসলেন। জহ্লাদেরা যেমনি কাটতে যাবে, অমনি তাদের খাঁড়া ভেঙে পড়ে গেল। তখন তারা ভয়ে পালিয়ে গেল। একজন দৌড়ে গিয়ে রাজাকে বললে, ‘মহারাজ! সেই ছোঁড়াটা কী সব মন্ত্রতন্ত্র আওড়ালে, আর কোথা থেকে একটা বুড়ি এসে তাকে কোলে করে নিয়ে বসল। কাটতে গেলুম, খাঁড়া ভেঙে গেল। আমাদের এমন সাহস হচ্ছে না-যে তার কাছে যাই।’

এইকথা শুনে রাজা রেগে লোকজন নিয়ে মশানে গেলেন। সেই বুড়ি এমন এক একটা হুঙ্কার করছে যে, সেই শব্দ শুনে রাজার প্রাণ উড়ে গেল। রাজা মশানে আসতেই বুড়ি এমনি এক বিকট হুঙ্কার করে রাজার দিকে চাইলে যে, লোকজনগুলো কে-কার ঘাড়ে পড়ে! সেই সময় অমনি মঙ্গলচন্ডীর ভূতপ্রেতগুলো রাজাকে আর তাঁর লোকজনদের কিল চড় লাথি মারতে লাগল। কে যে মারছে তা আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না। মারের চোটে সকলে আধমরা হয়ে গেল। তখন রাজা সেই বুড়ির অনেক স্তব করতে লাগল। বুড়ি স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে রাজাকে বললে, ‘দেখ, এই বালক কী অপরাধ করেছে যে, একে তুই বধ করতে মশানে পাঠিয়েছিস?’ রাজা বললেন, ‘ওই বালক মিথ্যাকথা বলেছে, তাই ওকে বধ করবার হুকুম দিয়েছি।’ তখন বুড়ি বললে, ‘ও বালকের কোনো দোষ নেই, তুই পাপী তাই তোর পাপচক্ষে সেই ‘কমলেকামিনী’ দেখতে পাসনি। তোর পাপের ইয়ত্তা নেই। তুই বিনাদোষে এর প্রাণবধ করছিলি। এর বাপকে কারাগারে রেখেছিস। এই রকম কত লোককে তুই বিনাদোষে কারাগারে বন্দি করে রেখেছিস। যদি ভালো চাস তো সকলকে তুই ছেড়ে দে। আর এই বালক, শ্রীমন্ত আমার ব্রতদাস। উজ্জয়িনী নগরের ধনপতি সওদাগরের ছেলে। সেই সওদাগরের যত ধনদৌলত তুই কেড়ে নিয়েছিস; তার চতুর্গুণ যৌতুক দিয়ে, তোর মেয়ে সুশীলার সঙ্গে শ্রীমন্তর বিয়ে দিবি। যদি না দিস, তাহলে এখনি তোকে সবংশে মেরে ফেলব।’ এই বলে বুড়ি আবার হুঙ্কার ছাড়লে। হুঙ্কার শুনে রাজা জোড়হাত করে বললেন, ‘মা, আমি সব বুঝতে পেরেছি। আমি এখনি আপনার হুকুম পালন করছি, কিন্তু দয়া করে একবার আপনার ‘কমলেকামিনী’ মূর্তিটি দেখান।’ তখন বুড়ি বললে, ‘যাও, সেই ঘাটে গেলেই দেখতে পাবে।’ এই বলে তিনি অন্তর্ধান হলেন। যাবার সময় শ্রীমন্তকে বলে গেলেন, ‘বাবা, তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি রাজকন্যাকে বিয়ে করে বাপের সঙ্গে নিজের দেশে চলে যাও।’

তখন রাজা শ্রীমন্তকে সঙ্গে করে লোকজন নিয়ে সেই ঘাটে গেলেন। শ্রীমন্ত বললে, ‘মহারাজ, ওই দেখুন।’ কিন্তু রাজা পাপ চক্ষে দেখতে পেলেন না। তারপর তিনি শ্রীমন্তকে কোলে নিতেই তাঁর দিব্যচক্ষু হল। তখন রাজা প্রাণভরে কমলেকামিনী দর্শন করে, শ্রীমন্তকে লক্ষ লক্ষ চুমু খেলেন। বললেন, ‘বাবা, তোমার কৃপায় আজ মাকে দর্শন করলুম।’ তারপর তিনি বাড়িতে এসেই আগে ধনপতি সওদাগরকে মুক্ত করলেন। অপর বন্দিদেরও সেই সঙ্গে মুক্তি দিলেন। শালিবান রাজা ধনপতিকে শ্রীমন্তর সমস্ত বিষয় বলে মা মঙ্গলচন্ডীর আদেশ পালন করতে বললেন। পিতা-পুত্রের পরিচয় হল, শ্রীমন্ত পিতাকে প্রণাম করলেন। ধনপতি পুত্রকে পেয়ে আহ্লাদে কোলে করে চুমু খেলেন। রাজা ধনপতিকে বিস্তর পূজা করলেন। শুভদিনে শ্রীমন্তকে সুশীলা কন্যা দান করলেন। সকলেরই খুব আনন্দ। অপর লোকেরা শ্রীমন্তকে আশীর্বাদ করতে লাগলেন, বললেন, ‘বাবা, তোমা হইতে আমরা মুক্ত হলেম।’ রাজা তাদের সমস্ত ধন ফিরিয়ে দিয়ে দেশে পাঠালেন। দুই বেয়াইয়ে কোলাকুলি হল, রাজা সওদাগরকে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে ঝি-জামাই পাঠালেন। মা মঙ্গলচন্ডীর কৃপায় ধনপতি সওদাগর বৌ-বেটা নিয়ে দেশে যাত্রা করলেন।

এখানে লহনা-খুল্লনা নিয়মমতো প্রতি মঙ্গলবারে মঙ্গলচন্ডীর বারো মাস পূজা করেন। সর্বদা মঙ্গলচন্ডীকে বলেন, ‘মা! যা হবার তা হয়েছে, সওদাগর তো আর ফিরলেন না, এখন দুঃখিনীর ধন, অন্ধের নয়ন, আমাদের শ্রীমন্তকে ফিরিয়ে দাও মা!’ এমনি করে রোজই কাঁদেন। ক্রমে দুঃখের রাত্রি পোহাল; মার দয়াতে ধনপতি সওদাগর সমুদ্দুর পার হয়ে নির্বিঘ্নে নিজের দেশে এসে ঘাটে উঠে দামামায় ঘা দিলেন। অমনি চারিদিকে প্রচার হল—‘ধনপতি সওদাগর, ছেলে-বউ সঙ্গে নিয়ে দেশে এসেছেন।’ এই কথা শুনে চারিদিক হতে লোকজন সব ঘাটে যেতে লাগল। লহনা-খুল্লনা আনন্দে অধীর হয়ে, পাড়ার এয়োসুয়ো নিয়ে ঘাটে ডিঙি বরণ করতে এলেন। লহনা শ্রীমন্তকে কোলে নিলেন, খুল্লনা বউকে কোলে নিলেন। সকলে আনন্দ করতে করতে বাড়ি ফিরলেন। বাড়িতে এসেই মহাঘটা করে মঙ্গলচন্ডীর পূজা করলেন। লহনা-খুল্লনার দুঃখ দূর হল। শ্রীমন্তকে পেয়ে তাঁদের যেন আগুনে জল পড়ল। সকলেই বলতে লাগল, ‘লহনা-খুল্লনার ভক্তির গুণে মা মঙ্গলচন্ডীর কৃপায় পতি-পুত্র-বৌ-বেটা সব পেলে।’ ধনপতি সওদাগর মনের আহ্লাদে বৌ-বেটা ও দুই স্ত্রী নিয়ে সুখে ঘর করতে লাগলেন। তিনি দেশে দেশে মা মঙ্গলচন্ডীর দয়ার কথা প্রচার করতে লাগলেন। সেইথেকে চারিদিকে বারোমেসে মঙ্গলচন্ডীর পূজা প্রচার হল।

বারোমেসে মঙ্গলচন্ডীর ব্রতকথা সমাপ্ত।

হরিষ মঙ্গলচন্ডী

বৈশাখ মাসের

এক ব্রাহ্মণীর এক গোয়ালিনী সই ছিল। ব্রাহ্মণী বৈশাখ মাসের মঙ্গলবারে হরিষ মঙ্গলচন্ডীর ব্রত করতেন। গোয়ালিনী কোনো ব্রত করত না। একদিন গোয়ালিনী বললে, ‘সই! এ ব্রত করলে কী হয়?’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘এ ব্রত করলে কখনো চক্ষের জল পড়ে না, চিরকাল মনের হরিষে কাটে।’ এই কথা শুনে গোয়ালিনী বললে, ‘তবে আমিও এ ব্রত করব।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘এ বড়ো কঠিন ব্রত, তুমি গয়লার মেয়ে, এ ব্রতের নিয়ম পালন করতে পারবে না। তোমার এ ব্রত করে কাজ নেই।’ গোয়ালিনী বললে, ‘সই! তা হবে না, এমন ব্রত আমি করতে পাব না? যত কষ্ট হোক, আমি এ ব্রত করবই।’ তখন ব্রাহ্মণী ব্রতের নিয়ম বলে দিলেন। গোয়ালিনী বৈশাখ মাসের মঙ্গলবারে ব্রত আরম্ভ করলে। দুই এক বার ব্রত করতেই মা মঙ্গলচন্ডীর অনুগ্রহ হল। তাঁর কৃপাদৃষ্টিতে গোয়ালিনীর আর সুখ ধরে না; ধন ঐশ্বর্যের সীমা নেই। হঠাৎ এত সুখ গয়লার মেয়ের আর সহ্য হল না। কাঁদবার জন্যে তার প্রাণ আকুল হয়ে উঠল।

একদিন গোয়ালিনী ব্রাহ্মণীর কাছে গিয়ে বললে, ‘সই! আমার বড়ো সুখ, একবার কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে।’ ব্রাহ্মণী শুনেই অবাক। বললেন, ‘সে কি! তোমার এক সৃষ্টিছাড়া বায়না। আমি তোমায় তখনি তো বলেছি যে, এ ব্রত করলে কখনো চোখের জল পড়ে না। এই জন্যই এ ব্রতের নাম ‘হরিষ মঙ্গলচন্ডী।’ গোয়ালিনী বললে, ‘তা হবে না, আমি কাঁদব, আমার বড়ো কান্না পারছে। না কাঁদলে আমার প্রাণ আর থাকে না।’ তখন ব্রাহ্মণী বললেন, ‘তোমার যদি এত কাঁদতে ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে এক কাজ করো,—ওই বেনেদের ক্ষেতে লাউগাছ হয়েছে, তুমি তাই কেটে আনো। যখন তারা তোমায় খুব গালাগালি দেবে, তখন তুমি মনের দুঃখে খুব কেঁদো।’ গোয়ালিনী তাই করলে; কিন্তু ব্রতের মাহাত্ম্যে তার শরীর শুদ্ধ হওয়ায়, তার হাত লাগতেই, লাউগাছ খুব গজিয়ে উঠল। সকলে বলতে লাগল, ‘ইনি তো সামান্য মেয়ে নন, স্বয়ং লক্ষ্মী ঠাকরুণ!’ তারপর তারা গয়লার মেয়ের বাড়িতে অনেক লাউ, লাউশাক দিয়ে এল। গোয়ালিনীর আর কাঁদা হল না। সে ব্রাহ্মণীর কাছে গিয়ে বললে, ‘সই! সব উলটো হল,—লাউগাছ আরও গজিয়ে উঠল, তারা সব লাউ, লাউশাক আমাকে দিয়ে গেল। এতে সুখ আরও বেড়ে গেল সই, আমার তো কাঁদা হল না।’

ব্রাহ্মণী বললেন, ‘তাই তো! তবে আর এক কাজ করো। রাজার হাতিটা মারা গেছে, সেটা পাঁদাড়ে পড়ে আছে, তুমি ওই হাতিটার গলা ধরে মড়া কান্না কাঁদগে।’ সে তাই করলে, কিন্তু ব্রত্যের মাহাত্ম্যে তার হাত হাতির গায়ে লাগতেই, হাতিটা বেঁচে উঠল। সকলে আশ্চর্য হয়ে বললে, ‘ইনি তো সামান্য মেয়ে নন, স্বয়ং ভগবতী।’ রাজা এসে গোয়ালিনীর অনেক স্তব-স্তুতি করতে লাগলেন। তারপর সোনা-দানা, হাতি-ঘোড়া দিয়ে গোয়ালিনীর বাড়ি-ঘর ভরিয়ে দিলেন। এবারও গোয়ালিনীর সুখ বেড়ে গেল, আর কাঁদা হল না। তখন সে আবার ব্রাহ্মণীর কাছে গিয়ে বললে, ‘সই! আমার যে ক্রমাগতই সুখ বেড়ে যাচ্ছে, কাঁদা তো হল না।’ ব্রাহ্মণী সব শুনে বললেন, ‘তাই তো! আচ্ছা, আর এক কাজ করো। যদি তোমার এতই কাঁদতে ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে সাপের বিষ মাখিয়ে লাড়ু তৈরি করে তোমার মেয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দাও।’ গোয়ালিনী তাই করলে, সত্যি সত্যি লাড়ু তৈরি করে, তাতে বিষ মাখিয়ে, ছেলেকে দিয়ে মেয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দিলে। ছেলে হাঁড়িটা নিয়ে যেতে যেতে, বৈশাখ মাসের দারুণ রোদে ঘেমে আর চলতে পারলে না। না পেরে, একটা পুকুরপাড়ে হাঁড়ি রেখে নাইতে গেল। মা মঙ্গলচন্ডী দেখলেন, আমার ভক্তের দুর্মতি হয়েছে। তবে যতদিন আমার ব্রত করবে, ততদিন ওর চোখের জল ফেলতে দেব না। এই বলে, তিনি অমৃত দিয়ে, বিষের লাড়ু অমৃতের লাড়ু করে দিলেন।

ছেলে স্নানকরে উঠে হাঁড়ি থেকে একটা লাড়ু বার করে খেলে। খেয়ে বললে, ‘আহা! মা আমার এমন লাড়ু তৈরি করতে জানেন, দিদি খেয়ে কত সুখ্যাতিই করবে।’ এই বলে সে পুকুর থেকে জল খেয়ে, সেই হাঁড়ি নিয়ে দিদির বাড়ি গেল। গিয়ে বললে, ‘দিদি, মা কেমন চমৎকার লাড়ু তৈরি করে দিয়েছেন—খেয়ে দেখো!’ মেয়ে, জামাই ও বাড়ির সকলে সেই অমৃতের লাড়ু খেয়ে খুব সুখ্যাতি করতে লাগল, সকলেই ধন্যি ধন্যি করতে লাগল। এদিকে গোয়ালিনী কাঁদবার জন্যে এলোচুল করে হাঁ করে পথ পানে চেয়ে আছে,—কখন ছেলে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলবে যে, মা, দিদি মরে গেছে। কিন্তু হায় হায়, সকলি উলটো হল। খানিক পরে ছেলে এসে বললে, ‘মা কি চমৎকারই লাড়ু করেছ, বাড়িশুদ্ধু লোকে খেয়ে কত সুখ্যাতি করতে লাগল। তারা আবার চেয়েছে। আমাকে ওই রকম লাড়ু করে দাও মা।’ গোয়ালিনী বললে, ‘সর্বনাশ! কিছুতেই কাঁদা হল না।’ তখন সে রেগে সইয়ের কাছে গিয়ে বললে, ‘সই! এ কী হল? কিছুতেই কাঁদতে পেলুম না! এবার না কাঁদতে পেলে আমি মরে যাব।’ ব্রাহ্মণী বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এক কাজ করো, তুমি আর মঙ্গলবার করো না।’ গোয়ালিনী বললে, ‘সেই ঠিক, কাল মঙ্গলবার, কাল থেকে আর পুজো করছি না!’

এই ঠিক করে গোয়ালিনী মঙ্গলবারের ব্রত উপবাস বন্ধ করে দিল। মা মঙ্গলচন্ডী বিরূপ হলেন। অমনি তার লোকজন, হাতি, ঘোড়া, ছেলে, মেয়ে সব মরে গেল! তখন গোয়ালিনী কেঁদে হাহাকার করে পাড়া মাথায় করে তুললে। তার কান্না শুনে কেউ আর তিষ্ঠুতে পারলে না। সে দিবা-রাত্রি কেঁদে কেঁদে হয়রান হয়ে আবার সইয়ের কাছে গেল। বললে, ‘সই! আমার সর্বনাশ হয়েছে—আমার সব মরে গেছে! আর কাঁদতে পারি না, আমার এ কী হল সই! তুমি রক্ষা করো।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘সে কী! তোমার এত দিনের সাধ, এখন প্রাণ ভরে কাঁদো।’ গোয়ালিনী বললে, ‘আমার প্রাণ ফেটে যাচ্ছে—আর কথা কইতে পাচ্ছি না। তুমি আমায় বাঁচাও, নইলে এই দেখো, আমিও মরি।’ এই বলে গোয়ালিনী বুক চাপড়াতে লাগল। তখন ব্রাহ্মণীর দয়া হল—বললেন, ‘আসছে মঙ্গলবার পর্যন্ত এই ক-টা দিন অপেক্ষা করো। যেন মড়া পুড়িও না, যে-যেখানে যেমন আছে তেমনি থাকুক। তুমি রোজ মা মঙ্গলচন্ডীর স্তব পাঠ করো, পুজো করো। তারপর মঙ্গলবারে উপোস করে ঘটের জল সব মড়ার গায়ে ছড়িয়ে দিও। তাহলে যদি তাঁর দয়া হয়।’ গোয়ালিনী তাই করলে—ভক্তি করে রোজ মা মঙ্গলচন্ডীর পুজো করতে লাগল, স্তব পাঠ করতে লাগল, মনের সহিত মাকে ডাকতে লাগল। এই রকমে ক-টা দিন কাটিয়ে, মঙ্গলবার উপোস করে একমনে ঘট ধরে কাঁদতে লাগল। তখন মার দয়া হল। মা আর থাকতে পারলেন না। অমনি আকাশ থেকে দৈববাণী হল—‘এই ঘটের জল সব মড়ার উপর ছড়িয়ে দে।’ অমনি গোয়ালিনী তাড়াতাড়ি উঠে সকলকার গায়ে ঘটের জল ছড়িয়ে দিতেই, সবাই বেঁচে উঠল। তখন সে আহ্লাদে ব্রাহ্মণীর বাড়ি গিয়ে, তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে, হাসিমুখে বললে, ‘যথার্থই মা মঙ্গলচন্ডী দয়াময়ী। এমন না হলে মার দয়া! সই! তোমার আশীর্বাদে মার দয়া হয়েছে,—সবাই বেঁচে উঠেছে।’

গোয়ালিনীর এই ব্যাপার দেখে, পাড়াশুদ্ধ লোক সকলেই হরিষ মঙ্গলচন্ডীর ব্রত করতে লাগল। সেই থেকে দেশ-বিদেশে এই ব্রত প্রচার হল। বৈশাখ মাসে এই হরিষ মঙ্গলচন্ডীর ব্রত যে ভক্তি করে করে, সে চিরকাল মনের হরিষে থাকে। তার কখনও চোখের জল ফেলতে হয় না। এই হরিষ মঙ্গলচন্ডীর ব্রতকথা যে-বলে বা শোনে, তারও মঙ্গল হয়।

হরিষ মঙ্গলচন্ডীর ব্রতকথা সমাপ্ত।

জয় মঙ্গলবারের ব্রতকথা

এক দেশে একজন সওদাগর আর একজন বেনে বাস করত। সওদাগরের সাত ছেলে, মেয়ে একটিও হয়নি; বেনের সাত মেয়ে, ছেলে হয়নি। ‘একদিন মা মঙ্গলচন্ডী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশধরে ছলতে গেলেন। আগে গেলেন বেনের বাড়ি; গিয়ে বললেন, ‘ওমা! দুটি ভিক্ষা দাও গো।’ বেনেবউ তাড়াতাড়ি ভিক্ষা নিয়ে এল। ব্রাহ্মণী বললেন, ‘তোমার কটি ছেলে, ক-টি মেয়ে মা?’ ‘আমার সাতটি মেয়ে, ছেলে হয়নি বাছা!’ ‘ছেলে হয়নি! আমি ছেলে-আঁটকুড়ার মুখ দেখি না, মেয়ে-আঁটকুড়ার ভিক্ষা লই না।’ এই বলে ব্রাহ্মণী যেমনি চলে যাবে, অমনি বেনেবউ পায়ে ধরে কাঁদতে লাগল। ব্রাহ্মণী একটি ফুল দিয়ে বললেন, ‘এইটে ধুয়ে খেলে তোমার ছেলে হবে, তার নাম রেখো জয়দেব।’ এই বলে সেখান থেকে সওদাগরের বাড়ি চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে বললেন, ‘ওমা! দুটি ভিক্ষা দাও গো।’ সওদাগরের বউ সোনার থালে সিধে সাজিয়ে দিতে গেলেন। তাকেও ব্রাহ্মণী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার ছেলে-মেয়ে ক-টি বাছা?’ তিনি বললেন, ‘আমার ষেটের সাতটি ছেলে, মেয়ে হয়নি।’ মা মঙ্গলচন্ডী বললেন, ‘বাছা, আমি ছেলে-আঁটকুড়ার মুখ দেখি না, মেয়ে-আঁটকুড়ার দান লই না। তা বাছা, এই ফুলটি রেখে দাও, ধুয়ে জল খেও। তাহলে তোমার একটি মেয়ে হবে, তার নাম রেখো জয়াবতী।’ এই কথা বলে তিনি অন্তর্ধান হলেন। তারা সেই ফুল ধুয়ে খেতে দুজনেই অন্তঃসত্ত্বা হল। সওদাগরের মেয়ে হল, বেনের ছেলে হল। ছেলের নাম হল জয়দেব, মেয়ের নাম হল জয়াবতী। দুজনে দিন দিন বড়ো হতে লাগল। জয়াবতী ফুল তোলে, পুজো করে, মঙ্গলবার করে—কথা শোনে। একদিন জয়দেব বললে, ‘মা! আমি জয়াবতীকে বিয়ে করব।’ মা বললেন, ‘সে কি বাবা! তুমি গরিবের ছেলে—বড়ো মানুষের মেয়ে তোমার সঙ্গে বিয়ে দেবে কেন?’ তারপর মা মঙ্গলচন্ডী একদিন সওদাগরের বাড়িতে গিয়ে বললেন, ‘ওগো বাছা! তোমাদের মেয়েটি বড়ো হয়েছে, বিয়ের কী করছ? আমার কথা শোনো, অমুক বেনের ছেলের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দাও, নইলে মেয়ে বাঁচবে না।’ এই বলে মা মঙ্গলচন্ডী অন্তর্ধান হলেন। সওদাগর ভয়ে আকুল হয়ে, সেই পাত্রে জয়াবতীর বিয়ে দিলেন।

সোনা, দানা, হার, বাউটি দিয়ে, হাওদা বেঁধে হাতিতে বর-কনে পাঠিয়ে দিলেন। পথে যেতে যেতে জয়াবতীর মনে পড়ল আজ মঙ্গলবার। তখন জয়াবতী গুনগুন করে কথা বলতে লাগল। জয়দেব বললে, ‘ও-কি জয়াবতী? কী গুনগুন করছ, বিড় বিড় করে বকছ কেন?’ জয়াবতী বললে, ‘গুণগান কিছুই করিনি, আজ মঙ্গলবার, তাই মা মঙ্গলচন্ডীর কথা শুনছি।’ জয়দেব বললে, ‘মঙ্গলবার করলে কী হয়?’ জয়াবতী বললে, ‘হারালে পায়, স্বামী-পুত্র জলে ডোবে না, আগুনে পোড়ে না, মরলে বাঁচে?’ খানিক পথে গিয়ে জয়দেব বললে, ‘জয়াবতী! এখানে বড়ো ডাকাতের ভয়! ওই যে নদী দেখছ, ওইখান থেকে ডাকাতরা এসে সব লুটপাট করে নিয়ে যায়; তোমার গায়ের সব গয়না আমায় খুলে দাও।’ জয়দেব গয়না কাপড় খুলে নিয়ে একটি পুঁটুলি করে ঝপাং করে জলে ফেলে দিলে। জয়াবতী চুপ করে রইল, কিছু বললে না; বর-কনে ঘরে গেল। জয়দেবের মা আর সাত বোন বরণ করে বর-কনে ঘরে তুললে। পাড়ার সব মেয়েরা বউ দেখতে এল। যে দেখে সেই নিন্দে করে, বলে, ‘ওমা! বড়ো মানুষের মেয়ে-যে গো? গায়ে একটু রাঙরত্তি দেয়নি। একখানি ভালো কাপড় পর্যন্ত দেয়নি।’ বেনেগিন্নি বললে, ‘চুপ করো বোন, কিছু বোলো না, আমার যেমন বরাত!’

আজ বউভাত হবে, মা মঙ্গলচন্ডী দেশের সবমাছ হরণ করলেন, কোথাও মাছ পাওয়া গেল না। সাতখানা গাঁয়ের বেনে কুটুম খেতে বলা হয়েছে; কী হবে? নদীতে জাল ফেলে একটা প্রকান্ড রাঘব বোয়াল পাওয়া গেল। সে মাছ কেউ কুটতে পারলে না। কুড়ুল ভেঙে গেল, তবু মাছ কেউ কুটতে পারলে না। জয়দেব বললে, ‘মা! জয়াবতীকে মাছ কুটতে দাও।’ জয়দেবের মা বললে, ‘তুই কি ক্ষেপেছিস? ও ছেলেমানুষ, ও কি মাছ কুটতে পারে?’ ‘হাঁ পারবে’ বলে জয়দেব বঁটি এগিয়ে দিলে। জয়াবতী ঘোমটা দিয়ে, মা মঙ্গলচন্ডীর নাম স্মরণ করে, যেমন মাছটি তুলে বঁটিতে লাগিয়েছে, অমনি মাছটি দু-খান হয়ে গেল। মাছের পেটের ভেতর থেকে জয়াবতীর সেই গয়নার পুঁটুলি, জয়াবতীর কোলের কাছে পড়ে গেল। জয়াবতী মাছ ফেলে রেখে পুঁটুলিটি নিয়ে চলে গেল। খানিক পরে ভালো কাপড় পরে, সঙ্গে হিরা-জড়োয়ার গয়না পরে, ঝম ঝম করে বাইরে এসে মাছ কুটতে বসল। সবাই অবাক হয়ে চেয়ে রইল, জয়দেব হাসতে লাগল। তারপর সকলে ভেবে অস্থির, এত লোকের রান্না কে রাঁধবে? জয়দেব বললে, ‘কেন, জয়াবতী রাঁধবে।’ জয়াবতী মাথা নেড়ে স্বীকার করলে, মা মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করে, রান্নাঘরে যেতেই এক দন্ডের মধ্যে পাঁচশো লোকের রান্না হয়ে গেল। লোকজন সব খেয়ে বলতে লাগল—‘এমন খাওয়া আমরা কখনো খাইনি। কী চমৎকার রান্না।’—বলে ধন্যি ধন্যি করে চলে গেল। কিছুদিন পরে জয়াবতীর একটি ছেলে হল। নাতির মুখ দেখে জয়াবতীর শ্বশুর-শাশুড়ি স্বর্গে গেলেন। জয়াবতী ছেলেটিকে ঘরে ঘুম পাড়িয়ে কাজকর্ম করছে, এমন সময় জয়দেব ছেলেটিকে তুলে নিয়ে কুমোরদের পনের মধ্যে গুঁজে রেখে এল। তারা যতই পনে আগুন দেয়, ততই নিবে যায়। কুমোরদের গিন্নি গিয়ে দেখে, জয়াবতীর ছেলে পনের ভেতর শুয়ে খেলা করছে। সে তখন তাড়াতাড়ি ছেলে নিয়ে জয়াবতীকে দিয়ে এল। আর একদিন জয়দেব ছেলেটিকে নিয়ে নদীর জলে ফেলে দিয়ে এল। জয়াবতী যেমন জল আনতে গেছে, তার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি উঠে এল। জয়দেব দেখে আশ্চর্য হল, কিন্তু ভ্রম গেল না। তারপর জয়াবতীর আর একটি ছেলে ও একটি মেয়ে হল। একদিন জয়াবতীর ছোটো ছেলেটি দোতালায় শুয়ে আছে, ছেলে-মেয়ে দুটি সেইখানে খেলা করছে, জয়দেব একখানি কাতান নিয়ে ছোটো ছেলেটির গায়ে কোপ মারছে, কিন্তু ছেলে কাটা যাচ্ছে না। জয়াবতী তাড়াতাড়ি জয়দেবের হাত ধরে বললেন, ‘তুমি ও কী করছ! এতবার এত পরীক্ষা করলে, তবু কী বিশ্বাস হল না! আমি তো বলছি যে, মা মঙ্গলচন্ডীর কৃপায় আমার কোনও অমঙ্গল ঘটবে না।’ তখন জয়দেব বললে, ‘তুমি যখন এমন ব্রত জানো, তা হলে আমরা মর্ত্যে থাকি কেন, চল স্বর্গে যাই।’ জয়াবতী বললে, ‘আগে ছেলে-মেয়ের বিয়ে হোক, বউ হোক, জামাই হোক, তারপর স্বর্গে যাব।’ দিন কতক পরে জয়াবতীর ছেলে-মেয়ের বিয়ে হল। মনের সুখে দিন কতক সংসার করে, জয়াবতী বউ-ঝিয়েদের ঘরকন্না বুঝিয়ে দিলে। স্বর্গ থেকে পুষ্পক রথ এল, চুয়া চন্দনের ছড়া পড়তে লাগল, ঝি-বউকে জয় মঙ্গলবারের ব্রত করতে বলে, জয়দেব ও জয়াবতী স্বর্গে চলে গেল। সেই অবধি জয় মঙ্গলবার পৃথিবীতে প্রচার হল।

জ্যৈষ্ঠ মাসের জয় মঙ্গলবারের ব্রতকথা সমাপ্ত।

অগ্রহায়ণ মাসের কুলুই মঙ্গলবারের কথা

এক ব্রাহ্মণের ঘরে মঙ্গলচন্ডীর ঘট ছিল। ব্রাহ্মণের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। মেয়েটি আইবুড়ো, সে ফুল তুলত, চন্দন ঘষত, ঠাকুর-ঘরের পাট করত—মঙ্গলচন্ডীর প্রতি তার বড়োই ভক্তি ছিল। একদিন পুজোর আয়োজন করতে গিয়ে সে দেখলে, একটি যমককলা ঠাকুরঘরে রয়েছে। কলাটি পাঁচ বার নেড়ে চেড়ে দেখে মনে করলে, এ কলায় তো ঠাকুরপুজো হবে না, তবে আমি এটি খাই। এইবলে কলাটি খেয়ে ফেললে। কিছুদিন পরে মেয়ের চোখের কোলে কালি পড়তে লাগল—অরুচি, কিছু খায় না। বাপ বলে, আমার মেয়ের কী হল! মা বলে কী হল! পাঁচজন গিন্নিকে দেখান হল—সকলেই কানাকানি করে। তার মধ্যে একজন বললে, ‘সর্বনাশী করেছিস কি! তোর মেয়ে যে পোয়াতি! এত বড়ো আইবুড়ো মেয়ে ঘরে থাকতে, পেটে ভাত যায় কেমন করে?’ মা-বাপ কী করেন, সমাজের ভয়ে মেয়েটিকে বনবাস দিয়ে এলেন। বনে থাকে, থাকতে থাকতে দশমাস দশদিনে চাঁদের মতো যমক ছেলে হল। মা মঙ্গলচন্ডী বৃদ্ধা ব্রাহ্মণীর বেশে দেখা দিলেন, পোয়াতিকে বনের ভেতর একটি কুঁড়েঘরে নিয়ে গিয়ে রাখলেন।

ছেলে দুটি চাঁদের মতো দিন দিন বাড়ে। অরণ্যবিজন-বন, নদীর ধারে চন্ডীতলায় মা-চন্ডী ছেলে দুটিকে নিয়ে থাকেন। মা-চন্ডী আদর করে ছেলে দুটির নাম রাখলেন আকুলী ও সুকুলী। নদী দিয়ে মহাজনী নৌকা যায়, যার যে মাল থাকে সবাই চন্ডীতলায় সব রেখে যায়। আকুলী-সুকুলী একদিন নদীর ধারে গাছের তলায় খেলা করছে, এমন সময় এক বেনে সওদাগর সাতডিঙা ধন নিয়ে বাণিজ্য করতে যাচ্ছে। আকুলী-সুকুলী তাকে ডেকে বললে, ‘তোমাদের নায়ে কী আছে ভাই? দিয়ে যাও না, আমাদের বড়ো ক্ষিদে পেয়েছে।’ বেনে বললে, ‘আমাদের নায়ে কিছুই নাই, কেবল লতাপাতা আছে, খাবি?’ ‘তোমাদের তাই হোক’ বলে আকুলী-সুকুলী হাসতে হাসতে চলে গেল। সওদাগর চেয়ে দেখে, নৌকার ধন-কড়ি, জিনিসপত্র কিছুই নাই, কেবল চারিদিকে সাপ ফোঁস ফোঁস করছে। তখন সওদাগর ছুটে গিয়ে ছেলেদুটির পায়ে ধরে বললে, ‘বাবা, আমার সর্বনাশ হয়েছে, রক্ষা করো। তোমরা কে বাবা বলো, তোমাদের অর্ধেক ধন দেব, আমার ভালো করে দাও।’ আকুলী-সুকুলী বললে, ‘আমরা কেউ নই, আমরা ভালো করতেও জানি না, মন্দ করতেও জানি না। আমাদের মায়ের কাছে চল, দিদিমা আছেন, তিনি তোমাদের ভালো করবেন।’ এইবলে মা মঙ্গলচন্ডীর ঘরে নিয়ে গেল। মা মঙ্গলচন্ডী বললেন, ‘জানিস না, আমার ব্রতদাসের অপমান কচ্ছিস! যা, ঘরে গিয়ে কুলুই চন্ডীর পুজো করগে যা। অগ্রহায়ণ মাসের চারটে মঙ্গলবারে উঠানে আলপনা দিয়ে কুলগাছের ডাল বসিয়ে, ঘট স্থাপনা করে, জোড়াকলা, জোড়াফুল, চিঁড়ে, পাটালি দিয়ে, ধান দূর্বার অর্ঘ্য গড়ে পুজো দিবি। পাঁচ এয়ো এক জায়গায় বসে আকুলী-সুকুলীর কথা শুনে সেই ঘটের কাছে বসে ফলার করবে, যে-যা কামনা করবে, তার সেই কামনা পূর্ণ হবে। দেখগে যা, তোর নৌকাতে যেমন ধন ছিল তেমনি আছে।’ সওদাগর সেখানে গিয়ে দেখে যে, সবধন ঠিক আছে। তখন সে ঘরে গিয়ে মা মঙ্গলচন্ডীর পুজো প্রচার করলে। আর সেইবনে মায়ের মন্দির করে দিলে। এখানে মা মঙ্গলচন্ডী একদিন আকুলী-সুকুলী আর তার মাকে সঙ্গে করে সেই ব্রাহ্মণের বাড়িতে গিয়ে বললেন, ‘তোমার মেয়ে সতী-সাধ্বী, জোড়া কলা খেয়েছিল বলে এই আকুলী-সুকুলী দুটি ছেলে হয়েছে। এ দুটি আমার ব্রতদাস। এদের যে অযত্ন-অভক্তি করবে, তার সর্বনাশ হবে। তুমি এদের নিয়ে সুখে-স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করো।’ এই বলে মা মঙ্গলচন্ডী অন্তর্ধান হলেন। সেই দেশের রাজাকে মা-চন্ডী স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, ‘অমুক ব্রাহ্মণের মেয়ের সঙ্গে তোমার ছেলের বিয়ে দেবে। তা-না হলে তোমার ছেলে বাঁচবে না।’ রাজা তখন ভয়ে ভয়ে সেই ব্রাহ্মণের মেয়ের সঙ্গে খুব ঘটা করে নিজের ছেলের বিয়ে দিলেন। আকুলী-সুকুলীকে সকলে দেবতার মতো পুজো করতে লাগল। ব্রাহ্মণের খুব ধন-দৌলত হল। চন্ডীর মাহাত্ম্য দেখে সকলে অগ্রহায়ণ মাসে কুলুই মঙ্গলবারের ব্রত করতে লাগল। এই রকমে পৃথিবীতে কুলুই মঙ্গলচন্ডীর ব্রত প্রচার হল। এ ব্রত করলে কখনও কুলে কলঙ্ক হয় না; সুতরাং সকল স্ত্রীলোকেরই এ ব্রত করা উচিত। নিম্নের কথাটি বলে জল খেতে হয় :

‘আটকাটি ষোল মুটি

সোনার মঙ্গলচন্ডী রূপার ভারা

কেন মা চন্ডী এত বেলা!

হাসতে খেলতে, পাটের কাপড় পরতে,

সোনার দোলায় দুলতে,

নির্ধনীকে ধন দিতে, অপুত্রের পুত্র দিতে,

আইবুড়োর বিয়ে দিতে, অন্ধের চক্ষু দিতে,

অন্তকালে স্বর্গ পেতে করোনা ছলা।।’

অগ্রহায়ণ মাসের কুলুই মঙ্গলবারের ব্রতকথা সমাপ্ত।

সংকট মঙ্গলবারের কথা

এক দেশে লক্ষপতি নামে এক সওদাগর ছিলেন। তিনি বারো বৎসর বাণিজ্যে গিয়েছেন, বাড়ি ফেরেন না, কোনো সংবাদও দেন না। বুড়ো মা, বউ কেঁদে-কেটে আকুল। কেউ বলে কারও ছলায় পড়েছে, কেউ বলে সে আর বেঁচে নেই। এই সব কথা শুনে, তাদের প্রাণ আরও আকুল হল। একদিন পাড়ার একজন গিন্নি বললে, ‘দেখো দিদি! তোমার বউকে অগ্রহায়ণ মাসের শুল্কপক্ষের মঙ্গলবারে সংকট মঙ্গলবারের ব্রত করাও। তোমার ছেলে নিশ্চয় বাড়ি ফিরে আসবে; কিন্তু এ ব্রত একলা হয় না, বিধবাকে নিয়েও হয় না। এক কাজ করো, আমার বউটিরও যখন ছেলে হয়নি তখন ওরা দুজনে এই ব্রত করুক।’ সওদাগরের মা বললেন, ‘বেশ তো, তাই করুক।’ তখন দুই বউ মিলে একসঙ্গে মঙ্গলবারে আটগাছি দূর্বা, আটটি আতপ চাউল, রেশমি কাপড় দিয়ে অর্ঘ্য তৈরি করলেন। তাঁরা দুজনে নিজের নিজের হাঁটুর ভেতর হাত গলিয়ে, কুটনো, বাটনা করে, রান্না করলেন। পুজোর শেষে দুজনেই হাঁটুর ভেতর হাত গলিয়ে, আহারে বসলেন। প্রতিবেশী গিন্নি বললেন, ‘‘তোমরা খেতে খেতে কথা কয়ো না। যখন খাওয়া হয়ে যাবে, তখন দুজনই দুজনকে জিজ্ঞাসা করবে, ‘সংকট হতে উঠি?’ তখন দুজনেই দুজনকে বলবে, ‘উঠ’।’ এই কথা বলে গিন্নি বাড়ি চলে গেলেন।

তারপর দুই বউ একমনে সংকট মঙ্গলচন্ডীকে স্মরণ করছেন আর খাচ্ছেন, আর এক একবার নিজেদের সংকটের অবস্থা ভাবছেন, এমন সময় ঘাটে দামামার ধ্বনি হল। দাসী যেমন বলেছে, ‘ওই গো গিন্নি মা! দাদাবাবু বুঝি পাটন থেকে বাড়ি ফিরে এলেন,’ অমনি দুজনেই উঠে পড়লেন। ব্রতের নিয়ম কিছুই পালন হল না। গিন্নি বউ নিয়ে পাঁচ এয়ো নিয়ে ঘাটে ডিঙি বরণ করতে গেলেন। দাসী এঁটো পরিষ্কার করতে গিয়ে সওদাগরের স্ত্রীর পাতের দইমাখা ভাতগুলি খেয়ে ফেললে। সওদাগর বাড়ি এসে আর নিজের স্ত্রীকে চিনতে পারলেন না। হিরার বালা, মুক্তার মালা যা-কিছু এনেছিলেন, সব দাসীকে পরিয়ে দিলেন। বউয়ের সঙ্গে আর কথাও কন না। শাশুড়ি দেখলেন এ আবার কী হল। পাড়ার সেই ব্রাহ্মণীগিন্নিকে সব কথা বলে, তাঁর পায়ে জড়িয়েধরে কাঁদতে লাগলেন। ব্রাহ্মণী বললেন, ‘চুপ করো দিদি, কেঁদো না। তোমার ছেলে যখন ঘরে এসেছে, তখন ওর জন্যে আর ভাবনা নেই। সেদিন বউ তাড়াতাড়ি উঠে পড়াতে, দাসী পাতের শেষভাত খেয়েছে, তাই দাসীর ভাগ্য প্রসন্ন হয়েছে। কী করবে দিদি! পৌষ মাসটা যাক। এ ব্রত মাঘ মাসে করলেও হয়।’

তখন গিন্নির কথা শুনে তারা আবার মাঘ মাসে শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে মঙ্গলচন্ডীর পুজো করে সংকট মঙ্গলবার করলেন। সেবার আর কাকেও এঁটো ছুঁতে দিলেন না। যে-যার পাতা নিজে নিজে ভাসালেন, যে-যার এঁটো নিজে নিজে পরিষ্কার করলেন। সওদাগরের স্ত্রী এঁটো পরিষ্কার করছেন, আর বলছেন:

হাতের কঙ্কণ বেচে কিনলাম দাসী,

দাসী হল রাজমহিষী;

আমি হলাম দাসীর দাসী।।

সওদাগর শুনতে পেয়ে বউয়ের হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। বউয়ের মুখে সবকথা শুনে মা মঙ্গলচন্ডীর কৃপায় তাঁর ভ্রম দূর হল। তখন সেই বউকে নিয়ে সওদাগর ঘরকন্না করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণীর বউয়েরও যথাকালে ছেলে হল। কিছুদিন পরে সওদাগরের ছেলে-মেয়ে হল। সকলে সুখে-স্বাচ্ছন্দে কাল কাটাতে লাগলেন। এঁদের সুখ দেখে পাড়ার সকলে এই ব্রত করতে লাগলেন। ক্রমে দেশ-বিদেশে সংকট মঙ্গলবারের ব্রতকথা প্রচার হল। সেই থেকে সকলেই এই সংকট মঙ্গলচন্ডীর ব্রত করতে লাগল।

সংকট মঙ্গলবারের ব্রতকথা সমাপ্ত।

সংকটার কথা

এক রাজা ছিলেন—তাঁর সাত রানি। তাঁদের ছেলেপুলে কিছুই হয়নি, সেই জন্যে তাঁরা বড়ো মনের দুঃখে থাকেন। একদিন রাজা সকালে উঠে দেখেন যে, উঠানে ঝাঁটপাট কিছুই পড়েনি, সেইজন্যে তিনি রেগে কোটালকে হুকুম দিলেন—‘ঝাড়ুদারকে ধরে নিয়ে এসো।’ কোটাল ঝাড়ুদারের বাড়ি গিয়ে দেখলেন যে, ঝাড়ুদার খেতে বসেছে। কোটাল বললেন, ‘তুই রাজবাড়ির কাজ ফেলে রেখে খেতে বসেছিস যে?’ ঝাড়ুদার উত্তর করলে, ‘হুজুর, যদি রাগ না করেন, বা আমায় কিছু না বলেন, তাহলে বলি।’ কোটাল বললেন, ‘কোনো ভয় নেই, ঠিক কথা বল।’ তখন ঝাড়ুদার বললে, ‘হুজুর, সকালে ওই আঁটকুড়ো রাজার মুখ দেখলে আমার সমস্ত দিন খাওয়া হয় না। তাই এত সকালে চাট্টি খেয়ে নিচ্চি, এইবার কাজে যাব।’ ঝাড়ুদারের কথা শুনে কোটাল অবাক হয়ে চলে গেলেন। কোটাল রাজাকে ঝাড়ুদারের কথা বলতে তাঁর মনে বড়ো ধিক্কার হল। তিনি দুঃখে বললেন যে, ‘এ মুখ আর কাউকে দেখাব না।’ এই বলে তিনি ঘরে গিয়ে শুয়ে রইলেন।

এমন সময় এক সন্ন্যাসী এসে রাজাকে ডাকলেন। রাজা এসে সন্ন্যাসীকে প্রণাম করে রাজসভায় নিয়ে গেলেন। সেখানে যেতে সন্ন্যাসী বললেন, ‘মহারাজ! আপনার এত চিন্তা কেন? আমি সব জানি। এই একটি ওষুধ দিচ্ছি, এইটি শিলে বেটে রানিদের খেতে বলবেন, তাহলে আপনার ছেলে হবে। কিন্তু আমার কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আপনার সাত রানির সাতটি ছেলে হবে, তার মধ্যে যে ছেলেটি সুন্দর হবে সেটিকে আমায় দিতে হবে।’ রাজা সম্মত হলেন, মনে ভাবলেন, সাতটির একটি দিব, তার আর বাধা কী! সন্ন্যাসী বিদেয় হলেন, রাজা রানিদের সেই ওষুধ শিলেবেটে খেতে বললেন। ছোটো রানিকে রাজা বেশি ভালোবাসেন বলে ছয়রানি ছোটো রানিকে ওষুধ না-দিয়ে তাঁরা সকলে মিলে ওষুধ খেলেন। যখন ছোটো রানি এসে ওষুধ চাইলেন, তখন সতীনরা বললেন, ‘আমাদের মনে ছিল না, আমরা ভুলে সব খেয়ে ফেলেছি। ওই শিলে ওষুধ বাটা হয়েছিল, শিল নোড়াটা ধুয়ে খাওগে।’ ছোটো রানি ভালো মানুষ, তিনি তাই করলেন। ক্রমে তাঁদের গর্ভ হল, দশ মাস দশ দিনে ছয় রানির ছয়টি ছেলে হল, কিন্তু কারুর নিখুঁত ছেলে হল না। কারুর কানা, কারুর খোঁড়া, কারুর কুঁজো, এই রকম সব ছেলে হল। ছোটো রানি একটি শাঁখ প্রসব করলেন। রাজা ছেলেদের দেখে বললেন, ‘এগুলোর যা হোক মানুষের মতো চেহারা হয়েছে। কিন্তু ছোটো রানির এটা কী হল! রাজা এই না দেখে ছোটো রানির কাছে আর গেলেন না, তাঁকে এক রকম ত্যাগ করলেন। ছোটো রানি মনের দুঃখে শাঁখটি নিয়ে একটি কুঁড়েঘরে গিয়ে বাস করতে লাগলেন।

এই রকমে কিছুদিন যায়, ছোটো রানির শাঁখটি ক্রমেই বড়ো হতে লাগল। রাত্তিরে ঘুমের ঘোরে তিনি টের পেতেন, যেন কেউ তাঁর বুকের দুধ চুষে চুষে খাচ্ছে, ঘুম ভাঙলে তিনি কিছুই দেখতে পেতেন না। একদিন রাত্রে ছোটো রানি ঘুমের ভান করে শুয়ে আছেন, এমন সময় দেখতে পেলেন যে শাঁখের ভিতর থেকে একটি ছেলে বেরিয়ে খেলা করছে। যেই দেখা, আর অমনি ধরে তিনি আহ্লাদে ছেলেটিকে কোলে করে চুমু খেতে খেতে বললেন, ‘বাবা আমার, আমি তোমায় আর ছাড়বো না।’ এই বলে তিনি শাঁখটি ভেঙে ফেলে দিলেন, যাতে ছেলেটি আর শাঁখের ভিতর না-যেতে পারে। ছেলেটি বললে, ‘মা, তুমি কী করলে, সন্ন্যাসী জানতে পারলে, আমায় নিয়ে যাবে।’ ছেলেটির মুখে মধুমাখা কথা শুনে ছোটো রানি আহ্লাদে আটখানা হলেন। মনে মনে ভাবলেন—‘সকাল হোক, আগে রাজাকে ছেলে দেখাব, তারপর যা হয় হবে।’ সকাল হতে মা মঙ্গলচন্ডীর নাম করে ছোটো রানি ছেলেটিকে নিয়ে রাজার কাছে গেলেন। রাজা ছেলেটিকে দেখে আহ্লাদে আটখানা হলেন। তিনি হেসে হেসে বললেন, ‘এই ছেলেটি তুমি কোথায় পেলে?’ রানি রাত্তিরের সব ঘটনা বললেন, রাজা শুনে আহ্লাদে রানির হাত ধরে বললেন, ‘তোমায় কত কষ্ট দিয়েছি কিছু মনে করো না, আমায় মাপ করো। তোমা হতে আজ এমন সোনার চাঁদ ছেলে পেলুম। সন্ন্যাসী এলে এ ছেলেটি দোবো না।’ ছেলেকে নিয়ে রাজা-রানি মনের সুখে ঘর করতে লাগলেন।

বারো বৎসর পরে সেই সন্ন্যাসী এসে উপস্থিত। সন্ন্যাসীকে দেখে রাজার প্রাণ উড়ে গেল, মুখে আর কোনো কথা নেই। সন্ন্যাসী বললেন, ‘মহারাজ! কৈ, আপনার ছেলেদের নিয়ে আসুন। আপনার প্রতিজ্ঞার কথা মনে আছে তো?’ রাজা বললেন, ‘আছে বৈ কি ঠাকুর, কিন্তু ছয় রানির ছয়টি ছেলে হয়েছে, আর এক রানি একটি শাঁখ প্রসব করেছে।’ সন্ন্যাসী বললেন, ‘কৈ, তাদের নিয়ে আসুন।’ রাজা ছয় রানির ছয়টি ছেলে দাঁড় করিয়ে বললেন, আপনার যেটি পছন্দ হয় নিয়ে যান। সন্ন্যাসী দেখে বললেন, ‘কানা, খোঁড়া, এসব কি ছেলে হয়েছে! কৈ, আমার শঙ্খনাথ বুটেশ্বর কৈ?’ —এই বলে তিনি একটি শাঁখে খুব জোরে ফুঁ দিলেন। তারপর শঙ্খনাথ বুটেশ্বর বলে ডাকতেই ছোটো রানির ছেলে এসে হাজির। সন্ন্যাসী রাজাকে বললেন, ‘একে লুকিয়ে রেখে যত কানা, খোঁড়া আমায় দেখাচ্ছিলেন। যাহোক আমি একেই খুঁজছিলাম, এখন আসি।’ এই বলে, সন্ন্যাসী ছোটো রানির ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন। রাজা ভয়ে কিছু-না বলতে পেরে চুপ করে বসে বসে চক্ষের জল ফেলতে লাগলেন। ছোটো রানি ছেলের জন্যে ডাকছেড়ে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর কান্নাতে পাড়ার মেয়েরা এসে জড় হল। সব কথা শুনে একজন বুড়ি বললে, ‘মা! তুমি সংকটার ব্রত করো। মার বরে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে।’ এই কথা শুনে রানি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। তিনি মনের আবেগে আগ্রহের সঙ্গে বললেন, ‘মা! কী করে এ সংকট হতে উদ্ধার হবো? সংকটার নিয়মই বা কী? বুড়ি সংকটার সব নিয়ম বলে দিলেন। তিনি শুক্রবারে সমস্ত দিন উপবাস করে একমনে সংকটার ধ্যানে তন্ময় হয়ে ব্রত করে রইলেন। কোনো আর জ্ঞান-সংজ্ঞা নেই, ঐকান্তিক মনে আকুল হয়ে মার চরণ ধরে পড়ে রইলেন।

এদিকে সন্ন্যাসী কিছুদূরে এসে শঙ্খনাথকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি সোজা রাস্তা দিয়ে যাবে, না-বাঁকা রাস্তা দিয়ে যাবে? বাঁকা পথে বন জঙ্গল, সেখানে বাঘ ভাল্লুকের ভয় আছে, কিন্তু সে পথ দিয়ে গেলে শীগগির যাওয়া যায়। আর সোজা পথে কোনো ভয় নেই, কিন্তু যেতে অনেক দেরি হবে।’ এই কথা শুনে শঙ্খনাথ বললে, ‘আমি রাজার ছেলে, আমার কাকেও ভয় নেই, আমি বাঁকা পথেই যাব।’ এই কথা শুনে সন্ন্যাসী ভারি খুশি, মনে মনে ভাবলেন, এই ছেলেটি মায়ের পূজার ঠিক উপযুক্ত পাত্র। এই রকম করে সন্ন্যাসী অনেক দূরে গিয়ে এক বিজন বনে ঢুকলেন।

সেখানে গিয়ে শঙ্খনাথ দেখলে, একটি মন্দিরে মা কালী রয়েছেন। শঙ্খনাথ মাকে ভক্তিভরে প্রণাম করলে। তারপর সন্ন্যাসীর সঙ্গে একটি কুঁড়েঘরে গেল। এই ঘরটিতে সন্ন্যাসী থাকেন। সন্ন্যাসী শঙ্খনাথকে বললেন, ‘বাবা, তুমি কাপড় ছেড়ে আমার সঙ্গে স্নান করবে এসো।’ এই বলে দুইজনে স্নান করে এলেন। স্নানের পর সন্ন্যাসী বললেন, ‘দেখো শঙ্খনাথ! তুমি এই ঘরে কিছুক্ষণ থাকো, আমি মায়ের পূজা সেরে আসি। আর দেখো, তুমি ওই দক্ষিণ দিকের দরজাটা যেন খুলো না।’ এই বলে তিনি মায়ের পূজা করতে চলে গেলেন। শঙ্খনাথের মনে কীরকম একটা খটকা হল। মনে মনে ভাবলে, ‘তাইতো, সন্ন্যাসী দক্ষিণ দিকের দরজা খুলতে কেন বারণ করলেন! এর মানে কী? নিশ্চয়ই একটা কারণ আছে, দেখতে হবে।’ এই ঠিক করে শঙ্খনাথ চুপি চুপি সেই দরজাটা খুললে। তারপর যা দেখলে, তাতে তার প্রাণ উড়ে গেল। একটা পুকুরের রক্তের মতো লাল জলে, অনেক কাটামুন্ডু পদ্মের মতো ভাসছে। তাকে দেখে মুন্ডুগুলি খিলখিল করে হাসতে লাগল। শঙ্খনাথ দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘তোমরা সব কারা, এই জলে মুখ বার করে আমায় দেখে হাসছ কেন?’ কাটামুন্ডুগুলি বললে, ‘আমরাও রাজপুত্র ছিলুম, ওই সন্ন্যাসী বেটা আমাদের সকলকে মার কাছে বলি দিয়েছে, আজ তোমারও সেই দশা হবে।’ এইকথা শুনে শঙ্খনাথের ভাবনা হল, বললে, ‘এখন উপায়?’ কাটামুন্ডুগুলি বললে, ‘যদি আমাদের বাঁচাও, তাহলে বলি।’ শঙ্খনাথ বললে, ‘তোমরা আজ আমাকে বাঁচালে, আমার দ্বারা তোমাদের অনেক উপকার হবে, যা বলবে তাই করবো, আমাকে বাঁচাও।’ তখন তারা বললে, ‘দেখো, যখন সন্ন্যাসী তোমায় ঠাকুরের কাছে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে বলবে, তখন তুমি বলবে যে আমি রাজার ছেলে, কেমন করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে হয় জানি না। আগে আমায় দেখিয়ে দিন, তারপর আমি সেই রকম করে প্রণাম করব। যখন সন্ন্যাসী তোমায় সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে দেখাবে, সেই সময় তুমি খাঁড়া দিয়ে সন্ন্যাসীকে কেটে ফেলবে। নচেৎ আর তোমার বাঁচবার উপায় নেই। তারপর সন্ন্যাসী মরে গেলে, সেই কাটারক্ত আর পূজার ফুল আমাদের গায়ে ছড়িয়ে দেবে, তাহলেই আমরা বেঁচে উঠব। দেখো খুব সাবধান, যেন ভুলো না।’ শঙ্খনাথ এই সমস্ত শুনে বললে, ‘তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো, আমি ঠিক কাজ হাসিল করব।’ এই বলে সেই দরজা বন্ধ করে, শঙ্খনাথ চুপ করে ঘরে বসে বসে মা মঙ্গলচন্ডীর নাম স্মরণ করতে লাগল।

এদিকে সন্ন্যাসীর আর আহ্লাদের সীমা নেই। ১০৭টা বলি শেষ হয়েছে, এটা হলেই তার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। সন্ন্যাসী তাড়াতাড়ি করে কোনোরকমে মার পূজা শেষ করলেন। সমস্ত পূজা হয়ে উঠল না, মা কালী বিরূপ হলেন। খানিক পরে সন্ন্যাসী রাজপুত্রকে নিয়ে মন্দিরের ভিতরে এলেন। রাজপুত্র মনে মনে ভক্তিভরে মাকে প্রণাম করলে। সন্ন্যাসী বললেন, ‘শঙ্খনাথ! বেলা হয়েছে, তুমি মাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে কিছু প্রসাদ খাও।’ শঙ্খনাথ বললে, ‘ঠাকুর, কী রকম করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে হয়, তা-তো জানি না, আপনি দেখিয়ে দিন।’ তখন সন্ন্যাসী বললে, ‘এই দেখো, এমনি করে মাকে প্রণাম করতে হয়।’ এই কথা বলে যেমনি সন্ন্যাসী সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছেন, অমনি শঙ্খনাথ খাঁড়া দিয়ে এককোপে সন্ন্যাসীকে কেটে ফেললে। তারপর মা কালীকে প্রণাম করে তাঁর চরণামৃত, ফুল ও সেই রক্ত নিয়ে পুকুরে কাটামুন্ডুগুলির উপর ছড়িয়ে দিলে। তখন সব কাটামুন্ডু বেঁচে উঠে শঙ্খনাথকে ধন্যবাদ দিতে লাগল। শঙ্খনাথের নাম ও যশ দেশ-বিদেশে রাষ্ট্র হল। সন্ন্যাসী নিপাত হয়েছে শুনে সেই দেশের রাজা তখনি এসে আহ্লাদ করে মহাধূমধামের সঙ্গে শঙ্খনাথকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। তারপর শঙ্খনাথের পরিচয় পেয়ে তাঁর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। রাজা হাতি, ঘোড়া, জিনিসপত্র সঙ্গে দিয়ে বর-কনে পাঠালেন। শঙ্খনাথ বাজনা বাদ্দি করে মহাধূমধামের সঙ্গে বউ নিয়ে বাড়িতে যেতে লাগল। কাটামুন্ডু রাজপুত্ররাও বর কনের সঙ্গে রাজবাড়িতে চললেন।

রাজা খবর পেয়ে আহ্লাদে এসে দেখেন যে, সত্যি তাঁর শঙ্খনাথ বিয়ে করে বউ নিয়ে আসছে। তখন রানিদের কাছে খবর গেল। সেদিন শুক্রবার, ছোটো রানি তখন পূজা শেষ করে মাকে প্রণাম করছিলেন, এমন সময় খবর এল—‘ওগো রানিমা, তোমার ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে।’ এই কথা শুনে শঙ্খনাথের মা আহ্লাদে কেঁদে ফেললেন। তখন সাত রানি সকলে মিলে আহ্লাদে বর-কনে বরণ করতে এলেন। চাঁদের মতো বউ দেখে সকলে খুশি হলেন। বরণ হলে বর-কনে ঘরে গেল। রাজা রাজপুত্রদের মুখে সন্ন্যাসীর সব কথা শুনে বললেন, ‘বাবা, তোমরাই আমার ছেলেকে বাঁচিয়েছ।’ এমন সময় সেই বুড়ি এসে উপস্থিত। রাজা বুড়িকে দেখেই বললে, ‘তুমি ভাগগিস সংকটার পূজা করতে বলে গিয়েছিলে, তাই আজ হারানো রতন পেলুম। তোমার কৃপায় বউ-বেটা পেলুম, আজ কী আনন্দ!’ তখন সকলে মিলে সংকটার স্তব-স্তুতি করে মহা ঘটা করে সংকটার পূজা করলেন। বুড়ি বললে, ‘দেখলে তো বাবা! সংকটার কী মহিমা! তাঁর কৃপায় তোমার ঘরের ছেলে, বউ নিয়ে নির্বিঘ্নে ফিরে এল। বুড়ি ছোটো রানিকে বললে, ‘সংকটার অর্ঘ্য বউ-বেটার মাথায় ছুঁইয়ে দাও।’ তিনি তাই করলেন। রাজা তখন হুকুম দিলেন, যেন আমার সকল প্রজা এই সংকটার পূজা করে। রাজপুত্তুরদেরও বললেন, ‘তোমরা দেখলে তো মার কী রকম মহিমা! তাঁর কৃপায় তোমরাও উদ্ধার পেলে, নিজেদের রাজ্যে গিয়ে মা সংকটার পূজা প্রচার করবে।’ রাজা তাঁদের আদর যত্ন করে নিজেদের রাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁরা দেশে গিয়ে সংকটার পূজা প্রচার করলেন। এই রকমে চতুর্দিকে মার মাহাত্ম্য রাষ্ট্র হল। সেই থেকে সংকটার পূজা প্রচার হল।

সংকটার কথা সমাপ্ত

সুয়ো দুয়োর কথা

পৌষ মাসের সোদো

এক বেনে সওদাগরের সাতটি ছেলে আর একটি মেয়ে। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু বিয়ের পর তার শ্বশুর বা স্বামী তাকে আর বাপের বাড়ি পাঠায় না। কেন যে পাঠায় না, তারা কেউ জানে না। সওদাগরও আর সে মেয়ের নাম করেন না। এমনি করে সাত-আট বৎসর কেটে গেল, সওদাগর গঙ্গা লাভ করলেন। তখন সাত ভাইয়ে সাত ডিঙি ধন নিয়ে বাণিজ্য করতে বেরুলেন। ডিঙি করে যেতে যেতে পাঁচ মাস কেটে গেল। তাঁরা অনেক দেশ বেড়িয়ে দৈবক্রমে এক ডাকাতের বাড়িতে গিয়ে অতিথি হলেন। ডাকাতেরা পাঁচ ভাই, সকলেই সাত ভাইকে খুব আদর করে একটা ঘরে বসালে। তাঁদের রেঁধে খাবার জন্যে একটা ভাঙা হাঁড়ি, ভিজে কাঠ, ভাঙা উনুন, চাল ডাল দিয়ে তারা চলে গেল। এমন সময় একটি সুন্দর ফুটফুটে বউ এসে তাঁদের বলতে লাগল, ‘তোমাদের বাড়ি কোথায় গা? তোমরা এখানে কী করতে এসেছ?’ সাত ভাইয়ে বললেন, ‘আমরা অমুক সওদাগরের ছেলে। তা-তুমি কাঁদছ কেন গা?’ বউটি বললে, ‘তবে তোমরা হয়তো আমার ভাই গো! মাকে বোলো, আমি এখনও মরিনি। আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই ভাই, আস্তে আস্তে পালিয়ে যাও।’ বউটি এই বলে প্রণাম করে তাড়াতাড়ি চলে গেল। এমন সময় ডাকাতদের মা এসে বললে, ‘বাবা, তোমাদের দেখে আমার বড়ো মায়া হচ্ছে; তোমরা এদেশে কেন এলে বাছা; এ যে ডাকাতদের দেশ, এখানে কেউ আসে না। তোমাদের ধন কড়ি যা আছে, সব লুটে নিয়ে এখনি তোমাদের মেরে ফেলবে। আর ভিজে উনানে, ভিজে কাঠ জ্বেলে, ভাঙা হাঁড়িতে কি রান্না হয় বাছা! এই নাও আমি তেল মাখিয়ে কাঠ এনেছি, এর জ্বাল দিয়ে তাড়াতাড়ি রেঁধে চারটি খেয়ে নাও।’ সাত ভাইয়ে তাই করলেন, আধসিদ্ধ খেয়ে বুড়িকে প্রণাম করে ডিঙ্গিতে চড়ে উত্তর দিকে চলে গেলেন।

ডাকাতদের মা তখন সেই ঘরঘানিতে আগুন দিয়ে চিৎকার করতে লাগল, ‘ওরে তোরা কোথায় গেলি রে বাপ! শীগগির আয়, অতিথিরা ঘরে আগুন দিয়ে পালিয়ে গেল।’ তখন ডাকাতেরা পাঁচ ভাইয়ে এসে বলতে লাগল, ‘সর্বনাশী, আগে আমাদের খবর দিতে পারলিনি!’ ডাকাতদের মা বললে, ‘এইমাত্র তারা পালিয়েছে, আমি স্বচক্ষে দেখেছি তারা দক্ষিণ দিকে গেছে। যা যা শীগগির যা, যদি ধরতে পারিস। আজ কেন বেরুলি বাবা! কী দুটো একটা সামান্য মানুষের জন্যে দাঁড়িয়ে থেকে কী পেলি? আজ তো একটাও মানুষ মারতে পারলিনি, আজ ঘরে বসে সাত ডিঙি ধন পেতিস। যা যা, দক্ষিণ দিকে দৌড়ে যা!’ তখন পাঁচ ভাইয়ে দক্ষিণ দিকে ছুটে যেতে লাগল। যেতে যেতে তারা ধানের খেতে, সরষের খেতে, কড়াইশুঁটির খেতে গিয়ে পড়তে লাগল। একে অন্ধকার রাত, সবাই সিমের খেতে যেতেই পায়ে লতাপাতা জড়িয়ে পড়ে গেল। ওদিকে সওদাগরের সাত ছেলে নির্বিঘ্নে আর এক দেশে গেলেন। সেখানে সাত ভাইয়ে বিয়ে করলেন। তারপর চৌদ্দ ডিঙ্গি ধন নিয়ে, সাত বউ নিয়ে সাত ভাইয়ে দেশে এসে দামামায় ঘা দিলেন। তার আগের দিন সুয়ো দুয়োর পুজো গেছে, সাত ভাইয়ের মা পাড়ার মেয়েরা সেই সুয়ো দুয়োর ডিঙি ভাসাতে এসেছেন। সকলেই নৌকার কাছে এসে দেখেন, সাত বউ সাত ছেলে এসেছে। গিন্নি তখন সাত বউয়ের মুখে চুমু খেয়ে, সাত বেটার হাত ধরে একে একে নামিয়ে নিলেন। ছেলেরা বললেন, ‘ও কি ভাসাচ্ছ মা? তুমি এখনও বুঝি খেলা করো?’ গিন্নি বললেন, বাবা! ও কথা বলতে নেই। কাল সুয়ো দুয়োর পূজা গিয়েছে কি-না, তাই আমরা ডিঙি ভাসাতে এসেছি। চল, প্রণাম করে ঘরে চল।’ তখন সাত ভাই, বউ, গিন্নি আর সবাই সুয়ো দুয়োকে প্রণাম করে বাড়ি এলেন, তারপর সাত বউকে বরণ করে ঘরে তুললেন।

একদিন ছেলেরা মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মা! আমাদের কি একটিও বোন নাই? গিন্নি তখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আছে বাবা, একটি আছে। সে মেয়েটি আমার কাছে আদৌ থাকত না, তার পিসির বাড়িতে থাকত। তোমরা তখন ছোটো ছোটো ছিলে বলে মনে নেই।’ সাত ভাইয়ে বললেন, ‘সে বোনটি এখন কোথায় মা?’ মা বললেন, ‘সে লজ্জার কথা আর কী বলব! তোমাদের পিসিমা না দেখে শুনে তাকে ডাকাতের বাড়িতে বিয়ে দিয়েছে, তাই আমরা আর তার তত্ত্ব লই না। আর সে মেয়ে-জামাইয়ের মুখও দেখি না।’ সাত ভাই বললেন, ‘হাঁ মা! আমাদের বোনটি কি বড়ো সুন্দরী? মা বললেন, ‘হাঁ বাবা, খুব সুন্দরী! সে ঠিক কর্তার মতো হয়েছে।’ তখন সাত ভাইয়ে ডাকাতদের বাড়ির আর সেই বউটির গল্প করলেন। মা বললেন, ‘হাঁ, সেই আমার খুকি রে। তাহলে এখনও বাছা আমার এতো কষ্টেও বেঁচে আছে।’

তখন সাত ভাইয়ে, জামাই বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে পাঠালেন। ডাকাতরা পাঁচ ভাই, ও তাদের বউরা, আর সেই বুড়িমা, নিমন্ত্রণ রাখতে এল। গিন্নি মেয়েটিকে দেখেই চিনতে পারলেন। বুকের কাছে এনে, গলা জড়িয়ে অনেক কাঁদলেন। বুড়িকে খুব বেয়ান বেয়ান করে ডাকতে লাগলেন। তখন পরস্পর পরিচয় হয়ে গেল। তিনি জামাইকে সাত ডিঙি ধন দিয়ে বললেন, ‘বাবা! আর কখনও ডাকাতি করো না, যা হবার হয়েছে।’ জামাই বললেন, ‘না মা, আর কখনও এমন কাজ করব না। কিন্তু আমরা যে-এত পাপ করেছি, কী করে লোক-সমাজে মুখ দেখাব? আর কী করেই বা আমাদের পাপ ক্ষয় হবে?’ গিন্নি বললেন, ‘তুমি ঘরে গিয়ে সর্বদা শুদ্ধাচারে ভগবানকে ডাকবে, তাতে অনেক পাপ ক্ষয় হবে। তারপর বৎসরান্তে মকর সংক্রান্তির দিন কলাপেটোর ডিঙি করে, গাঁদা ফুলে সাজিয়ে, জোড়া পান, জোড়া কলা, সুপারি, পৈতা, কড়ির ভারা দিয়ে সাজিয়ে, সুয়ো দুয়োর পুজো করবে। সেদিন উপবাস করবে, পরদিন গঙ্গায় বা পুকুরে সেই পেটো ভাসিয়ে দেবে। সেই ডিঙিতে একটি ঘৃতের প্রদীপ জ্বেলে দেবে। এই রকম বৎসর বৎসর করতে ভুলো না। তাহলে পাপক্ষয় হবে। কখনও কোনও বিপদে পড়বে না। আমাদের বাপ-পিতামহের কাল পর্যন্ত এই সুয়ো দুয়োর পুজো করেছি বলেই আমার সাত বেটাকে ডাকাতে মারতে পারেনি। যে এই ব্রত করে, তার কখনও কোনো বিপদ হয় না।’ তখন পাঁচ ভাইয়ে পাঁচ বউয়ে সাত ডিঙি ধন নিয়ে মাকে সঙ্গে করে দেশে চলে গেল। সেই অবধি দেশে দেশে সুয়ো দুয়োর ব্রত প্রচার হল।

পৌষ মাসের সোদোর কথা সমাপ্ত।

নাটাই ব্রতকথা

এক দেশে এক সওদাগর ছিলেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী, অতি সুন্দর দুটি ছেলে-মেয়ে রেখে মারা যান। কিছুদিন পরে সওদাগর আবার দ্বিতীয় সংসার করলেন। তাঁর গর্ভেও একটি মেয়ে আর একটি ছেলে হল। মা-মরা ছেলে-মেয়ে দুটিকে সওদাগর বড়ো ভালোবাসতেন। পাড়াপড়শিরাও সুন্দর চাঁদের মতন ছেলে-মেয়ে দুটিকে দেখতে পেলেই কোলে তুলে নিত। দেখে দেখে নূতন বউয়ের বড়োই অসহ্য হতে লাগল। ‘হা কপাল, পোড়াকপালির পেটে জন্মেছে বলে আমার বাছাদের কেউ দেখতে পারে না। আমার ছেলেরাই বা কার পাতে বিষ গুলে দিয়েছে! যাইহোক, আমি এর প্রতিশোধ নিতে ছাড়বো না।’ একদিন গিন্নি সওদাগরকে বললেন, ‘ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘরে বসে থাকলে তো আর পেট ভরবে না। বাণিজ্য করতে যাও না। ছেলে-মেয়ে বুকে করে পড়ে থাকলে কী হবে?’ তাই শুনে সওদাগরের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল।

ছেলে-মেয়ে দুটিকে কৈকেয়ীর হাতে সঁপে দিয়ে কেমন করে যান। গৃহিণীর সদব্যবহারের কথা সওদাগরের কিছু জানতে বাকি ছিল না। কী করেন, না গেলেও তো নয়। কাজে কাজেই যাওয়াই স্থির করলেন। ময়রাকে, গয়লাকে চুপি চুপি বললেন, ‘ভাই, আমার বড়ো ছেলে আর মেয়েকে তোমরা খেতে দিও, আমি এসে তোমাদের সবঋণ পরিশোধ করব। আর আগেও তোমাদের কিছু দিয়ে যাচ্ছি।’ সওদাগর ছেলে-মেয়ে দুটিকে কোলে করে চোখের জল চোখে মেরে, নানা কথায় ভুলিয়ে রেখে, কোল থেকে নামিয়ে দিলেন। তারপর মা মঙ্গলচন্ডীর নাম স্মরণ করে নৌকায় চড়ে বিদেশে যাত্রা করলেন।

এদিকে সওদাগর-গিন্নি অমনি রাখাল ছাড়িয়ে দিলেন। বড়ো ছেলে-মেয়ে দুটি সকাল হলে ছাগল-গোরু নিয়ে মাঠে চরাতে যায়; আর বেলা তৃতীয় প্রহরের সময়ে একে একে এসে দুই ভাই-বোনে দুটি পাতের-নাতের খেয়ে আবার মাঠে যায়। তাদের তাতেও কোনো কষ্ট নেই। ছেলে-মেয়ে দুটি দিন দিন যেন শুক্লপক্ষের চাঁদের মতো বাড়তে লাগল। সৎমা ভাবলেন, ‘তাই তো, এত দুধ, ঘি, সর খেয়েও আমার বাছারা দিন দিন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে, আর ওই সতীনের কাঁটা দুটো দিন দিন দস্যি হয়ে উঠছে।’ তিনি একদিন নিজের ছেলে-মেয়েকে গোয়েন্দা করে, তাদের সঙ্গে মাঠে পাঠিয়ে দিলেন। সেদিন তৃতীয় প্রহরেও তারা ঘরে ফিরল না দেখে গিন্নির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ‘হায় হায়! কেন তাদের সঙ্গে বাছাদের পাঠালাম! তাদের সব সয়, না খেয়েও তারা সাত দিন কাটাতে পারে; তা বলে আমার সোনার বাছারা এত কষ্ট সইতে পারবে কেন? আহা! তাদের না-জানি কতই কষ্ট হচ্ছে। মুখখানি শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। আর তাদের কখনও ওই লক্ষ্মীছাড়াদের সঙ্গে যেতে দেব না।’ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হল, চার ভাই-বোনে গোরু-ছাগল নিয়ে বাড়ি এল। গিন্নি দু-কোলে দুই ছেলে মেয়ে তুলে নিলেন, আর বড়ো ছেলে-মেয়েকে যৎপরোনাস্তি গালাগালি দিতে লাগলেন। ছোটো ছেলে-মেয়ে বললে, ‘মা! দাদা-দিদিকে গালাগালি দিচ্ছ কেন? ওরা আমাদের কত ভালোবাসে। আজ ওদের সঙ্গে গিয়ে গয়লাবাড়িতে কত দুধ-ক্ষীর খেয়েছি, ময়রাবাড়ির কত কী ভালো ভালো খাবার খেয়েছি। আমরা তার নাম পর্যন্ত জানি না। আর ওপাড়ার সঙ্গীদের বাড়িতে কী একটা নূতন জিনিস খেয়েছি মা! সে জিনিস আমরা কখনো দেখিনি। দাদা-দিদি বলে আমরা ওই রকম খাবার রোজ রোজ খাই।’ মা শুনে অবাক হলেন; ‘হায়! হায়! তাই হতভাগারা দিন দিন এত রাক্ষসমূর্তি হচ্ছে!’ গিন্নি সেই দিনই গয়লাকে, ময়রাকে ডেকে বললেন, ‘দেখো, তোমরা যে আমার ছেলে-মেয়েদের খাবার দাও, তাতে আমি অসুখি নই। বোধ হয় কর্তা তোমাদের ওসব দিতে বলে গেছেন; কিন্তু এখনকার কথা তোমরা জানো না! আজ আমি চিঠি পেয়েছি—সেখানে তাঁর ভয়ানক অসুখ হয়েছে। লিখেছেন—যদি এযাত্রা বাঁচি তো পুনর্জন্ম। আবার পথে তাঁর দুখানা বাণিজ্যতরী ডুবে গিয়েছে। তোমাদের আর কী বলব, আমরা এখন অকূল সমুদ্রে ভাসছি। তোমরা আর আমার ছেলে মেয়েদের ধারে খাবার দিও না। আর যা দিয়েছ তার জন্যেও আমি দায়ী নই।’ সেই দিন থেকে ছেলে মেয়েদের দুধ খাওয়া বন্ধ হল। গিন্নী পাড়ায় পাড়ায় বললেন, ‘দেখো, তোমরা আমার ছেলেদের যা তা খাইও না। আমার বাছাদের অসুখ করে।’ কাজে কাজেই ছেলে মেয়ে দুটির ভালো ভালো খাওয়া চারিদিক হতে বন্ধ হয়ে গেল। আর খেতে পায় না, একবেলা দুটি মুড়ি, একবেলা দুটি শাকভাত খেয়ে, ছেলে-মেয়ে দুটি শুকিয়ে যেতে লাগল।

একদিন দুটি ভাই বোনে গোরু চরাতে গিয়ে ক্ষুধায় আকুল হয়ে একটা গাছতলায় শুয়ে পড়ল, আর তাদের গোরু ছাগলগুলি কোন দিকে চলে গেল। সন্ধ্যার সময় উঠে দেখে গোরু, ছাগল মাঠে নেই। দুটি ভাই বোনে কেঁদে কেঁদে খুঁজে বেড়াতে লাগল, কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন একজনদের বাড়ির কানাচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা কাঁদতে লাগল। সে দিন অঘ্রাণ মাসের রবিবার। তাদের বাড়ির গিন্নিরা, ছেলে-মেয়ে নিয়ে নাটাই ব্রত করাবেন, এমন সময়ে ছেলে-মেয়ে দুটি তাদের বাড়ির ভেতর গিয়ে কাঁদতে লাগল। তখন সেই গৃহস্থেরা সকলে তাদের যত্ন করে, কাছে ডেকে সমস্ত কথা জিজ্ঞেস করে সব জানতে পারলেন। তারপর তাদের বললেন, ‘তোমাদের কোনো ভয় নেই। এই ছেলেদের সঙ্গে নাটাই ব্রত করো, সকল দুঃখ দূর হবে।’ সকলে কিছু কিছু করে দিয়ে তাদের জন্য আলাদা চাপাটি তৈরি করে দুটি ভাই বোনকে ব্রত করালেন। তারপর তাদের বললেন, ‘তোমরা নাটাই দেবীর কাছে বর মেগে নাও।’ তারা বললে, ‘হে মা নাটাই ঠাকরুণ! আমাদের যেন গোরু ছাগল পাওয়া যায়। তা না হলে আমরা ঘরে ফিরে যেতে পারব না।’ সকলে হাসতে লাগল, বললে, ‘ও কি বর মাগা হচ্ছে খ্যাপা ছেলে! বলো আমাদের বাবা সাত ডিঙি ধন নিয়ে গিয়েছেন, চৌদ্দ ডিঙি নিয়ে আমাদের হিরের বালা, মুক্তার মালা, টুকটুকে বউ জামাই নিয়ে, শীঘ্র বাড়ি আসুন, আমাদের দুঃখ দূর হোক।’ তখন তারা তাই বললে। পুজোর পর কিছু কিছু প্রসাদ খেয়ে রাত্রে তাদের বাড়িতে শুয়ে রইল। সকলে প্রাণভরে আশীর্বাদ করতে লাগলেন। বললেন, ‘কাল তোমাদের সুপ্রভাত হবে। নাটাই দেবী নিশ্চয়ই তোমাদের কৃপা করবেন।’ তার পরদিন সকালে গিন্নি বললেন, ‘কাল তোমাদের ভালো খাওয়া হয়নি, সকাল সকাল ভাত রেঁধে দি, খেয়ে এখানে দুদিন থাক।’ তাঁদের যত্নে ছেলে-মেয়ে দুটি সেইখানেই রইল।

ওদিকে সওদাগর চৌদ্দ ডিঙি ধন, হিরের বালা, মুক্তার মালা, রাঙা বউ, সুন্দর বর নিয়ে ঘরে ফিরে আসছেন। কতক্ষণে ছেলেমেয়ে চারটিকে দেখবেন। আকুল প্রাণে এদিক ওদিক চাইছেন। বাড়িতে আসবামাত্র গিন্নি চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন, ‘ওগো আমার সোনার চাঁদদের হারিয়েছি গো! আমার মরণ কেন হল না গো!’ সওদাগর খানিক চুপ করে বসে থেকে গিন্নিকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘আর কাঁদলে কী হবে, আমার যেমন কপাল, আমি কোথায় তাদের বিয়ে দেব বলে সুন্দর বর, সুন্দর বউ আনলাম, না কোথায় এই সর্বনাশের কথা শুনতে হল! তাদের কি অসুখ হয়েছিল?’ গিন্নি কী উত্তর দেবেন ঠিক করতে না পেরে অনবরত কাঁদতে লাগলেন। মেয়েটি বাপের কোলে বসে বলতে লাগল, ‘বাবা, দাদা দিদি গোরু চরাতে গিয়েছিল, তাদের বাঘে খেয়ে ফেলেছে।’ (গৃহিণী ছেলে মেয়ে না পাওয়াতে এরূপ গুজব রটিয়েছিলেন।) সওদাগর মেয়েটিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। নৌকার লোকেরা ধন দৌলৎ সব বয়ে এনে বড়িতে দিয়ে গেল। দেখতে দেখতে রাত হল। সওদাগর বাড়ি ফিরলেন না। গিন্নী ভাবলেন, ‘ভাগ্যে কী আছে, এই বেলা কিছু ধনরত্ন নিয়ে ওই বনের ধারে পুঁতে রেখে আসি।’ গিন্নি কোদাল নিয়ে গর্ত করলেন, তারপর ঝোড়ায় করে সোনা, রুপা, টাকা এনে সেই গর্তে ফেলে রাখলেন। সেখানে একটা পাতকূয়া ছিল, বার বার আসা-যাওয়াতে গিন্নি পা পিছলে সেই পাতকূয়ার ভেতর পড়ে গেলেন, আর উঠতে পারলেন না। সেইখানে তাঁর মৃত্যু হল। ওদিকে সওদাগর হাটে-মাঠে, পথে-ঘাটে ছেলেদের নাম করে কেঁদে কেঁদে বেড়াতে লাগলেন। এমনি করে করে তিন দিন কেটে গেল। তখন দেখতে পেলেন অনেক দূরে গোরু বাছুর, ছাগল নিয়ে ছেলে-মেয়ে দুটি গান গাইতে গাইতে বাড়ি আসছে। সওদাগর ছুটে গিয়ে ছেলেমেয়ে দুটিকে কোলে তুলে নিলেন। তাদের মুখে সব কথা শুনলেন। রাগে তার গা ফুলতে লাগল। তিনি তাড়াতাড়ি গাই-বাছুর, ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে আসতে লাগলেন। তখন বেলা আড়াই প্রহর। বাড়ির কাছে এসে দেখেন, বনের ধারে অনেক লোক জমা হয়েছে! তাঁর ছোটো ছেলে মেয়ে মা মা বলে চিৎকার করে কাঁদছে। তিনি কাছে এসে সমস্ত জানতে পারলেন। তখন ছোটো ছেলে মেয়ে দুটিকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়িতে আনলেন। কিছুদিন পরে বড়ো ছেলে-মেয়ে দুটির বিয়ে দিলেন। সে গৃহস্থ হতে তিনি ছেলে মেয়ে পেয়েছেন, তাদের অনেক ধন-দৌলত দিলেন। সওদাগর নাটাইচন্ডীর মাহাত্ম্য দেখে আশ্চর্য হলেন। তিনি বৌকে ও মেয়েকে এই ব্রত করালেন। পাড়ায় সকলেই নাটাইব্রত আরম্ভ করলে। ক্রমে দেশ-বিদেশে এই কথা রাষ্ট্র হল। এই রকমে নাটাইচন্ডী ব্রত পৃথিবীতে প্রচার হল।

নাটাইচন্ডীর ব্রতকথা সমাপ্ত।

মঙ্গল সংক্রান্তির কথা

সমান মাস, শুক্লপক্ষ, সংক্রান্তি মঙ্গলবার হলে মঙ্গল সংক্রান্তি বলে। একদিন এক বাড়ির বউয়েরা সব মিলে গিন্নিকে বললে, ‘মা! মঙ্গল সংক্রান্তি করো।’ গিন্নি বললেন, ‘না বাছা! আমি শুকিয়ে থাকতে পারব না।’ বউয়েরা মঙ্গল সংক্রান্তি করলে, কিন্তু গিন্নি রেঁধে বেড়ে ভাত খেলেন। কিছুদিন পরে গিন্নির ব্যায়রাম হল। কত ভালো ভালো কবিরাজ দেখলে, কিছুতেই রোগ ভালো হল না। দিন দিন রোগের বৃদ্ধি হতে লাগল। খায় দায় শুকিয়ে যায়। ছেলেরা বউদের গালাগালি দেয়, বলে,—‘তোরা আমাদের মাকে যত্ন করিস না, খেতে দিস না, তাই মা রোগা হয়ে যাচ্ছেন।’ ছেলেরা নিজে নিজে মাকে যত্ন করতে লাগল। তেল মাখান, স্নান করান, ক্ষীর ছানা মাখন ভালো ভালো জিনিস খাওয়ান, কিছুতেই মা সারে না। মার আরও দিন দিন খোনা সুর হয়ে যেতে লাগল, গায়ের গন্ধে কেউ কাছে যেতে পারে না। গিন্নি একলা শুয়ে থাকেন, রাত্রে ঘরের ভেতর গাঁ গাঁ, গোঁ গোঁ, ঠক ঠক, থপ থপ শব্দ হয়। ছেলেরা ও বউয়েরা ভয়ে অস্থির, মায়ের ঘরে এ কীসের শব্দ!

একদিন বউয়েরা ও ছেলেরা সকলে এক হয়ে বললে, ‘এসো, আমরা জেগে থাকি, দেখি ব্যাপারটা কী!’ সেদিন মায়ের ঘরের দরজা খুলে রেখে সকলে এক জায়গায় বসে রইল। গিন্নি প্রথম প্রহরে শাঁক হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল, দ্বিতীয় প্রহরে তাম্রকুন্ড হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল, তৃতীয় প্রহরে গোরু হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল, চতুর্থ প্রহরে রক্তসরা হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। ছেলেরা বউয়েরা সকলেই এই সব ব্যাপার দেখে আর কেউ কাছে যেতে পারলে না, তার পরদিন একজন ভালো রোজা আনিয়ে মাকে দেখালে। রোজা বললে, ‘তোমাদের মা তো বেঁচে নেই বাপু। মেয়েমানুষ ঋতুকালে ব্রাহ্মণ ছুঁলে রক্তসরা হয়, শাঁক ছুঁলে শাঁক হয়, তামা ছুঁলে তাম্রকুন্ড হয়, গোরু ছুঁলে গোরু হয়। তোমার মায়ের সেই সব দোষ হয়েছে। সমান মাস, শুক্লপক্ষের মঙ্গলবারে সংক্রান্তি হলে, সেই মঙ্গল সংক্রান্তি স্ত্রীলোকের করা উচিত। কারণ মেয়েদের তাহলে আর কোনো দোষ থাকে না। যারা মঙ্গল সংক্রান্তি না করে, তাদের কষ্ট পেতে হয়।’

এই কথা শুনে ছেলেরা বললে, ‘তবে কি আমাদের মায়ের কোনো উপায় হবে না? রোজা বললে, ‘হতে পারে, যদি কেউ একটি মঙ্গল সংক্রান্তির ফল দেয়। সেই ফল ধুয়ে খাইয়ে দিলে তোমার মায়ের গতি হবে।’ বউদের বলতে কেউ দিতে স্বীকার হল না। কেবল ছোটো বউ বললে, ‘আমার সাতটি সুপারি আছে, আমি তার একটি মাকে দিতে পারি। তা বলে কি আমার শাশুড়ি চিরকাল কষ্টভোগ করবেন?’ পরদিন সকালবেলা ছোটো বউ স্নান করে পুরোহিতকে ডাকিয়ে লালসুতো বাঁধা একটি সুপারি ফল এনে দিলে। সেই ফল শাশুড়ির নামে সংকল্প করে বললে, ‘মা, আমার এই মঙ্গল সংক্রান্তির ফলটি তোমাকে দিলাম; তুমি এর পুণ্য ভোগ করো।’ এই বলে সেই সুপারিটি ধুয়ে জল খাইয়ে দিলে। সুপারিটি গিন্নির হাতে দেবামাত্র গিন্নী মুক্তিলাভ করলেন। তখন সকলে আশ্চর্য হয়ে গেল। এই কথা চারিদিকে রাষ্ট্র হল। ক্রমে দেশ-বিদেশে এই মঙ্গল সংক্রান্তির কথা প্রচার হল। সকল স্ত্রীলোকেরই এই মঙ্গল সংক্রান্তির ব্রত করা উচিত।

মঙ্গল সংক্রান্তির ব্রতকথা সমাপ্ত।

ষষ্ঠীর কথা

ষষ্ঠী পূজা অনেক প্রকার, তন্মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি আমাদের দেশে প্রচলিত:

জ্যৈষ্ঠ মাসে: অরণ্য ষষ্ঠী (ইহাকে আম ষষ্ঠী এবং জামাই ষষ্ঠীও বলে)

শ্রাবণ মাসে: লুন্ঠন বা লোটন ষষ্ঠী

ভাদ্র মাসে: চাপড়া বা মন্থন ষষ্ঠী

আশ্বিন মাসে: দুর্গা বা বোধন ষষ্ঠী

অগ্রহায়ণ মাসে: মূলা ষষ্ঠী

পৌষ মাসে: পাটাই ষষ্ঠী

মাঘ মাসে: শীতল ষষ্ঠী

চৈত্র মাসে: অশোক ষষ্ঠী ও নীল ষষ্ঠী

বৈশাখ, আষাঢ়, কার্তিক ও ফাল্গুন মাসের ষষ্ঠী এদেশে প্রচলিত নাই।

অরণ্য ষষ্ঠীর কথা

এক ব্রাহ্মণীর তিন ছেলে, তিন বউ। ছোটো বউটির বড়ো নোলা, সে লুকিয়ে মাছ দুধ খেয়ে বলত যে, বেড়ালে খেয়ে গেছে। তাদের বাড়িতে একটি কালো বেড়াল ছিল, তারই নামে সে দোষ দিত। সেটি ষষ্ঠীর বাহন, তার নামে মিছে করে রোজ রোজ দোষ দিতে, সে মা ষষ্ঠীর কাছে গিয়ে বলে দিলে। বউ কিন্তু রোজ খায়, আর বেড়ালের নামে দোষ দেয়। কিছুদিন পরে ছোটো বউ পোয়াতি হল। দিন যায়, মাস যায়, দশ মাস দশ দিনে চাঁদের মতো একটি ছেলে হল। রাত্রে ছেলে কোলে করে পোয়াতি শুয়ে আছে, সকালে উঠে দেখে যে ছেলে নেই। ছোটো বউ কেঁদে কেটে আকুল হল। সকলে আনাচে কানাচে খুঁজলে, কোথাও ছেলে পাওয়া গেল না। এমনি করে ক্রমে ক্রমে সাতটি ছেলে আর একটি মেয়ে হল, কিন্তু সবই গেল। তখন সকলে বলতে লাগল, ‘তাইতো, গো! একি আশ্চয্যি! রোগ নয়, বালাই নয়, ছেলে কোথায় যায়? তবে বউটা বোধ হয় রাক্ষসী! রাত্রে ছেলেগুলিকে খেয়ে ফেলে, আবার সকালে লোক-দেখানো মায়াকান্না কাঁদে। এমন মেয়ে মানুষ ঘরে রাখতে নেই বাপু! ওর বাতাস গায়ে লাগলেও দোষ হয়।’

ছোটো বউ আড়াল থেকে সেই কথাটি শুনতে পেলে, তখন সে মনের ঘেন্নায় দুঃখে বনে চলে গেল। বিজন বনে বসে বসে কাঁদছে, দেখে মা ষষ্ঠীর বড়ো দয়া হল। তিনি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণীর বেশ ধরে এসে বললেন, ‘কে তুমি গা! কাদের মেয়ে!’ ছোটো বউ কেবল কাঁদে, কিছুই বলে না। মা ষষ্ঠী কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমার কী হয়েছে বাছা, বল না? তুমি কাঁদছ কেন? ঘরে যাও, এখনি বাঘ ভালুকে খেয়ে ফেলবে।’ ছোটো বউ তখন চোখের জল মুছে বললে, ‘তুমি কে গা মা! তোমার কি ছেলে পুলে আছে?’ ষষ্ঠী বললেন, ‘ষাট ষাট, আছে বই কী।’ ছোটো বউ বললে, ‘তবে আমার মুখ দেখো না মা, আমি বড়ো পাপিষ্ঠা। আমার সাত ছেলে এক মেয়ে, তার একটিও নেই। সংসারে সকলে আমায় ঘেন্না করে, তাই এই বনে বসে বসে কাঁদছি। বাঘ ভালুকে খায় তো খাক, আর যন্ত্রণা সহ্য হয় না। বড়ো জ্বালায় জ্বলছি মা।’ তখন ষষ্ঠী বললেন, ‘ও আবাগির বেটি। বড়ো যে লুকিয়ে লুকিয়ে মাছ দুধ খেয়ে বেড়ালের নামে দোষ দিতিস, তাই তোর অমন হয়েছে।’ ছোটো বউ তখন তাঁর পায়ের উপর আছাড় খেয়ে পড়ল, বললে, ‘মা, তুমি কে মা। দয়া করে আমায় বলো:

আমি খেয়েছি কোণে,
তুমি থাক বনে,
এ কথা জানলে কেমনে?

তুমি কে মা আমায় বলতে হবে। আর যাতে আমার সে পাপের খন্ডন হয়, তাও করতে হবে।’ তখন মা ষষ্ঠী বললেন, ‘ওই পথের ধারে একটা পচা বেড়াল পড়ে আছে। এক হাঁড়ি দই এনে তার গায়ে ঢেলে দিয়ে আবার সেই দই চেটে চেটে হাঁড়িতে তুলে নিয়ে আসবি। তাহলে তোর ছেলেকে বাঁচিয়ে দেব। কী করে, ছোটো বউ প্রাণের দায়ে এক হাঁড়ি দই এনে সেই পচা বেড়ালের গায়ে ঢেলে দিলে। গায়ে দই দিতেই পোকা বিজ বিজ করে উঠল। সেই পোকাশুদ্ধ দই জিব দিয়ে চেটে হাঁড়িতে তুলে নিয়ে মা ষষ্ঠীর কাছে এল। ছোটো বউয়ের যতগুলি ছেলে হত, বেড়ালে মুখে করে এনে সব মা ষষ্ঠীর কাছে দিত। মা ষষ্ঠী সেই সাতটি ছেলে একটি মেয়ে এনে দিয়ে বললেন, ‘এই নাও বাছা! তোমার ছেলেগুলি নিয়ে ঘরে যাও, আর এই দইয়ের ফোঁটা সকলের কপালে দাও। আর কখনও চুরি করে খেয়ে বেড়ালের নামে দোষ দিও না। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্ল ষষ্ঠীতে পিটুলির কালো বেড়াল গড়ে, পিটুলির কঙ্কন গড়ে, ফল-মূলের বাটা সাজিয়ে, ছয়টা পান, ছয়টা সুপারি, ছয়টা কলা, আর বাঁশপাতায় হলুদের নেকড়া জড়িয়ে, ছয়গাছি সুতা পাকিয়ে তাতে বাঁধবে। এই সুতাকে সাট সুতা বলে। তারপর তেল-হলুদ-দই দিয়ে অরণ্য ষষ্ঠীর পুজো করবে। পুজোর পর সেই সাট সুতা প্রত্যেক ছেলের কপালে হলুদ ছুঁইয়ে ডান হাতে বেঁধে দেবে। যতগুলি ছেলে ততগুলি সুতা চাই। তারপর কথা শুনে ফল-মূল খাবে, ফলার করবে। সেদিন ভাত খাবে না। আর ছেলেদের কখনও বাম হাতে মেরো না, আর মরে যা বলে গালাগালি দিও না। বেড়ালকে কখনও চুরি করে লাথি মেরো না, আর কখনও চুরি করে খেয়ে তার নামে দোষ দিও না। সকলকে যত্ন করবে, তা হলে জ্যাঁচ* পোয়াতি থাকবে। এই কথা বলেই মা ষষ্ঠী অন্তর্ধান হলেন।’

ছোটো বউ তখন কোলে কাঁকে, আগে পাছে ছেলেদের নিয়ে ঘরে গিয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে শাশুড়িকে ও জায়েদের সকলকে সব কথা বললে। তখন ছোটো বউকে সকলে ভালোবাসতে লাগল, ছেলে দেখে সকলে আশ্চয্যি হল, স্বামীও খুব ভালোবাসতে লাগল। জায়েদের ছেলে হয়নি, তারা ছোটো বউয়ের কাছ থেকে ষষ্ঠীর পুজো জেনে নিয়ে পুজো করতে লাগল। ক্রমে তাদেরও ছেলে-মেয়ে হল। এখন ছোটো বউয়ের আর সুখ ধরে না। ছোটো বউ ঘটা করে ছেলেদের বিয়ে পৈতে দিলে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে জামাই আনলে। জামাইকেও ছেলেদের মতো প্রতি জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠীর দিন দইয়ের ফোঁটা দিলে, আম কাঁঠালের বাটা দিলে। তাই দেখে জায়েরাও ছেলের মতো জামাইকে বাটা দিতে লাগল। ক্রমে ওই দিনটা জামাই ষষ্ঠী, বা ষষ্ঠীবাটা কথা হয়ে উঠলো। মা ষষ্ঠীর কৃপায় বাড়িশুদ্ধ সকলে সুখে-স্বাচ্ছন্দে ঘরকন্না করতে লাগল। দেশ-বিদেশে এই ছোটো বউয়ের কথা রাষ্ট্র হল। ক্রমে চারিদিকের লোকেরা মা ষষ্ঠীর পুজো করতে লাগল। এই রকমে অরণ্য ষষ্ঠীর পুজো পৃথিবীতে প্রচার হল।

অরণ্য ষষ্ঠীর ব্রতকথা সমাপ্ত।

লোটন ষষ্ঠীর কথা

এক ব্রাহ্মণীর এক ছেলে, একটি বউ, আর একটি মেয়ে। মেয়ের তিনটি ছেলে আর বউয়ের সাত ছেলে। পাড়ার লোকেরা বলে, ‘আহা! ব্রাহ্মণীর কী বরাত, মা ষষ্ঠী যেন ডাল ভেঙে পড়েছেন! ব্রাহ্মণীর সময়ও ভালো, ছেলে দশ টাকা রোজগার করে, মাকে ভক্তি করে।’ শ্রাবণ মাস, শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিন গিন্নি ষষ্ঠী পুজোর আয়োজন করছেন, তাঁর সোনার ছয়টি লোটন ছিল, তাই দিয়ে বছর বছর ষষ্ঠী পুজো করেন। গিন্নি কৌটো খুলে দেখেন যে তাঁর তিনটি লোটন আছে আর তিনটি নেই। তখন গিন্নি বউকে ডেকে বললেন, ‘বউমা! আমার এ সর্বনাশ কে করলে? লোটন কে চুরি করেছে? মা ষষ্ঠীর জিনিস কার নিতে ভরসা হল?’ এই কথা শুনে বউ কেঁদে-কেটে ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্বি করলে, ‘আমি যদি লোটন নিয়ে থাকি, তাহলে আমার সাত বেটার মাথা খাই।’ মেয়েকে জিজ্ঞাসা করতে মেয়ে বললে, ‘আমি জানি না মা, তোমাদের বাড়ি আমি ক-দিনই বা আছি? এই আজ বাদে কাল শ্বশুরবাড়ি চলে যাব।’ গিন্নি কোনো কথা না বলে ক্ষীরের লোটন গড়ে ষষ্ঠীকে দিলেন। বউ মনের দুঃখে সে দিন আর কিছুই খেলে না। সমস্ত দিন কেঁদে কেঁদে রাত্রে আশে-পাশে সাতটি ছেলে নিয়ে শুয়ে রইল। স্বামী এসে সমস্ত শুনলে, শুনে রেগে বউকে কিছু না বলে, মার কাছে শুয়ে, মায়ে বেটায় কত কথা কইতে কইতে ঘুমোল।

তার পর দিন সকলে ঘুম থেকে উঠে দেখে যে, বউয়ের সাতটি ছেলে মরে রয়েছে। বউ কেঁদে পাড়া মাথায় করলে। তখন মেয়ে বলতে লাগল—‘দেখলে মা, দেখলে দাদা, ও লোটন বউ ঠিক নিয়েছে, তা না হলে আর এ সর্বনাশ হয়! কীরকম রাক্ষুসী দেখলে, ঠাকুরের জিনিস চুরি করে আবার ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি? মর মর, দূর করে দাও, ওর মুখ দেখতে নেই।’ বউ কাঁদতে কাঁদতে ঘরের দরজা বন্ধ করে মরা ছেলেগুলি বুকে করে নিয়ে পড়ে রইল। সমস্ত দিন গেল। ছেলেদের পোড়াবার জন্যে স্বামী এসে দরজা খুলতে বললে, বউ কিছুতেই দরজা খুললে না। মা ষষ্ঠীর দয়া হল। তিনি রাত্রে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণীর বেশ ধরে বউ-এর ঘরের ভিতর এলেন। বউ বললে, ‘কে মা তুমি! এখানে কেমন করে এলে?’ মা ষষ্ঠী বললেন, ‘আমি কেউ নই বাছা! বলি, তুই আবাগী ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করলি, আবার কাঁদছিস!’ বউ বললে, ‘আমি তো লোটন নিইনি মা! তাই দিব্যি করেছি।’ ষষ্ঠী ঠাকরুণ বললেন, ‘ছি মা, তুমি সাত ছেলের মা হলে, তোমার কি এই কাজ! সত্যি হোক, মিথ্যে হোক, কখন ছেলের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি কোরো না।’ এই বলে তিনি বাঁশপাতা ঝেড়ে ছেলেদের গায়ে জলের ছিটে দিতেই, সাতটি ছেলে বেঁচে উঠল। ছেলেগুলো বলতে লাগল, ‘মা গো মা! এত ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, আমাদের ডাকনি? বড়ো ক্ষিদে পেয়েছে, কিছু খেতে দাও মা।’ এদিকে মা ষষ্ঠী অন্তর্দ্ধান হয়েছেন। বউ চেয়ে দেখে দেখে যে মা নেই, খালি ছেলেরা চেঁচাচ্ছে। খানিক পরে সকাল হল। বউ ছেলেপুলে নিয়ে দরজা খুলে দেখে যে ননদের তিনটি ছেলে মরে গেছে! গিন্নী এই সব দেখে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, এ কী ব্যাপার! স্বামী বউয়ের মুখে রাত্রের ঘটনা শুনে অবাক হলেন। মেয়ের ঘুম ভাঙতে চেয়ে দেখে যে তার তিনটি ছেলেই মরে গেছে। সে কেঁদে-কেটে বাড়ি মাথায় করলে। মায়ে ঝিয়ে মা ষষ্ঠীর কাছে মাথা খুঁড়তে লাগলেন।

এমন সময় দৈববাণী হল—‘জানিস না মাগি! তোর মেয়ে আমার লোটন চুরি করে আবার পরের মেয়ের নামে দোষ দিয়ে সতী হয়েছে! এখন কাঁদতে লজ্জা করে না? যদি ভালো চাস তো তোর মেয়েকে বউ-এর পায়ে ধরতে বলগে যা।’ তখন আর কারও কিছু জানতে বাকি রইল না। ননদ ভাজের পায়ে ধরে কাঁদতে লাগল। বউ বললে, ‘ভয় কী ঠাকুরঝি! মা যখন দয়া করেছেন, তখন আর ভাবনা নেই। তুমি লোটন বার করে দাও, তোমার ছেলেরা বাঁচবে। মার কোপে তোমার এমন হয়েছে, এখনি মার দয়া হবে, তুমি লোটন বার করে দাও।’ তখন ননদ তাড়াতাড়ি বাক্স খুলে লোটন বার করে দিলে।

বউ তখন সেই মা ষষ্ঠীর দেওয়া বাঁশপাতার জল ছেলেদের গায়ে ছিটিয়ে দিতেই তিনটি ছেলে উঠে বসল! বউ-এর এই অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে সকলে তাকে দেবতার মতো ভক্তি করতে লাগল। বোনকে ভাই ছি-ছি করতে লাগল। বললে ‘তোর পাপেই আমার ছেলে মরেছিল, তোর ছেলেও মরেছিল। ভাগ্যিস অমন বউ পেয়েছিলুম, তাই তার পুণ্যে আজ সব হারানো ধন পেলুম।’ ননদ ভাজের কাছে গিয়ে পায়ে ধরে মাপ চাইলে, দাদার পায়ে ধরে মাপ চাইলে। গিন্নি মেয়েকে বকতে লাগলেন। মেয়ের লোটন চুরির কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বউকে সকলে ভালোবাসতে লাগল। বউ-এর সুখ্যাতি, আর মা ষষ্ঠীর দয়া দেশ-বিদেশে প্রচার হল। সেই থেকে সকলে শ্রাবণ মাসে এই লোটন ষষ্ঠীর পূজা করে। লোটন চুরি করার জন্যে সকলে এতে লোটন ষষ্ঠী বা লুন্ঠন ষষ্ঠী বলে। এই ষষ্ঠী করলে ছেলেপুলে কখনও অকালে মরে না।

লোটন ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত

চাপড়া ষষ্ঠীর কথা

এক দেশে এক বেনে সওদাগর ছিলেন। তাঁর তিন ছেলে ও তিন বউ। সকলেরই ছেলেপুলে হয়েছে। কর্তা ছোটো বউয়ের ছেলেদের বড়োই ভালোবাসেন। একদিন গিন্নি কর্তাকে বললেন, ‘দেখো, আমরা ছেলেপুলে নিয়ে লোকের পুকুরে ষষ্ঠী পুজো করতে যাই, সকলেই বিরক্ত হয়, কত কথা বলে। তা আমাদের একটি পুকুর কাটিয়ে দাও। আমরা সেখানে ছেলেপুলে নিয়ে ষষ্ঠী পুজো করব।’ কর্তা বললেন, ‘এই কথা বই তো নয়, তা আমি করে দেব।’ তখন কর্তা কোড়া ডাকিয়ে পুকুর কাটাতে আরম্ভ করলেন। পুকুর কাটানো হল, কিন্তু পুকুরে জল উঠল না। আষাঢ়, শ্রাবণ মাসে বর্ষা গেল, তবুও জল হল না। সবাই কানাকানি করে, নিন্দা করে, বলে—‘কী পাপিষ্ঠ গো, এত বড়ো দিঘির মতো পুকুরটা কাটালে, এক ফোঁটাও জল উঠল না।’ বেনে সওদাগর বড়োই দুঃখিত হলেন। গিন্নি সর্বদাই ভগবানকে ডাকেন, কেমন করে পুকুরে জল হবে।

একদিন গিন্নি কর্তাকে বললেন, ‘আজ বাদে কাল ষষ্ঠী পুজো, আবার ছেলেপুলে নিয়ে পরের পুকুরে যেতে হবে। কত কথা শুনতে হবে। এমনও বরাত, যে পুকুরে জল উঠল না!’ কথা শুনে কর্তার মনটা বড়োই খারাপ হল, তিনি চুপ করে কাঁদতে লাগলেন। সেই দিন রাত্রে মা ষষ্ঠী সওদাগরের মন ছলবার জন্যে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, ‘তুমি ছোটো বউয়ের ছেলেদের বড়ো ভালোবাসো, তার একটি ছেলেকে কেটে যদি পুকুরে রক্ত ছড়িয়ে দিতে পারো, তবে পুকুরে জল হবে, নচেৎ পুকুরে আর জল হবে না।’ কর্তা এই স্বপ্ন দেখে ভয়ে অস্থির। সকালে বিছানা থেকে উঠে তিনি খালি ভাবতে লাগলেন কী হবে, কী রকম করে ছেলেকে কাটব, একথা ভাবলেও যে বুক ফেটে যায়। আবার ভাবলেন, মা ষষ্ঠী যখন স্বপ্নে দেখা দিয়েছেন, তখন স্বপ্ন কখনো মিথ্যা হবে না। যা অদৃষ্টে আছে তাই হবে। কী অশুভক্ষণেই পুকুর কাটিয়েছিলুম। আহা, ছোটো বউকে কী বলে বোঝাবো। এই সমস্ত ভাবছেন আর কাঁদছেন, এমন সময় সেইখানে গিন্নি এলেন। কর্তাকে কাঁদতে দেখে গিন্নি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে? শুধু শুধু কাঁদছ কেন?’ সওদাগর কী আর মাথামুন্ডু বলবেন তা আর খুঁজে পান না, খালি কাঁদেন। তখন গিন্নির অনেক অনুরোধে স্বপ্নের সমস্ত কথা বললেন। গিন্নি শুনে কেঁদে-কেটে মাথা খুঁড়ে অস্থির হলেন। কর্তা বললেন, ‘আর গোল করো না, আমি চুপি চুপি কাজ সেরে আসি। যখন মা ষষ্ঠীর হুকুম হয়েছে তখন আর ভেবে কী করব? তাঁর দয়া হলে ঢের ছেলে হবে।’ এই বলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে উঠে চলে গেলেন।

তারপর সওদাগর ছোটো বউয়ের ছোটো ছেলেকে ভুলিয়ে পুকুরধারে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনি ছেলেকে কেটে পুকুরে যেই ফেলে দিয়েছেন, আর অমনি কুল কুল করে কানায় কানায় এক পুকুর জল হল। জল দেখে কর্তার ভারি আহ্লাদ হল। তিনি মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে বাড়িতে গিয়ে বললেন, ‘মা ষষ্ঠীর দয়ায়, আজ এক পুকুর জল হয়েছে। অমনি সব বউয়েরা, ছেলেমেয়েরা সকলে জল দেখতে এল। জল দেখে সকলে ভারি খুশি। গিন্নি কিন্তু চোখের জল চোখে মেরে ঘাটে এসে পুকুর প্রতিষ্ঠা করলেন। তারপর সকলে মিলে ঘাটে বসে মা ষষ্ঠীর পুজো করতে লাগলেন। সকলেই পিটুলির চাপড়া ও পুতুল ভাসালে। ছোটো বউ কিছুই জানে না, যে তার এমন সর্বনাশ হয়েছে। পূজা সেরে যেমনি ছোটো বউ পুতুল ও চাপড়া ভাসাবে, অমনি সেই সময় তার সেই ছোটো ছেলেটি আঁচল ধরে জল থেকে উঠে এল। সকলেই দেখে অবাক হয়ে গেল। ছোটো বউ ছেলের গায়ের জল মুছিয়ে মুখে চুমু খেয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘তুই কোথায় ছিলি বাবা, জলে কেমন করে এলি?’ ছেলে ভয়ে কোনো কথা বললে না। গিন্নি ছেলে দেখে আহ্লাদে কেঁদে উঠে দৌড়ে কর্তাকে খবর দিতে গেলেন। কর্তা ছেলের কথা শুনে আহ্লাদে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে ঘাটে এলেন। তিনি ছেলেকে বুকে করে নিয়ে চুমু খেয়ে মা ষষ্ঠীকে ধন্যবাদ দিতে দিতে চোখের জল ফেলতে লাগলেন। এই সব দেখে বউয়েরা অবাক। তখন গিন্নি সমস্ত ঘটনা বউদের কাছে বলতে লাগলেন। ছোটো বউ শুনেই মূর্ছা গেল। তারপর তার চোখে-মুখে জল দিতে মা ষষ্ঠীর কৃপায় জ্ঞান হল। তখন তিন জায়ে ছেলেদের কোলে করে আঁচলে কলা বেঁধে, মা ষষ্ঠীর কথা শুনতে লাগলেন। গিন্নিই কথা বলতে লাগলেন। মা ষষ্ঠীর উপর সকলকার খুব ভক্তি বাড়ল। কর্তা মা ষষ্ঠীর এরকম দয়া দেখে দেশে দেশে তাঁর মাহাত্ম্য প্রচার করলেন। তিনি দুঃখী কাঙালদের খুব খাওয়ালেন, অনেক টাকাকড়ি দিলেন। চারিদিকে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল। মা ষষ্ঠীর মাহাত্ম্য দেখে প্রত্যেক বাড়িতে তাঁর পূজা হতে লাগল। সেই অবধি পৃথিবীতে চাপড়া ষষ্ঠীর পূজা প্রচার হল। একে মন্থন ষষ্ঠীও বলে।

চাপড়া বা মন্থন ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত।

দুর্গা ষষ্ঠীর কথা

আশ্বিন মাসে শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিন মা দুর্গা কৈলাস পাহাড়ে বসে এক মুঠো করে ধুলো তুলছেন আর কাপড়ে হাত মুচ্ছেন। এমন সময় মহাদেব এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ও কি হচ্ছে দুর্গা!’ ভগবতী বললেন, ‘আমি কাপড়ে ধুলো মাখাচ্ছি। মানুষের ছেলে হয়, তারা ধুলো মেখে মায়ের কোলে ওঠে; তাতেই যে কাপড়ে ছাপা ছাপা ধুলোর দাগ হয়, তাই আমি পরতে বড়ো ভালোবাসি। আমার কপালে তো আর ছেলে হল না! তুমি সকলকে ছেলে দান করো, আমায় কিন্তু একটিও ছেলে দিলে না।’ মহাদেব হাসতে হাসতে বললেন, ‘হ্যাঁ পার্বতী, তোমাকে যে সকলে জগৎজননী বলে! এই পৃথিবীতে সকলেই তোমাকে মা বলে ডাকে, তাতেও কি তোমার ছেলের সাধ মেটে না? আর তুমি তো প্রসব-বেদনা সহ্য করতে পারবে না।’ তখন দুর্গার কুমারী অবস্থায় যে কার্তিকের জন্ম হয়েছিল, সেই ছেলের কথা মনে হল। যদিও কার্তিক দুর্গার গর্ভে জন্মাননি, তবুও তিনি শিবের সন্তান। তাই দুর্গা বললেন, ‘আমায় সেই কার্তিককে এনে দাও, নইলে আমি এবার বাপের বাড়ি গিয়ে আর আসব না।’ মহাদেব বললেন, ‘বেশ তো, আমি তোমার কার্তিককে এনে দিচ্ছি।’ কার্তিক তখন চন্দ্রের স্ত্রী কৃত্তিকার কাছে ছিলেন। মহাদেব সেইখানে গেলেন। জয়া, বিজয়া দুর্গাকে তেল-হলুদ মাখাতে বসলেন। যতগুলি গায়ের ময়লা পড়তে লাগল, দুর্গা সেইগুলি নিয়ে ধুলা মিশিয়ে একটি সুন্দর পুতুল গড়লেন।

এমন সময় নারায়ণ সেইখান দিয়ে যেতে যেতে ওই পুতুলটি দেখতে পেলেন। নারায়ণ মনে মনে ভাবলেন, এইবার আমার খুব সুবিধে হয়েছে, আমার চিরকালের আশা পূর্ণ হবে! ভগবতীর স্তনপান করতে আমার বড়ো সাধ। কিন্তু ওঁর গর্ভে জন্মাবার তো কোনো উপায় নেই। ওই পুতুলে আমি আবির্ভাব হব। এই বলে তিনি ওই গড়া পুতুলে আবির্ভাব হলেন। দুর্গাকে ‘মা মা’ বলে কোলে গিয়ে তিনি স্তনপান করতে লাগলেন। দুর্গার আর আহ্লাদের সীমা নেই, ছেলে কোলে করে জয়া, বিজয়াকে সঙ্গে করে স্নান করতে গেলেন। ছেলের গা মুছিয়ে একটি পদ্ম ফুলের কুঁড়ি হাতে দিলেন। তারপর দুর্গা স্নান করে ছেলে কোলে করে বাড়ি এলেন। বাড়িতে এসে দেখেন যে, মহাদেব কার্তিককে সঙ্গে করে বাড়ি এনেছেন। তখন দুর্গা দুই ছেলেকে দুই কোলে নিয়ে চুমু খেতে লাগলেন। মহাদেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দুর্গা! তুমি এ ছেলেটি কোথায় পেলে?’ দুর্গা বললেন, ‘তা জানি না, মাটির পুতুল গড়ছিলুম, সেই পুতুল আমায় ‘মা মা’ বলে ডেকে কোলে উঠল!’ তখন মহাদেব আহ্লাদ করে সমস্ত দেবতাদের নিমন্ত্রণ করে আনালেন, যে দুর্গার ছেলে হয়েছে। ছেলে দেখতে সব দেবতারা এলেন, সেই সঙ্গে শনিও এলেন। ছেলে দেখে সকলে ধন্যি ধন্যি করলেন। শনি আর থাকতে পারলেন না। তিনি দুর্গার ভাই, ছেলের মামা। কাজেই জোর করে যেমনি ছেলের দিকে চেয়েছেন, অমনি ছেলের মুন্ডু উড়ে গেল, রক্তে গা ভেসে গেল। কৈলাসে হাহাকার পড়ে গেল। মা দুর্গা মূর্ছা গেলেন। তারপর উঠে কাঁদতে কাঁদতে মহাদেবকে বললেন, ‘আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে দাও।’ দুর্গা রেগে শনিকে কাটতে উদ্যত হলেন। তখন দেবতারা স্তবস্তুতি করে বুঝিয়ে বললেন, ‘মা, আপনি তো ওকে বর দিয়েছেন, আর আপনিই ওকে ভুলে কাটতে যাচ্ছেন।’ দুর্গা তখন একটু ঠাণ্ডা হয়ে কেঁদে-কেটে বললেন, ‘আচ্ছা, বেশ; এখন আমার ছেলেকে তোমরা বাঁচিয়ে দাও।’

মহাদেব তখন নন্দীকে বললেন, ‘দেখ নন্দি, যদি কেউ উত্তরদিকে মাথা করে শুয়ে থাকে, তার মাথাটা কেটে আন।’ নন্দী স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল ঘুরে দেখে যে, একটা শ্বেত হস্তী উত্তরদিকে মাথা করে শুয়ে আছে। সেই হাতিটার মাথা কেটে নিয়ে নন্দী মহাদেবকে দিলেন। মহাদেব সেই মাথাটা ছেলের কাঁধে জোড়া দিলেন, ছেলে উঠে মায়ের কোলে গিয়ে বসল। দুর্গা কাঁদতে লাগলেন, আমার এমন ছেলে তার হাতির মাথা হল; লোকে কত ঠাট্টা করবে! তখন মহাদেব ও যত দেবতা সকলে মিলে বললেন, ‘তোমার ছেলেকে কেউ নিন্দে করবে না। তোমার ছেলের নাম রইল গণপতি। সিদ্ধিদাতা গণেশের নাম করে যাত্রা করলে কারো কোনো বিপদ ঘটবে না। আর আগে তোমার গণেশের পূজা না হলে কোনো দেবতার পূজা হবে না।’ এই বলে সব দেবতারা যে যার স্থানে চলে গেলেন। দুর্গা কার্তিক ও গণেশকে নিয়ে মর্ত্যে এলেন। মেনকাকে বললেন, ‘মা! আমি এই ষষ্ঠীর দিন এই দুইটি ছেলে পেয়েছি। যে কোনো স্ত্রীলোক আমার এই কথা শুনে ষষ্ঠীর পালনী করবে, সে আমার মতো পুত্র লাভ করবে।’ মা বললেন, ‘তাই হবে মা।’ সেই থেকে সকলে দুর্গা ষষ্ঠী করে।

দুর্গা ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত।

মুলা ষষ্ঠীর কথা

এক ব্রাহ্মণ, ছেলে ও বউ নিয়ে ঘর করেন, তাঁর স্ত্রী নেই। একদিন তাঁর মাংস খেতে সাধ হল। তিনি খানিকটা হরিণ-মাংস এনে বউকে বললেন, ‘বউমা, আজ হরিণের মাংস এনেছি, বেশ ভালো করে রাঁধো।’ বউ মাংস রাঁধতে বসল। তারপর মাংস রান্না হলে বউ ঝিকে বললেন—‘ঝি! দ্যাখদেখি মাংসে নুন ঠিক হয়েছে কি না।’ মাংস খেয়ে ঝি বললে, ‘উঃ, যে গরম দিয়েছ, এর কিছুই স্বাদ পেলাম না, —আর একটু দাও দেখি।’ বউ আর একটু দিলে। সেবার মাংস খেয়ে ঝি বললে, ‘কীরকম কীরকম লাগছে, কিছু ঠিক করতে পারছি না।’ ঝি কোনো দিন মাংস খায়নি, তার বড়ো লোভ হল; সে বার বার মাংস চেয়ে খেতে লাগল। এমনি করে চাকতে চাকতে প্রায় সব মাংস খেয়ে ফেললে। তখন বউ বললে, ‘ঝি, তুই সর্বনাশ করলি! আমি এখন মাংস কোথায় পাই?’ ঝি বললে, ‘তাই তো, কী হবে! দেখি, যদি বাজারে মাংস পাই’—এই বলে ঝি মাংস আনতে গেল। ঝি কোথাও মাংস পেলে না। শেষে, রাস্তায় একটা মরা বাছুর পড়ে ছিল, তারই খানিকটা মাংস লুকিয়ে কেটে নিয়ে বাড়িতে এল।

বউ তাড়াতাড়ি করে সেই মাংস রাঁধতে লাগল। অনেকক্ষণ ধরে সিদ্ধ করলে, তবুও মাংস সিদ্ধ হল না। তখন বউ বললে, ‘ঝি, তুই কী মাংস আনলি? এখনও যে সিদ্ধ হল না। এখনি সব খেতে বসবেন, আমি কোথা থেকে মাংস দোব?’ খানিক পরে তার শ্বশুর এসে বললেন, ‘বউমা, রান্নার কতদূর, বড়ো বেলা হয়েছে।’ বউ-এর তো মুখ শুকিয়ে গেল। তখন বউ ঝিকে বললে, ‘ঝি! তুই ঠিক করে বল, এ কীসের মাংস এনেছিস? ঝি বললে, ‘আমি জানি না বাপু, যেন কী রকম সন্দেহ হচ্ছে! তা নইলে এখনও মাংস সিদ্ধ হচ্ছে না কেন?’ বউ বলে, ‘সর্বনাশ করেছিস! সন্দেহ হচ্ছে কীরে! এখন এ মাংস কী রকম করে ব্রাহ্মণের পাতে দিই; এ কিছুতেই সিদ্ধ হল না, এখন উপায়!’ ঝি বললে, ‘তাই তো বউঠাকরুণ, কী হবে!’ দুজনে গালে হাত দিয়ে বসে ভাবতে লাগল। শেষে বউ একটা মতলব ঠাউরে বললে, ‘দ্যাখ ঝি, তুই চারিদিকে জল ঢেলে পিছল করে রাখ, আমি যেমনি পরিবেশন করতে যাব, অমনি পা পিছলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাব। তখনই তুই রান্নাঘরে ঢুকে জল এনে আমার মুখে চোখে দিবি। তাহলেই সব ভাত-ব্যঞ্জন নষ্ট হয়ে যাবে।’

এই ঠিক করে, শ্বশুর খেতে বসলে পর, বউ থালা করে ভাত-ব্যঞ্জন নিয়ে আসতে আসতে, পা পিছলে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। অন্ন-ব্যঞ্জন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ঝি তাড়াতাড়ি করে রান্নাঘরে ঢুকে জল এনে বউয়ের চোখে-মুখে দিতে লাগল। তারপর অনেক কষ্টে বউয়ের জ্ঞান হল শ্বশুরের আর খাওয়া হল না; কোনো রকমে জাত রক্ষা হল। বউ তখন কীসের মাংস ঝি এনেছিল খোঁজ করতে স্বামীকে পাঠালে। তখন খোঁজ-খবর করাতে ঝিয়ের মরা বাছুর কাটার কথা প্রকাশ হয়ে পড়ল। সে দিন ষষ্ঠী, বউ মূলো, কলা ও পান দিয়ে মা ষষ্ঠীর পুজো করে মরা বাছুরের উপর ফুল জল ছড়িয়ে দিলে। তখনি মরা গোরু বেঁচে উঠল। সকলে অবাক হয়ে গেল, চারিদিকে ধন্যি ধন্যি পড়ে গেল। বউ তখন শ্বশুরের কাছে আগাগোড়া সব ঘটনা বললে। শ্বশুর শুনে বললেন, ‘আহা বউমা আমার স্বয়ং লক্ষ্মী ঠাকরুণ।’ ষষ্ঠী ঠাকরুণের উপর তাঁর খুব ভক্তি হল। তিনি খুব ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করে তাঁর মাহাত্ম্য প্রচার করলেন। বউয়ের বাছুর বাঁচানোর কথা চারিদিকে আন্দোলন হতে লাগল। তখন তিনি বললেন, ‘অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন মাছ-মাংস খেলে গোমাংস খাওয়ার পাপ হবে। সে দিন মা ষষ্ঠীর পুজো করে মাংসের বদলে মুলোর ব্যঞ্জন দিয়ে রুটি খাবে। এর নাম থাকল মুলা ষষ্ঠী।’ সেই অবধি অগ্রহায়ণ মাসে মুলা ষষ্ঠী প্রচার হল।

মুলা ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত।

পাটাই ষষ্ঠীর কথা

এক বিধবা ব্রাহ্মণীর একটি বউ; বউটির বড়ো নোলা, ঠাকুর-দেবতা মানে না, বার-ব্রত কিছুই করে না। ঠাকুরঘরে নৈবেদ্য করা থাকলেও সে নৈবেদ্যের কলা-সন্দেশ চুরি করে খেত। সেই পাপে বউটির যত ছেলে হয় সব মরে যায়, তবুও তার নোলার দোষ গেল না। শাশুড়ি মনে করলেন, বউমাকে এবার পাটাই ব্রত করাতে হবে; এ মনে করে পৌষ মাসে শুক্লা চতুর্দশীর দিন সকালবেলা তিনি বউকে কতকগুলি কালো কাপড় দিয়ে বললেন, ‘দেখ বউমা! এগুলি বেশ করে কেচে আন।’ বউ সেই কাপড়গুলি নিয়ে ঘাটে চলে গেল। শাশুড়ি পাটাই ব্রত্যের আয়োজন করলেন। উঠানে ছোটো একটি পুকুর কেটে বেনা গাছের পাটাই সেই পুকুর ধারে পুঁতলেন। তারপর পুরুতঠাকুরকে সেখানে আসনে বসিয়ে বউয়ের জন্য তিনি ঘর-বার করতে লাগলেন।

এমন সময়ে পাড়ায় পাড়ায় শাঁখ ঘণ্টা বেজে উঠল, ঝি বউয়েরা সব উলুধ্বনি দিতে লাগল। ওখানে বউ কাপড় কাচতে কাচতে তাই শুনতে পেয়ে ভাবলে, ‘ওমা! আজ যে পাটাই ব্রত, ঘরে কত কী খাবার তৈরি হয়েছে, আর আমি কিছুই খেতে পেলুম না।’ বউ তাড়াতাড়ি কাপড় ফেলে রেখে খাবার জন্য বাড়ির দিকে ছুটল। একে বেলা হয়েছে, তাতে কিছু না খাওয়াতে বউয়ের মাথা ঘুরতে লাগল। পথে আসতে আসতে বেনা গাছের মূলে পা জড়িয়ে পড়ে গিয়ে পথের ধারে বউ মূর্ছা গেল। পাটাই ব্রতের যে কয়খানি নৈবেদ্য হয়, তার মধ্যে একখানি ধোপা বউ পায়, সে তাই নিতে আসছিল। বউয়ের দুর্দশা দেখে তাড়াতাড়ি গিন্নীকে এসে বললে, ‘ও বামুন মা! তোমার বউ কেন ওখানে পড়ে গোঁ-গোঁ করছে গো!’ এই কথা শুনে ব্রাহ্মণী তাড়াতাড়ি গিয়ে বউয়ের মুখে-চোখে জল দিয়ে তুলে বসিয়ে বললেন, ‘নানা কারণে বার বার নাটা-পাটা হচ্ছিস মা! আজ থেকে পাটাই ব্রত করো, ভালো হবে।’ গিন্নি বউকে নাইয়ে ধুইয়ে পাটাই ব্রতের কাছে এনে বসালেন। ব্রত শেষ হলে তিনি বউকে বললেন, ‘পাটাই ঠাকুরকে প্রণাম করে বর চেয়ে নাও।’ বউ প্রণাম করে বর চেয়ে নিলে। সেই থেকে বউ প্রতি বৎসর পাটাই ব্রত করতে লাগল। ক্রমে তার অনেকগুলি ছেলে মেয়ে হল। এবার সব বেঁচে রইল। তাই দেখে পাড়ার সকলে পাটাই ব্রত আরম্ভ করলে। ক্রমে পাটাই ষষ্ঠীর মাহাত্ম্য চারিদিকে প্রচার হল।

পাটাই ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত।

শীতল ষষ্ঠীর কথা

এক দেশে এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী বাস করতেন। ব্রাহ্মণের এক ছেলে ও একটি বউ; বউয়ের ছেলেপুলে কিছুই হল না। সেই জন্যে তাঁরা দিন রাত মা ষষ্ঠীর কাছে প্রার্থনা করেন—‘হে মা ষষ্ঠী, বউমার যেন একটি ছেলে হয়।’ শেষে মা ষষ্ঠীর দয়াতে বউয়ের গর্ভ হল। ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণীর আর আহ্লাদের সীমা নেই। গর্ভটি খুব বড়ো হল। এক বৎসর গেল তবুও ছেলে হল না। একদিন বউটি খেয়ে দেয়ে ঘাটে মুখ ধুতে গেছে, এমন সময় হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গিয়ে একটি লাউয়ের মতো থলে প্রসব করলে। বউটি বাড়ি গিয়ে শাশুড়িকে সব বললে। শাশুড়ি ঘাটে গিয়ে দেখেন যে একটা কাকে সেই থলেটা ছিঁড়ে ফেলেছে, আর কতকগুলো ছোটো ছেলে তার ভিতর কিলবিল করছে। এই না দেখে ব্রাহ্মণী বাড়ি গিয়ে কর্তাকে ডেকে নিয়ে এলেন। কর্তা আহ্লাদ করে সেই থলেটি বাড়ি নিয়ে গেলেন। গুণে দেখলেন যে ষাটটি ছেলে। তখন আঁতুড়-ঘর বাঁধা হল, দাই এল, সেঁক-তাপ হল, ব্রাহ্মণ ঘটা করে ষেটেরা পুজো করলেন। তার পর ষষ্ঠী পুজো করে বউকে নাইয়ে ধুইয়ে ঘরে তুললেন। ক্রমে ছেলেগুলি বড়ো হল, ঘরে আর ধরে না।

ব্রাহ্মণী কর্তাকে বললেন, মা ষষ্ঠীর কৃপায় ষেটের ষাটটি ছেলে হয়েছে, এখন ছেলেদের জন্যে ষাটটি ঘর করো। কর্তা ঘর করতে আরম্ভ করলেন। এদিকে ছেলেগুলি বড়ো হল, লেখা-পড়া শিখলে, ক্রমে পৈতে হল। তারপর ঘর হলে যে যার ঘর দখল করলে। কর্তা গিন্নির ভারি আহ্লাদ, বড়ো বাড়ি হল, ষাটটি নাতি হল, এখন তাদের নিয়ে বেশ মনের আনন্দে তাঁরা কাল কাটাতে লাগলেন।

একদিন ছেলে বললে, ‘মা, যেমন আমাদের ছেলে ছিল না, তেমনি মা ষষ্ঠী একেবারে এক ঘর ছেলে দিয়েছেন। এরা বড়ো হয়েছে, এখন আবার এদের বিয়ে দিলে আর এ বাড়িতে জায়গা হবে না, তাই ভাবছি কী হবে—এদের আর বিয়ে দেব না।’ তখন মা বললেন, ‘সে কিরে, তা হলে যে বংশ লোপ হবে, বিয়ে না দিলে কি হয়!’ তখন বউ এসে বললে, ‘মা, যদি বিয়ে দিতে হয়, তা হলে যে ঘরে একেবারে ষাটটি মেয়ে পাওয়া যাবে, সেই ঘরে আমার ছেলেদের বিয়ে দেব, তা নইলে বিয়ে দেব না।’ ব্রাহ্মণী বল্লেন, ‘তবেই হয়েছে, তোমার মতো কে মা ষাটটি মেয়ে বিইয়ে বসে আছে যে, তোমার ছেলেদের বিয়ে হবে! দুজনে বুঝি বসে বসে এই মতলব করেছ?’ ছেলে বললে, ‘সেই বেশ কথা মা, একেবারে ষাটটি মেয়ে চাই, তা নইলে বিয়ে হবে না।’

রোজ এই রকম নানা কথা হয়, ক্রমে ছেলেগুলি বিয়ের যুগ্যি হল। তখন গিন্নি কর্তাকে বললেন, ‘নাতিরা যে ডাগর হয়ে উঠল, বিয়ে থা দাও। খালি ঘরে বসে থাকলে চলবে কেন, মেয়ে খোঁজ। বউমা আবার কোট ধরেছেন, যে আমার মতো ষাটটি মেয়ে প্রসব করেছে, তার মেয়েদের সঙ্গে আমার ছেলেদের বিয়ে দেব, তা নইলে বিয়ে দেব না।’ কর্তা শুনে বললেন, ‘সর্বনাশ! তাও কি কখন হয়? তাহলে ওদের ইচ্ছে নয় যে, ছেলেদের বিয়ে থা হোক।’ গিন্নি বললেন, ‘তা এখন খুঁজে দেখতে তো হবে। যখন মা ষষ্ঠী ছেলে দিয়েছেন তখন কনেও ঠিক করে রেখেছেন। তুমি ভাবছ কেন, সব মা ষষ্ঠীর খেলা। দেখবে তিনি বউয়ের কোট ঠিক বজায় রাখবেন।’ গিন্নির কথায় কর্তা তখন মেয়ে খুঁজতে বেরলেন।

কর্তা এদেশ ওদেশ করে কত জায়গায় খুঁজলেন, কিন্তু কোথাও সে রকম মেয়ে পাওয়া গেল না। একথা যে শোনে, সেই অবাক হয়ে যায়। এদিকে মা ষষ্ঠী ব্রাহ্মণকে ঠিক কনেদের দেশে এনে ফেললেন। ব্রাহ্মণ ঘুরতে ঘুরতে এক দেশে গিয়ে দেখেন যে, একটি বাঁধা ঘাটে বসে একটি বউ বিস্তর মেয়েকে স্নান করাবার জন্য তেল হলুদ মাখাচ্ছেন। ব্রাহ্মণ তো দেখেই অবাক! তিনি আহ্লাদে মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে সেই বউয়ের কাছে গিয়ে বললেন, ‘মা, এগুলি কি সব তোমার মেয়ে!’ বউ একটু ঘোমটা টেনে বললে, ‘হ্যাঁ বাবা, এত পাপ করেছিলুম যে, ভগবান আমায় একেবারে ষাটটা মেয়ে দিয়েছেন। একে খাওয়াবার পয়সা নেই, তার উপর আবার কী করে যে বিয়ে থা দেব, তাই বাবা ভাবছি।’ এই কথা শুনে কর্তা বললেন, ‘মা, তোমরা কি ব্রাহ্মণ?’ ‘হ্যাঁ বাবা, ব্রাহ্মণ না হলে আর ভগবান এত দুঃখু কাদের কপালে লিখে থাকেন।’ এই কথা শুনে কর্তা আহ্লাদ করে বললেন, ‘বেশ হয়েছে মা, আমার নাতিদের সঙ্গে তোমার মেয়েদের বিয়ে দেব। যদি তোমার ইচ্ছে হয়, তাহলে বাড়িতে চল, কর্তাদের সঙ্গে কথাবার্তা ঠিক করে ফেলি।’

তখন বউটি সমস্ত মেয়েদের নাইয়ে ধুইয়ে ব্রাহ্মণকে সঙ্গে করে বাড়ি এল। বাড়ির কর্তা, ব্রাহ্মণের সঙ্গে কথাবার্তা করে বিয়ের ঠিক করলেন। তারপর ব্রাহ্মণ বাড়িতে এসে সব কথা বললেন। তখন সকলে আহ্লাদ করে যথা দিনে ষাটটি ছেলের বিয়ে দিলেন; ষাটটি বউ ঘরে এলো। গিন্নি বললেন, বউমা যেমন কোট করেছিল, মা ষষ্ঠী তেমনি মুখ রেখেছেন। তখন ঘটা করে বাড়িতে মা ষষ্ঠীর পূজো হল।

একদিন ব্রাহ্মণীর কী মতিচ্ছন্ন ধরল। সে দিন মাঘ মাস, শীতল ষষ্ঠী পূজো, খুব জল হচ্ছে, শীতও খুব পড়েছে। ব্রাহ্মণী নাত-বউদের ডেকে বললেন, ‘আজ আমি ঠাণ্ডা জলে নাইতে পারব না, আমার বড়ো শীত করছে। আমার জন্যে এক হাঁড়ি গরম জল করো, আর চাট্টি গরম ভাত রেঁধে দাও। আমি এত ঠাণ্ডায় জল দেওয়া ভাত খেতে পারব না।’ নাত-বউরা সব মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। বউ বললে, ‘মা, তোমার কি ভীমরতি হয়েছে, আজ যে শীতল ষষ্ঠী, আজ কি উনুন জ্বালতে আছে?’ গিন্নি বললেন, ‘তা হোক বাছা, আমায় চাট্টি রেঁধে দাও।’ বউরা তখন কী করে, তাড়াতাড়ি জল গরম করে দিলে, গরম গরম ভাত রেঁধে দিলে, গিন্নি স্নান করে গরম ভাত খেলেন। তারপর সকলে খেয়েদেয়ে ঘরে শুল। সকালে গিন্নি ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে, সব মরে রয়েছে—বউ, বেটা, নাতিরা, নাত-বউয়েরা, কর্তা, বেড়াল, কুকুর, গোরু, বাছুর পর্যন্ত সব মরে রয়েছে। গিন্নি চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর কান্নার শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা সব ছুটে এল। বাড়ির কান্ড দেখে সকলে অবাক! বললে, ‘সে কি গো! আচম্বিতে কেন এমন হল?’ মা ষষ্ঠী বৃদ্ধ ব্রাহ্মণীর বেশ ধরে দেখা দিয়ে গিন্নিকে বললেন ‘কালকের মতো খুব গরম গরম ভাত খাও, গরম জলে স্নান করো, তাহলে তোমার ছেলে পুলে সব বাঁচবে!’ সকলে বললে, ‘ওমা, তা কি তখন করতে আছে গা! শীতল ষষ্ঠীর দিনে কি গরম ভাত খেতে আছে?’ তখন সকলে গিন্নির উপর রাগ করে বললে, ‘যেমন কাজ করেছ, তেমনি এখন মাথা খুঁড়ে মর!’ এই বলে সকলে যে যার বাড়ি চলে গেল।

তখন ষষ্ঠী বুড়ি রেগে বললেন, ‘তোর নাত-বউয়েরা যে শীতল ষষ্ঠী পেতেছে, সেই ষষ্ঠীর গায়ে যে দই আর হলুদ আছে তাই এনে আগে কুকুরের কপালে ফোঁটা দে, তার পর সকলকার কপালে দে, আর ওই হলুদ ছোপান যে সূতো আছে, ছেলে আর নাতিদের হাতে তাগা বেঁধে দে। আর কখনো শীতল ষষ্ঠীর দিন গরম ভাত খাসনি, গরম জলে স্নান করিসনি।’ এই বলে মা ষষ্ঠী অন্তর্ধান হলেন। গিন্নি গলায় কাপড় দিয়ে শীতল ষষ্ঠীর কাছে প্রণাম করে, সেই দই ও হুলদ নিয়ে আগে কুকুরের কপালে ফোঁটা দিলেন। তারপর ছেলেপুলের কপালে ফোঁটা দিতেই সকলে যেন ঘুম ভেঙে উঠল। তখন ব্রাহ্মণী কাঁদতে কাঁদতে নাতি, নাত-বউয়েদের কাছে এই সব ঘটনা বলে ছেলেদের হাতে সুতো বেঁধে দিলেন। কর্তাও যেন ঘুম থেকে উঠল। তারপর তিনি এই সব কথা শুনে রাগ করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণীকে বকতে লাগলেন। তখন তিনি খুব ধূমধাম করে মা ষষ্ঠীর পুজা করলেন। এই সব কথা চারিদিকে রাষ্ট্র হল, সেই থেকে শীতল ষষ্ঠীর কথা পৃথিবীতে প্রচার হল। দই, পান্তা, গোটা সিদ্ধ খেয়ে শীতল ষষ্ঠী করতে হয়। সে দিন গরম ভাত খেতে নেই।

শীতল ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত।

অশোক ষষ্ঠীর কথা

কোনও অশোকবনে এক মুনি বাস করতেন। চারিদিকে অশোক ফুলের গাছ, মাঝখানে মুনির কুঁড়েঘর। একদিন মুনি সকালে উঠে দেখেন, তাঁর কুঁড়েঘরের সামনে অশোক তলায় একটি পদ্মফুলের মতো মেয়ে পড়ে পড়ে কাঁদছে। মুনি ধ্যান করে দেখলেন, একটি বুনো হরিণী ওই মেয়েটি প্রসব করে ফেলে গেছে। মেয়েটিকে দেখে মুনির বড়ো মায়া হল, তিনি সেটিকে ঘরে এনে লালন-পালন করতে লাগলেন। মেয়েটি একলা শুয়ে থাকলে হরিণী এসে মাঝে মাঝে দুধ দিয়ে যেত। ক্রমে মেয়েটি বড়ো হল; মুনি ভাবেন—এমন সুন্দরী মেয়ে কুঁড়েঘরে রেখে আমি কোথাও গিয়ে স্থির থাকতে পারি না। মেয়েটিকে একটি সৎপাত্রে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হই। মুনি কোথাও যাবার সময় মেয়েটিকে বলে যান, ‘মা অশোকা! আমি যতক্ষণ না আসি ততক্ষণ তুমি কুটিরের বাহিরে যেও না।’ মেয়েটি তাই ঘরের ভিতরেই থাকে।

মুনি আর মনের মতো পাত্র পান না। তখন প্রতিজ্ঞা করলেন, কাল সকালে উঠে যার মুখ দেখব তার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেব। দৈবের কর্ম, সকালে উঠে দেখেন, এক রাজপুত্র মুনির কুটিরের দরজায় লোক-লস্কর নিয়ে উপস্থিত। মুনি বললেন, ‘তুমি কে? এখানে কেন?’ রাজপুত্র বললেন, ‘আমি রাজার ছেলে, মৃগয়া করতে এসেছিলাম, সন্ধ্যা থেকে সমস্ত রাত্রি ঝড়-বৃষ্টি হওয়াতে আমি আপনার এই কুটির-দ্বারে আশ্রয় নিয়েছি।’ মুনি বললেন, ‘তা ভালোই হয়েছে, আমার একটি মেয়ে আছে, সেটি তোমায় দান করব।’ এই বলে তিনি অশোকাকে এনে হাতটি ধরে রাজপুত্রের হাতে সঁপে দিলেন। আর মেয়েটির আঁচলে কতকগুলি অশোক ফুল ও বিচি দিয়ে বললেন, ‘মা! এই ফুলগুলি শুকিয়ে রেখ, চৈত্রমাসে অশোক ষষ্ঠীর দিনে খাবে; আর এই অশোক দানাগুলি দুহাতে ছড়াতে ছড়াতে যেও। আমার কুটির থেকে রাজপুত্রের বাড়ি পর্যন্ত অশোকফুলের গাছ হবে। যদি তোমার কখনও বিপদ ঘটে, তবে ওই গাছের সার ধরে ধরে আমার কুটিরে এসো। আর অশোক ষষ্ঠীর দিন কখনও অন্ন আহার করো না।’ তখন রাজপুত্র ও অশোকা দুজনে মুনিকে প্রণাম করে যেতে লাগলেন। অশোকা দুহাতে অশোক ফুলের বিচি ছড়াতে ছড়াতে শ্বশুরবাড়ি গেল। রাজা রানি আদর করে বউ-বেটাকে ঘরে তুললেন।

কিছুদিন পরে অশোকার একটি ছেলে হল। তারপর ক্রমে ক্রমে সাতটি ছেলে ও একটি মেয়ে হল। ছেলেদের বিয়ে থা হল। তারপর শ্বশুর শাশুড়ি যথাসময়ে স্বর্গে গেলেন। চৈত্রমাসে অশোক ষষ্ঠীর দিন শ্বশুরের শ্রাদ্ধ; সমস্ত দিন গোলমালে গেল। সন্ধ্যার সময় অশোকার বউয়েরা বললে, ‘ওমা, ভাত খাবে এস।’ অশোকা বললে, ‘আমার মনে ছিল না মা! আজ যে আমার অশোক ষষ্ঠী।’ তখন বউয়েরা তাড়াতাড়ি মুগ কলাই সিদ্ধ করে এনে দিলে। রাত্রে ছেলেরা বউয়েরা ঘরে ঘরে শুয়ে রইল। সকালে কেউ আর ওঠে না। এক প্রহর বেলা হয়ে গেল, কেউ ঘরের দরজা খোলে না! অশোকা এ ঘরে ধাক্কা মারে, ও ঘরে ধাক্কা মারে, কেউ সাড়া দেয় না। তখন রাজা কামার ডেকে দরজা ভেঙে দেখেন, বউ, বেটা নাতি, নাতনি সব মরে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এই দেখে রাজা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আশোকা, কী হবে?’ তখন অশোকার সেই মুনির কথা মনে পড়ল। অমনি কাঁদতে কাঁদতে অশোকফুলের গাছ ধরে বরাবর সেই মুনির কুটিরে গিয়ে, মুনির পায়ে পড়ে কাঁদতে লাগল, বললে ‘বাবা! আমার সর্বনাশ হয়েছে; ছেলেপুলে সব মরে গেছে!’

মুনি তখন ধ্যানে সব জানতে পারলেন। মেয়েকে সান্ত্বনা করে বললেন, ‘তুমি অশোক ষষ্ঠীর দিন যে মুগ কলাই সিদ্ধ করে খেয়েছিলে, সেই মুগ ঘুঁটের জ্বালে সিদ্ধ হয়েছিল, সেই ঘুঁটের সঙ্গে ধান ছিল, সেই ধান আগুন-তাতে ফুটে খই হয়ে মুগসিদ্ধর হাঁড়িতে পড়েছিল। সেই মুগসিদ্ধ খেয়ে তোমার এই সর্বনাশ হয়েছে। ভয় নাই, আমার এই কমন্ডলুর জল নিয়ে যাও, সকলের গায়ে ছিটিয়ে দাও, তাহলে সকলেই বেঁচে উঠবে। আর কখনও এমন কাজ করো না। বছর বছর অশোক ষষ্ঠীর দিন মা ষষ্ঠীর পুজো দিয়ে কথা শুনে ছয়টি অশোক কলি, ছয়টি মুগ কলাই দইয়ের সঙ্গে খেয়ে তবে অন্য কিছু খাবে।’ অশোকা তখন মুনিকে প্রণাম করে নিজের বাড়ি গেলেন। কমন্ডলুর জল সকলের গায়ে ছিটিয়ে দিবা মাত্র সকলে উঠে বসল! কেউ বলে, এত ঘুমিয়ে পড়েছি; কেউ বলে, আমাদের ডাকনি কেন মা? এত বেলা হয়েছে। অশোকা বললে ‘তোরা কেউ কি বেঁচেছিলি বাছা? অশোক ষষ্ঠীর দিন মুগ কলাই সিদ্ধর সঙ্গে খই পড়েছিল, সেই মুগসিদ্ধ খেয়ে আমার সর্বনাশ হয়েছিল, তোমরা সব মরে গিয়েছিলে। এখন তোমরা খুব সাবধানে অশোক ষষ্ঠী করো। বছর বছর চৈত্রমাসে শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীর দিনে মা ষষ্ঠীর পুজো দিয়ে মুগ কলাইয়ের সঙ্গে অশোক ফুলের কলি নিয়ে আমার এই বিপদভঞ্জনের কথা বলবে, তাহলে কখনও শোক পাবে না। এই বলে অশোকা ছেলে, বউ, নাতি, নাতনি নিয়ে রাজার সঙ্গে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করতে লাগল।

রাজা মা ষষ্ঠীর এই আশ্চর্য মাহাত্ম্য দেখে তাঁর রাজ্যের সমস্ত প্রজাদের এই অশোক ষষ্ঠীর ব্রত করাতে লাগলেন। সেই অবধি চারিদিকে অশোক ষষ্ঠীর পুজো প্রচার হল।

অশোক ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত।

নীল ষষ্ঠীর কথা

এক ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী থাকেন। ব্রাহ্মণ বড়ো নিষ্ঠাবান। তাঁর স্ত্রী সব রকম বারব্রত করেন, তথাপি তাঁদের যত ছেলে হয় সব মরে যায়। তখন তাঁরা মনের দুঃখে বললেন, বারব্রত, ধর্মকর্ম সব মিছে, আর এদেশে থাকব না, চল কাশী যাই। তারপর তাঁরা কাশী গিয়ে রইলেন। একদিন তাঁরা গঙ্গাস্নান করে ঘাটে বসে বসে কাঁদছেন, এমন সময় মা ষষ্ঠী সন্ন্যাসিনীর বেশ ধরে তাঁদের কাছে এসে বললেন, ‘তোমরা ঘাটে বসে কাঁদছ কেন গা?’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘তোমায় বলে কি হবে মা! বড়ো মনের জ্বালায় জ্বলছি, আমাদের পাঁচটি ছেলে ও একটি মেয়ে হয়েছিল মা, সব গেছে। এখন দেখছি অদৃষ্ট ছাড়া পথ নেই, বারব্রত সব মিথ্যে।’ তখন সন্ন্যাসিনী বললেন, ‘সে কী মা! ঠাকুর দেবতা কখনও কি মিথ্যে হয়! তোমাদের একটা বড়ো দোষ, বারব্রত কর বলে তোমাদের মনে মনে বড়ো অহঙ্কার। সেই পাপে তোমাদের ছেলে বাঁচে না। বারব্রত শুধু করলে কী হবে, মন পবিত্র রাখা চাই, ধর্মে বিশ্বাস থাকা চাই, ছেলের কল্যাণের জন্যে ভগবানকে দিন রাত ডাকা চাই, সকলকার কাছে নিনু হয়ে থাকবে, তবে তো তাঁর দয়া হবে। তোমরা ছেলে ছেলে করছ যে, ছেলের দেবতা ষষ্ঠীঠাকরুণকে কি মানো?’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘সে কী মা! মা ষষ্ঠীকে কে না মানে?’ সন্ন্যাসিনী বললেন, ‘যদি ছেলে বাঁচাতে চাও, তাহলে মা ষষ্ঠীকে একটু করে মেনো, রোজ তাঁকে নমস্কার করবে; তাঁর সব রকম পালনি করবে, তবে তো তাঁর দয়া হবে।’ তখন ব্রাহ্মণী সন্ন্যাসিনীর পায়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমাদের কি অহঙ্কার হয়েছে মা! আর মা ষষ্ঠীর সব রকম ব্রতও তো করি।’

তখন সন্ন্যাসিনী বললেন, ‘কই, কখনও কি নীল ষষ্ঠী করেছ?’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘সে কী রকম মা! এ ব্রতের নাম তো জানি না, এর নিয়মই বা কী!’ তখন সন্ন্যাসিনী বললেন, ‘সমস্ত চৈত্রমাস সন্ন্যাস করে প্রত্যহ শিবপূজো করবে। তারপর সংক্রান্তির আগের দিন সমস্ত দিনের বেলা উপবাস করে সন্ধ্যার সময় নীলাবতীর পুজো করে, নীলকন্ঠ শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে দিয়ে, মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে, তবে জল খাবে। ওই দিনকে নীল ষষ্ঠীর দিন বলে। নীল ষষ্ঠী করলে মা ষষ্ঠীর দয়া হতেই হবে। কারণ নীল ষষ্ঠী করলে কখনও ছেলে মরে না। তাই বলছি, এবার নীল ষষ্ঠী করো, দেখবে তোমার ছেলে মরবে না।’ এই বলে মা ষষ্ঠী অন্তর্ধান হলেন। ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণী সেই থেকে খুব ভক্তি করে নীল ষষ্ঠীর পুজো করতে লাগলেন। ক্রমে তাঁদের ছেলেপুলে হল, সেগুলি সব বেঁচে রইল। ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীর সুখ দেখে পাড়ার সকলে নীল ষষ্ঠীর ব্রত করতে লাগল। সেই থেকে নীল ষষ্ঠীর পূজো প্রচার হল।

নীল ষষ্ঠীর কথা সমাপ্ত।

মনসার কথা

এক বেনে সওদাগর, তাঁর সাত বউ। সকলকার বাপের বাড়ি থেকে তত্ত্ব আসে, কেবল ছোটো বউয়ের তত্ত্ব আসে না। এইজন্যে গিন্নি তাকে দেখতে পারেন না। ছোটো বউ মনের দুঃখে চুপ করে থাকে, কারও সঙ্গে কথা কয় না। একদিন ঝম ঝম করে জল পড়ছে, আকাশ মেঘে অন্ধকার হয়ে রয়েছে, সওদাগরের বউয়েরা বসে বসে গল্প করছে। কেউ বলছে, ‘এই বাদলায় বেশ গরম গরম খিচুড়ি হত!’ কেউ বলছে, ‘না ভাই, এ সময় চাল কলাই ভাজা বেশ লাগে।’ এই রকম যার মনে যা এল বলতে লাগল। ছোটো বউ কিছুই বললে না। তখন ছয় জায়ে পীড়াপীড়ি করে বললে, ‘বলনা ভাই, তোর কী খেতে ইচ্ছে হচ্ছে?’ ছোটো বউ পোয়াতি, তার কিছুই খেতে ইচ্ছে হয় না; অনেক ভেবে চিন্তে বললে, ‘আমার কেবল মাছের অম্বল দিয়ে দুটি পান্তাভাত খেতে ইচ্ছে করছে।’ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হল। তখনও টিপ টিপ করে জল পড়ছে। সব বউয়েরা বললে, ‘চল ভাই, কাপড় কেচে আসি।’ তখন সকলে পুকুরের কাপড় কাচতে গেল।

সওদাগরের বাড়ির কাছে একটা বন ছিল। বনের মধ্যে অষ্টনাগ বাস করত। একদিন বনে আগুন লাগাতে অষ্টনাগ বন থেকে পালিয়ে পুকুরে মাছের ঝাঁক হয়ে রইল। সে দিন সন্ধ্যাবেলা সাত জায়ে যখন কাপড় কাচছে, তখন ছোটোবউ ওই মাছের ঝাঁক দেখতে পেলে। অমনি গামছা দিয়ে সেইগুলিকে ধরে নিয়ে এল। তখন সকলে বললে, ‘ওই দেখছিস লা, ছোটো বউয়েরই সাধ মিটল।’ ছোটো বউ আহ্লাদে আটখানা হয়ে সেগুলিকে একটি কলসির ভিতর জলে রেখে দিলে। তার পরদিন ছোটো বউ অম্বল রাঁধবার জন্য মাছ আনতে গিয়ে দেখে সর্বনাশ! সেই মাছগুলি আটটি সাপ হয়ে রয়েছে। ছোটো বউ তাই দেখে ভয় না পেয়ে, সাপগুলিকে পুষতে লাগল। তাদের রোজ আট পো করে দুধ, আর আটটি করে কলা খাওয়াতে লাগল। সাপের ছানারা রোজ রোজ সেই দুধ কলা খেয়ে ভারি খুশি হল। একদিন তারা পরামর্শ করলে, ‘ভাই! ছোটো বউ আমাদের যেমনি খাওয়াচ্ছে, তেমনি এর কিছু উপকার করতে হবে।’

কিছুদিন পরে তারা একটু বড়ো হতেই মা মনসার কাছে চলে গেল। মা মনসা স্বর্গে থাকেন। ছেলেদের না দেখতে পেয়ে কান্নাকাটি করছিলেন, এমন সময় ছেলেরা সেইখানে যেতে, তিনি বললেন, ‘এতদিন তোরা কোথায় ছিলি?’ ছেলেরা বললে, ‘মা! আমরা বড়ো বিপদে পড়েছিলুম। এক সওদাগরের ছোটো বউ আমাদের এ যাত্রা বাঁচিয়েছে।’ এই সব কথা তারা মা মনসার কাছে বললে। তখন তিনি শুনে ভারি দুঃখিত হলেন। তাঁর দুঃখ দেখে অষ্টনাগ বলতে লাগল, ‘মা! ছোটো বউকে এখানে আনতে হবে, তার শাশুড়ি তাকে ভারি কষ্ট দেয়।’ এই কথা শুনে মা মনসা বললেন, ‘তাকে আনা হবে না বাপু। কারণ তোমরা ভারি খল জাত, কথায় কথায় রাগ করো। আর সে বেচারি নরলোক হতে আসবে, পদে পদে অপরাধ করবে, আর তোমরা তাকে খেয়ে ফেলবে। তাহলে আমার অভয়া নামে কলঙ্ক হবে।’ এই কথা শুনে অষ্টনাগ বললে, ‘না মা, আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, তা কখনই হবে না। আমরা তাকে কিচ্ছু বলব না। আহা! তার ভারি কষ্ট! তার শাশুড়ি বলে, ছোটো বউয়ের বাপের বাড়ির সবাই মরেছে, কেউ কখনো খোঁজ করে না। তা মা, তুমি তার মাসী হয়ে যাও, গিয়ে তাকে এখানে নিয়ে এসো। না আনলে আমরা খাব না।’

তখন মা মনসা স্বর্গ হতে মর্ত্যে এলেন। তিনি শাঁখা, সিঁদুর-চুবড়ি, নোয়া ও নথ নিয়ে সওদাগরের বাড়িতে গেলেন। গিন্নি তখন ছেলেদের কাছে বসে বসে সব বউদের নিন্দে করছিলেন। এমন সময় মনসাকে দেখে বললেন, ‘কে গা তুমি, কোথা থেকে এলে?’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি তোমার ছোটো বউয়ের মাসি গো, আমার বোনঝিকে নিতে এসেছি।’ গিন্নি বললেন, ‘সে কি গো! এত দিন কেউ কোথাও ছিল না, এখন মাসি-পিসি কোথা থেকে এল? যা হোক বাপু, তোমাদের মেয়ে তোমরা নিয়ে যাও।’ গিন্নি এই কথা বলতেই মা মনসা একখানি রথ আনলেন। ছোটো বউ সকলকে নমস্কার করে সেই রথে গিয়ে বসল। মা মনসা বললেন, ‘মা, তুমি চোখ বুজিয়ে বসে থাকো, আমি যখন চোখ খুলতে বলবো, তখন চোখ খুলবে।’ ছোটো বউ সেই রকম করে বসে রইল। এদিকে রথ গিয়ে স্বর্গে পৌঁছল। তখন মা মনসা চোখ খুলতে বললেন। ছোটো বউ চোখ খুলে দেখে, সুন্দর বাড়ি; আর সেই আটটি নাগ সেইখানে রয়েছে। ছোটো বউ দেখেই অবাক। মা মনসা বললেন, ‘দেখো মা, তুমি রোজ আমার পুজোর আয়োজন করবে, আর তোমার এই আট ভাইয়ের জন্যে দুধ গরম করে রাখবে। আর একটি কথা এই—তুমি কখনো দক্ষিণ দিকে চেও না।’

এই রকমে কিছুদিন যায়। একদিন ছোটো বউ হঠাৎ দক্ষিণ দিকে চেয়ে দেখলে যে মা মনসা নৃত্য করছেন। সেই অপরূপ নাচ দেখে ছোটো বউ অবাক হয়ে গেল। তখন আর অষ্টনাগের দুধ রাখা হল না। তারপর নৃত্য ভেঙে যেতেই তাড়াতাড়ি এসে দুধ গরম করে রাখলে। অষ্টনাগ এসে সেই গরম দুধে মুখ দিতেই তাদের মুখ পুড়ে গেল। তখন তারা ভারি রেগে বললে, ‘আজ আমরা ওকে খেয়ে ফেলবো।’ এই বলে তারা বাড়ির চারিদিকে পড়ে রইল। কেউ বা মনসাকে বলবার জন্যে রাস্তায় এগিয়ে রইল। মা মনসা এসেই ছেলেদের অবস্থা দেখে বললেন, ‘তখনি তো বলেছিলুম, যে মানুষেরা পদে পদে অপরাধ করে, তখন তোমরা কেউ আমার কথা শুনলে না, এখন আর রাগ করলে কী করব।’ এই কথা শুনে ছেলেরা বললে, ‘তা হোক, আজ আমরা ওকে খাব, আমাদের মুখ পুড়ে গেছে।’ তখন মা মনসা বললেন, ‘তা হবে না, আমার সামনে তোমরা কেউ ওকে খেতে পারবে না। আমি ওকে ওর শ্বশুরবাড়ি রেখে আসি।’ এই বলে তিনি ছোটো বউয়ের এক এক অঙ্গে এক একখানা সব রকম গয়না দিয়ে রথে চড়িয়ে শ্বশুরবাড়ি রেখে এলেন। আসবার সময় বলে এলেন, ‘দেখো মা! তোমার ভাইয়েরা তোমার ওপর ভারি রেগেছে। তুমি তোমার শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে ভাইয়েদের খুব সুখ্যাতি করবে, তাহলে তারা আর রাগ করবে না।’ এই কথা বলে তিনি চলে গেলেন। এদিকে অষ্টনাগ আনাচে কানাচে থেকে শুনতে লাগল, বেনেবউ তাদের নিন্দে করে কি না।

ছোটো বউ বাড়ি যেতেই সকলেই চোখ ঠারাঠারি করে বলাবলি করতে লাগল—‘ওমা! এ কী গো, এক অঙ্গে সোনা পরা, এ আবার ক ঠাট!’ বেনেবউ বুঝতে পেরে বললে:

‘বেঁচে থাক আমার আড়োন নাগ, পাড়োন নাগ,
ঢোঁড়া, বোড়া, পুঁয়ে;
বেঁচে থাক আমার আরুল পারুল কেউটে,
যাদের পাকেন মাসি নিয়ে।

বেঁচে থাক আট ভাই যার,
সোনার নূপুর পায়ে তার।
এবার এসেছি এক অঙ্গে পরে,
আবার আসব দু অঙ্গে পরে।

আমার গয়নার ভাবনা কি, তাড়াতাড়ি আসতে সব পরা হয়ে উঠল না।’ জায়েরা সকলে শুনে অবাক, ভয়ে কেউ কিছু বললে না। সাপেরা তখন ফিরে গিয়ে বললে, ‘মা! দিদিকে আর খাওয়া হল না। সে আমাদের কত সুখ্যাতি করছে, কত আশীর্বাদ করছে। তাকে আবার এনে আর এক অঙ্গের গয়না দাও, নইলে নিন্দে হবে।’ মা মনসা তখন খুশি হয়ে গয়না ও কাপড় নিয়ে বললেন, ‘না বাবা! তোমাদের আর আনতে গিয়ে কাজ নেই, আমিই যাচ্ছি, এই সব দিয়ে আসব এখন।’ এই বলে তিনি স্বর্গ থেকে সওদাগরের বাড়িতে গেলেন। ‘কোথায় গো বিয়ান!’ বলে ডাকতেই, ছোটো বউ তখন ‘মাসিমা এসেছেন!’ বলে পায়ে লুটিয়ে পড়ল। মা মনসা একে একে সব গয়না ও কাপড় পরিয়ে দিলেন। যাবার সময় বললেন, ‘মা! আমি তোমার মাসি নই, আমি মনসা। তুমি এই পৃথিবীতে আমার পুজো প্রচার করবে। আমি ফণীমনসা গাছে সর্বদা থাকি। দশহরা ও নাগপঞ্চমীর দিনে ওই গাছ এনে আমার পুজো করবে, আর ভাদ্র মাসে অরন্ধনের দিন শুদ্ধাচারে পুজো করে আমাকে পান্তা ভাতের সাধ দেবে। যে আমাকে ওই রকম পুজো করবে, তার কখনো সাপের ভয় থাকবে না।’ এই কথা বলে তিনি সওদাগরের বাড়ি থেকে অন্তর্ধান হলেন। তারপর ছোটো বউ, শাশুড়ি ও জায়েদের কাছে এই সব কথা আগাগোড়া বলতে লাগল। এই সব শুনে শাশুড়ি ছোটো বউকে খুব ভালোবাসতে লাগল, স্বামী সোনার চক্ষে দেখলেন, ছোটো বউয়ের সুখ আর ধরে না। সেই থেকে তাঁরা মা মনসার পুজো করতে লাগলেন। ক্রমে পাড়াপড়শীরাও পুজো করতে লাগলেন। এই রকমে মা মনসার পুজো পৃথিবীতে প্রচার হল।

মনসার কথা সমাপ্ত।

ইতুর কথা

এক দেশে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী থাকতেন। তাঁদের দুটি মেয়ে, উমনো আর ঝুমনো। একদিন ব্রাহ্মণ বললেন, ‘ব্রাহ্মণী, আমাদের একদিন পিঠে করলে হয় না?’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘কোথায় চাল, কোথায় নারিকেল, কোথায় গুড়; পেটে ভাত জোটে না, আবার পিঠে খেতে ইচ্ছে?’ ব্রাহ্মণ ভিক্ষে করে সেই সব এনে দিলেন। ব্রাহ্মণী মেয়ে দুটিকে ঘুম পাড়িয়ে পিঠে গড়তে বসলেন, আর ব্রাহ্মণ একটা দড়ি নিয়ে কানাচে বসে রইলেন। যতবার ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ হয়, ততবার ব্রাহ্মণ একটি করে গেরো বাঁধেন। প্রথম রাত্রে উমনো উঠে বলছে, ‘মাগো মা, কী করছিস মা! জন্মে কখনও দেখিনি, জন্মে কখনও খাইনি, একখানি পিঠে দে মা, খাই।’ তিনি একখানি দিলেন, দিয়ে বললেন, ‘আর চেয়ো না মা, জানতে পারলে তিনি এখনি বনবাস দিয়ে আসবেন।’ সে পিঠেখানি খেয়ে কাঁথায় মুখ মুছে শুয়ে পড়ল। আবার খানিক রাত্রে ঝুমনো উঠে বলছে, ‘মাগো মা, কী করছিস মা! একখানি দে মা, খাই।’ মা তাকেও একখানি দিলেন। সে খেয়ে কাঁথায় মুখ মুছে শুয়ে রইল। রাত পোহাল। সকালে ব্রাহ্মণের মুখ ধোয়া নেই, দাঁতন করা নেই, গায়ত্রী জপা নেই, কাপড় ছাড়া নেই, অখন্ড কলার পাতা কেটে এনে দাওয়ায় পেতে বসলেন। ব্রাহ্মণী পাতাভরে পিঠে দিলেন। ব্রাহ্মণ একখানা করে পিঠে খান, আর একটি করে গেরো খোলেন। ব্রাহ্মণী, চোঁয়া পোড়া যেগুলি নিজের জন্য রেখেছিলেন, সবগুলি এনে দিলেন। তবুও দরিদ্র ব্রাহ্মণের পেট ভরে না। শেষে দুখানি পিঠে কম পড়তে বললেন, ‘ব্রাহ্মণী, রাক্ষসী মেয়ে দুটোকে দিয়ে সব পিঠে খাইয়ে রেখেছো,—আজ তাদের বনে দিয়ে আসব।’

তারপর বেলা হতে মেয়ে দুটি ঘুম থেকে উঠল। ব্রাহ্মণ বললেন, ‘ওমা! তোরা পিসির বাড়ি যাবি?’ উমনো ঝুমনো বললে, ‘যাব।’ ব্রাহ্মণী কেঁদেই অস্থির, কিছু বলতে পারলেন না। একলা থাকলে পেট ভরে খেতে পাবেন, দরিদ্র ব্রাহ্মণের এই প্রধান উদ্দেশ্য। মেয়ে দুটিকে বনে দিয়ে এলে, যেন তাঁর সকল দুঃখ দূর হবে। তিনি উমনো ঝুমনোকে সঙ্গে করে বরাবর বনের দিকে যাচ্ছেন। উমনো বললে, ‘বাবা! পিসির বাড়ি কতদূর, আর যে চলতে পারছি না।’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘এইখানে একটু শুবি?’ তারা বললে, ‘হাঁ বাবা, তোমার কোলে মাথা দিয়ে শোব।’ ব্রাহ্মণ সেইখানে বসলেন; উমনো ঝুমনো বাপের পায়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। ব্রাহ্মণ অমনি সুযোগ পেয়ে মেয়ে দুটির মাথায় দুটি মাটির ঢেলা দিয়ে, আলতার লুটি, শাঁকের ঘুঁটি রেখে চলে গেলেন। উমনো ঝুমনো উঠে দেখে সন্ধ্যা হয়েছে বাপ কাছে নেই। উমনো বললে, ‘বোন রে বোন, বাবাকে বাঘে খেয়ে গেছে।’ ঝুমনো ছোটো হলেও তার বুদ্ধি কিছু বেশি, সে বললে, ‘না দিদি! বাবাকে কখনও বাঘেও খায়নি, ভাল্লুকেও খায়নি। দেখছিস না, এগুলো কি হাড় না রক্ত? সেই যে দিদি, আমাদের মা দুখানি পিঠে দিয়েছিলেন, তাই বাবা আমাদের বনবাস দিয়ে পালিয়ে গেছেন।’ উমনো কেঁদে অস্থির। ঝুমনো বললে, ‘কাঁদলে কি হবে, দিদি? রাত্রি হল, চল, যদি কোথাও আশ্রয় পাই দেখি।’ ভয়ানক বন, তায় রাত্রিকাল—আশ্রয় আর পাবে কোথায়! একটি বটবৃক্ষের কাছে গিয়ে বললে, ‘হে বটবৃক্ষ! মা আমাদের দশমাস দশদিন গর্ভে স্থান দিয়েছেন, তুমি আজ রাত্রের মতো আমাদের দুটি বোনকে স্থান দাও।’ তখন চড়মড় মড়মড় করে গাছের গুঁড়িটি দু-ফাঁক হয়ে গেল। দুটি বোনে তার মধ্যে প্রবেশ করলে। সমস্ত রাত্রি বাঘ আসে, ভাল্লুক আসে, গাছের গোড়ায় আঁচড়ায় কামড়ায়, গা ঘষে, কিন্তু কিছুই করতে পারে না। রাত পোহাল, আবার বটবৃক্ষ দু-ফাঁক হয়ে গেল। উমনো ঝুমনো বেরিয়ে গাছকে নমস্কার করে বরাবর যেতে লাগল।

তারা কতদূর গিয়ে দেখে দেবকন্যারা ইতুপুজো করছেন। উমনো ঝুমনো কাছে যাবামাত্র তাঁদের ঘট উলটে পড়ল। তখন দেবকন্যাগণ ডেকে বললেন, ‘কে রে পাপিষ্ঠি! এখানে এসেছিস? কাছে আয়, নইলে ভস্ম করে ফেলব!’ তখন দুটি বোনে কাঁপতে কাঁপতে তাঁদের কাছে গেল। দেবকন্যারা বললেন, ‘তোরা কারা, এখানে কেন এসেছিস?’ ঝুমনো বললে, ‘আমরা দুখানি পিঠে খেয়েছিলুম বলে, আমাদের বাপ বনে দিয়ে গেছেন।’ দেবকন্যাগণ বললেন, ‘যা, তোরা ওই পুকুরে স্নান করে আয়। আমরা তোদের সব জিনিস দেব—ব্রত কর, তোদের ভাল হবে।’ উমনো ঝুমনো নাইতে গেল, অমনি পুকুরের জল শুকিয়ে গেল। মাছগুলো সব ধড়াস ধড়াস করে আছাড় খেতে লাগল, ধোপার কাপড় কাচা বন্ধ হয়ে গেল। কত লোক নাইতে এসেছে, জল নিতে এসেছে, তারা গালাগালি দিতে লাগল। দুটি বোনে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এল। দেবকন্যারা জানতে পেরে বললেন, ‘এই নে দূর্বার আংটি, নিয়ে পুকুরে ফেলে দিগে যা, জল হবে।’ উমনো তাই করলে, পুকুরে জল হল; দুটি বোনে স্নান করে এসে দাঁড়াল। কেউ দিলেন ইতুর ভাঁড়, কেউ দিলেন কলা-পাটালি, কেউ দিলেন ফুল-চন্দন, তাই দিয়ে তাদের ইতুপূজো করালেন; তারপর বললেন, ‘এইবার তোরা বর মেগে নে।’ বল, ‘আমার বাপের দুঃখ দূর কর, আউরি চৌরি দক্ষিণ দুয়ারি বাড়ি হোক। হাতি শালে হাতি হোক, ঘোড়া শালে ঘোড়া হোক, ধন দৌলৎ হোক, দাস-দাসী হোক, আমাদে রাজার মতন বর হোক।’ উমনো ঝুমনো সেই কথা বলে প্রণাম করলে। তারপর দেবকন্যারা ইতুর প্রসাদ দিয়ে বললেন, ‘যা, তোরা প্রসাদ খেয়ে ঘরে যা।’ দুটি বোনে প্রসাদ খেয়ে ইতুর ঘট নিয়ে ঘরে যেতে লাগল।

পথে যেতে যেতে তারা দেখল একটা ডোবায় কলমিশাক হয়ে আছে। উমনো বললে, ‘চল ভাই, চারটি শাক তুলে নিয়ে যাই, মা কত আহ্লাদ করবেন।’ তারা যেমনি শাকের ক্ষেতে নেমেছে, অমনি একটা সোনার ঘাড়মুড়ো উমনোর পায়ে লেগে গেল। উমনো বললে, ‘বোন রে বোন, যেন একটা মড়ার মাথা পায়ে লাগল।’ ঝুমনো দেখে সেটা চুপি চুপি কলমি শাকের ভেতরে করে নিয়ে চলল। দুটি বোনে বাড়ির কাছে গিয়েছে, অমনি একটা লোক গিয়ে বললে, ‘ও বামনি! দেখ, তোর উমনো ঝুমনো আসছে।’ বামনি তাড়াতাড়ি বাইরে এসে মেয়ে দুটিকে চুমু খেয়ে আদর করে ঘরে নিয়ে গেলেন। ব্রাহ্মণ এসে তাদের দেখে রেগে বললেন, ‘আবার ওই অপয়া মেয়ে দুটোকে ঘরে এনেছিস? ওদের বনে দিয়েই আমার এত সুখ হয়েছে।’ উমনো ঝুমনো বললে, ‘অত অহঙ্কার করো না বাবা! আমরা ইতু পুজো করছি, তাই তোমার সুখ হয়েছে; এখনি মনে করলে সব ছাই করে দিতে পারি।’ ব্রাহ্মণ তাদের কাছে সোনার মাথাটা দেখে বললেন, ‘ও আবার কিরে! আমার হাতে দড়ি দিবি নাকি?’ এই বলে মাথাটা নিয়ে বনে ফেলে দিয়ে এলেন। আবার সেই মাথাটি এসে ঘরে পড়ল। তখন ব্রাহ্মণ দেখে অবাক হলেন, আর কিছুই বললেন না।

ইতুপুজো করে দিন কতক পরে ব্রাহ্মণীর একটি চাঁদের মতন ছেলে হল। উমনো ঝুমনোকে কেউ কিছু বলে না। কিছুদিন পরে এক রাজা পাত্র সঙ্গে করে কতকগুলি সৈন্যসামন্ত, হাতি ঘোড়া নিয়ে শিকার করতে যাচ্ছেন। পথে সকলের তেষ্টা পাওয়ায়, ওই ব্রাহ্মণের বাড়িতে জল চেয়ে পাঠালেন। ঝুমনো ইতুর ভাঁড়ে করে একটু জল দিলে। রাজপুত্র একটুখানি জল দেখে রেগেই অস্থির; বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে কি ঠাট্টা করে পাঠিয়েছে। আমাদের এত লোক, হাতি, ঘোড়া, এতটুকু ভাঁড়ের জলে কী হবে?’ উমনো বলে পাঠালে ওই জলে ঢের হবে। তখন রাজা খেলেন, পাত্র খেলেন, অন্য কত লোক খেলেন—যত ঢালেন ততই জল, হাতি ঘোড়া খেয়ে এলে গেল। রাজা বড়ই আশ্চর্য হলেন। তখন রাজা ব্রাহ্মণকে ডেকে পাঠালেন। ব্রাহ্মণ এসে দাঁড়ালেন। রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার মেয়েটির কি বিয়ে হয়েছে?’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘আমার দুটি মেয়ে, কারুরই বিয়ে হয়নি।’ তখন রাজা বললেন, ‘তবে ওই মেয়ে দুটিকে আমাদের সঙ্গে বিয়ে দিন।’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘রাজা ও পাত্র জামাই হবে, সেতো আমার ভাগ্যের কথা।’ তখন রাজা আর শিকার করতে গেলেন না। রাজবাড়িতে খবর গেল যে, ‘আমরা আজ বিয়ে করে কাল সকালে বউ নিয়ে বাড়ি যাব।’ তখন ব্রাহ্মণ বিয়ের সব আয়োজন করলেন। তারপর সেই দিন রাত্রে খুব ঘটা করে রাজা ও পাত্রের সঙ্গে উমনো ঝুমনোর বিয়ে হয়ে গেল। উমনো ঝুমনো দেখতে খুব সুন্দরী, রাজা ও পাত্র দেখে খুব খুশি হলেন। পরদিন উমনো ঝুমনো শ্বশুরবাড়ি যাবে; বাপ বললেন, ‘তোমাদের কী কী চাই মা বলো?’ বড়োটি বললে, ‘আমার জন্যে মাগুর মাছ আনাও, ছাঁচি পান আনাও, মাছের ঝোল ভাত খেয়ে পান চিবুতে চিবুতে পালকিতে উঠব।’ ছোটো মেয়ে বললে, ‘আজ অঘ্রাণ মাসের রবিবার, কলা, পাটালি, ফল-মূল, যা পাবে নিয়ে এস বাবা। ইতুপুজো করে, নিরামিষ খেয়ে, ঘট নিয়ে পালকিতে উঠব।’ বাপ তাই যোগাড় করে দিলেন।

তারপর দুইদিক দিয়ে দুই বর যেতে লাগল। যে পথ দিয়ে উমনো যায়, সে দিকে মড়া মরে, ছড়া পড়ে, ঘরে আগুন লাগে, যত অলক্ষণ হতে লাগল। যে পথে ঝুমনো যায়, সে পথে বিয়ে হচ্ছে, শাঁক বাজছে, কত আমোদ আহ্লাদ হচ্ছে, চারিদিকে মঙ্গলধ্বনি, লুচির ছড়াছড়ি হচ্ছে। তারপর ওখানে রাজার মা সোনার পিঁড়ি, সোনার ঝারি, সোনার বরণডালা সাজিয়ে, জলছত্র দিয়ে ঘর বার করছেন। পাত্রের মাও সমস্ত আয়োজন করে বসে আছেন। বাজনা বাদ্যি করে বর-কনে এল। রাজার মা বউ বরণ করতে গেলেন, সোনার পিঁড়ি, সোনার ঝারি সব লোহা হয়ে গেল। তিনি বউয়ের গালে ঠোনা মেরে বউ তুললেন। পাত্রের মা বউ বরণ করতে গেলেন, সব জিনিস সোনা হয়ে গেল। অমনি বউয়ের মুখে চুমু খেয়ে, বউ ঘরে তুললেন। তারপর, দিনকতক পরে রাজার আজ হাতিটা মরে, কাল ঘোড়াটা মরে, ক্রমে যত অমঙ্গল হতে লাগল। পাত্রের দিন দিন উন্নতি হতে লাগল। একদিন রাজা পাত্রকে ডেকে বললেন, ‘ভাই, তুমিও বন-কন্যা বিয়ে করলে, আমিও বন-কন্যা বিয়ে করলাম, তোমার ভালো হচ্ছে, আমারই বা মন্দ হচ্ছে কেন? আমি ও রানির মুখ দেখতে চাই না, তুমি তাকে কেটে আমায় রক্ত দেখাও।’ উমনোকে কাটবার হুকুম হয়ে গেল। কোটাল উমনোকে ঝুমনোর বাড়ির দরজায় ছেড়ে দিয়ে একটা কুকুর কেটে রক্ত নিয়ে রাজাকে দেখালে। উমনো বাড়ির ভেতর গিয়ে বোনকে খুঁজতে লাগল। শেষে বাগানে এসে আড়াল থেকে দেখে যে ঝুমনো ফুল তুলে ঘাটে বসে স্বামীর জন্য মালা গাঁথছে। উমনো মনে মনে ভাবতে লাগল, আহা ঝুমনো আমার কত মনের সুখে আছে! স্বামী কত ভালোবাসে! শেষে ডাকলে, ‘ভাই ঝুমনো! আমার বড় বিপদ।’ ঝুমনো তাড়াতাড়ি পেছন ফিরে দেখে বললে, ‘কে—দিদি! এ কি, তুমি কী করে এখানে এলে?’ এই বলে উমনোকে ডেকে এনে কাছে বসিয়ে সব বৃত্তান্ত শুনলে। শেষে দুঃখ করে বললে, ‘দিদি, ইতুর কোপে তোমার এমন হল।’ সেই অবধি উমনো ঝুমনোর কাছে লুকিয়ে রইল, ঝুমনোর স্বামী টেরও পেলেন না।

ওখানে উমনোর বাপ ছেলের বিয়ে দিতে যাবেন, বাজনা বাদ্যি করে বর নিয়ে যাচ্ছেন, পথে গিয়ে ছেলে বললে, ‘বাবা! জাঁতি ভুলে এসেছি।’ ব্রাহ্মণ ছুটে বাড়িতে এসে দেখেন, গিন্নি ঘরে খিল দিয়ে ইতুর কথা শুনছেন। ব্রাহ্মণ কপাটে ধাক্কা মেরে, কপাট ভেঙে ফেললেন। ‘আজ শুভদিন, কী বিড় বিড় করছিস!’ বলে লাথি মেরে ঘট ফেলে দিয়ে জাঁতি নিয়ে চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, লোকলস্কর, বাজনাবাদ্যি কিছুই নেই, কেবল ছেলেটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। ব্রাহ্মণ পাগল হয়ে ছেলেটিকে সঙ্গে করে বাড়িতে ফিরে এলেন। এসে দেখেন যে, সে বাড়ি নেই, হাতি ঘোড়া নেই, কেবল সেই কুঁড়েঘর আর ব্রাহ্মণী। তিনি খুব কান্নাকাটি করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণী বললেন, ‘এখন হয়েছে তো? ইতুর দৌলতে ধনকড়ি, ইতুর দেওয়া ছেলে, ইতু হতেই সব, সেই ইতুকেই লাথি মারলে?’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘যা হবার হয়েছে, তুমি আবার ইতুপুজো করো।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘আবার এক বৎসর যাক, অঘ্রাণ মাস আসুক। এখন তুমি ঝুমনোর বাড়ি যাও, যদি কিছু দেয় তাহলে দশ দিন খেয়ে বাঁচবো।’

ব্রাহ্মণ একদিন সাত ছেঁড়া কাপড় পরে, একখানি ময়লা চিরকুট চাদর নিয়ে মেয়ের বাড়ি চললেন। ঝুমনোর বাড়ির কাছে একটা পুকুরধারে বসে আছেন, ভয়ে বাড়ির ভেতর যেতে পারছেন না। দাসী জল নিতে এসেছে, তাকে বলছেন, ‘তুমি কার জল তুলছো বাছা!’ দাসী বললে, ‘ঝুমনোর জল তুলছি!’ ‘তাকে বলো তোমার বাপ এসেছে।’ দাসীর সে কথা মনে নেই, আবার জল নিতে এসেছে।’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘বলেছ বাছা?’ ‘না গো ভুলে গেছি,’ এই বলে দাসী তাড়াতাড়ি গিয়ে বললে, ‘হাঁ মা ঠাকরুণ! তোমার কি বাপ আছে?’ ঝুমনো বললে, ‘যা, বাড়ির ভেতর নিয়ে আয়।’ ব্রাহ্মণ বাড়ির ভেতর গেলেন। ঝুমনো পা ধুইয়ে, তেল মাখিয়ে, স্নান করিয়ে, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন ভাত করে খাইয়ে ভারে ভারে জিনিসপত্র দিয়ে বাপকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলে। অর্ধপথ যেতে না যেতে সব জিনিসপত্র ইতুর চরেরা ডাকাতি করে নিয়ে সেই ঝুমনোর ভান্ডারে এনে দিলে। ঝুমনো আর কী করবে! ব্রাহ্মণ সব কথা বুঝতে পারলেন, তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে গেলেন। ব্রাহ্মণী বললেন, ‘মেয়েরা কি মরেছে?’ আমাদের এত কষ্ট শুনেও কিছু দিলে না?’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘গালাগালি দিও না গো! বাছা আমায় সব দিয়েছিল,—পথে ডাকাতে সব লুটে নিয়েছে। তা তুমি একবার যাও না,—মেয়ে মানুষ, চুলের ভেতর, কাপড়ের ভেতর করেও যদি কিছু আনতে পারো।’ ব্রাহ্মণীও সেই পুকুরধারে গিয়ে বসে রইলেন। দাসী জল নিতে এল। ব্রাহ্মণী বললেন, ‘তুমি কার জল তুলছো বাছা?’ দাসী বললে, ‘ঝুমনোর জল তুলছি।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘তাকে বল, তোমার মা এসেছে।’ দাসী গিয়ে ওই কথা বলতেই, ঝুমনো খিড়কি দিয়ে গিয়ে মাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। তার পর তেল মাখিয়ে, স্নান করিয়ে, নূতন কাপড় পরিয়ে, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন করে মাকে খাওয়ালে, আর বললে, ‘মা তোমার এখন যাওয়া হবে না। দিনকতক থাকো, অঘ্রাণ মাস এলে ইতুপুজো করবে। ইতুকে অবহেলা করেই তো দিদির ও তোমার এই দুর্দশা হয়েছে।’ ব্রাহ্মণী জামাই বাড়িতেই রইলেন।

আবার অঘ্রাণ মাস এল। ঝুমনো বললে, ‘দিদি! মা! মনে থাকে যেন কাল সংক্রান্তি, ইতুপুজো করতে হবে, যেন সকালে কিছু খেয়ে ফেলো না।’ পর দিন সকালে উঠেই ঝুমনো ডাকলে ‘মা এস, দিদি এস, আমরা স্নান করে আসিগে।’ মা, বোন বললেন, ‘ওমা, আমরা যে খেয়ে ফেলেছি। তোর ছেলেরা খেতে পারেনি, সব এঁটো ছিল, তাই কুড়িয়ে খেয়েছি।’ ঝুমনো মাথায় হাত দিয়ে বললে, ‘হায়রে কপাল! লোকে বলে এরই নাম অদৃষ্ট, একেই বলে দরিদ্র দশা।’ এমনি চারটে রবিবার গেল। সংক্রান্তির আগের দিন ঝুমনো, মা বোনের আঁচলে আঁচলে চুলে চুলে বেঁধে নিয়ে শুয়ে রইল। বেলা না হতে হতেই দুজনকে নিয়ে স্নান করে ঠাকুরঘরে গেল। পূজো হয়ে গেল। তখন বললে ‘মা, দিদি, ইতু লক্ষ্মীর কাছে বর মেগে নাও।’

উমনো তখন জোড়হাতে করে বললে, ‘আমার যেমন সংসার ছিল তেমনি হোক, অস্মরণ রাজার স্মরণ হোক।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘আমার যেমন ঘর, বাড়ি, দাস-দাসী, হাতি-ঘোড়া হয়েছিল আবার তেমনি হোক, আমাদের দুঃখ দূর করো মা।’ অমনি ব্রাহ্মণের ওখানে আবার তেমনি সুখ স্বচ্ছন্দ হল। তিনি রেগেই অস্থির! তাড়াতাড়ি ঝুমনোর বাড়ি এসে ব্রাহ্মণীকে বলতে লাগলেন, ‘জামাই ভাতি! এখানে পড়ে থাকতে লজ্জা করে না? আমার ধন দৌলৎ কে খায় তার ঠিক নেই, চল, বাড়ি চল।’ ঝুমনো বললে, ‘বাবা! ওই অহঙ্কারেই তো সব গিয়েছিল! মা ইতুপুজো করেছেন বলেই আবার সব পেয়েছ।’ তখন ঝুমনো ভারে ভারে জিনিসপত্র দিয়ে পালকি করে মা-বাপকে পাঠিয়ে দিলে। এখানে রাজার আবার সুদিন হয়েছে। রাজা পাত্রকে ডেকে বললেন, ‘আমার রানিকে এনে দেবে তো দাও, নইলে সকলের মাথা নেব।’ ‘কী বিপদ! অসময় হলে রানিকে কেটে রক্ত দেখাও, আবার সুসময় হলেই রানিকে এনে দাও। আপনার এ কি রকম হুকুম, এখন রানিকে কোথায় পাব?’ পাত্র জানেন না যে তাঁর বাড়িতেই রানি আছেন। তিনি ভাবতে ভাবতে এসে ঝুমনোকে সব কথা বললেন। ঝুমনো বললে, ‘তার আর ভাবনা কী? আমি মহারাজের রানিকে এনে দেব। রাজাকে বল আমার বাড়ির দরজা থেকে রাজবাড়ির দরজা পর্যন্ত কলাগাছ পুঁতে, কড়ির জাঙ্গাল দিয়ে তাঁবু ফেলে দিন; তাহলে রানিকে পাবেন।’

পাত্র রাজাকে ওই কথা বললেন, রাজাও তাই করলেন। ঝুমনো তখন দিদিকে সাজিয়ে-গুজিয়ে প্রণাম করে বললে, ‘যাও দিদি, এইবার রাজার সুমতি হয়েছে।’ উমনো তখন সকলের সঙ্গে দেখা করে, ঝুমনোর কাছে বিদায় নিয়ে, তার ছেলেমেয়েদের আশীর্বাদ করে বাড়ি চললেন। পথে যেতে যেতে দুর্বার শেকড় লেগে পায়ে রক্ত পড়ল। তিনি উঁচু হয়ে বসে পড়লেন। রাজা বললেন, ‘এ্যাঁ, এমন ঘাস ছুলেছে যে, শেকড় পুটে মহারানির পায়ে রক্ত পড়ল? যাতো রে, আঠারো হাড়ির মাথা নিয়ে আয়, আর বুড়ো হাড়িনীর চোখ তুলে নিয়ে আয়।’ রাজ-অনুচরেরা তাই করলে। মহারাজ উমনোর হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন।

দিনকতক পরে মহারাজের বাপের শ্রাদ্ধ হল। সেদিন রাজবাড়িতে খুব ঘটা; দীন-দুঃখী কেউ উপবাসী নেই। এমন সময় উমনোর মনে হল, ‘আজ যে আমার ইতুপুজো, এখন কেউ তো উপবাসী নেই, কাকে নিয়ে কথা শুনবো।’ রাজা বললেন, ‘সেই যে হাড়িনীর আঠারো ছেলের মাথা কেটেছি, সে বোধহয় কিছু খায়নি, তবে তাকে নিয়েই কথা শোন।’ তৎক্ষণাৎ বুড়ো হাড়িনীকে আনান হল। হাড়িনী এসেই চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘সর্বনাশি! একবার এসে রাজার সর্বস্ব খেয়েছ, এবার এসে আমার আঠারো বেটার মাথা খেয়েছ, আমার দুটি চোখ খেয়েছ, এখনও কি পেট ভরেনি? এবার বুঝি আমায় খাবে? তা খাও না, আর আমার বাঁচায় সুখ কি?’ উমনো চোখের জল মুছে বললেন, ‘না মা! আমায় ভয় করিসনি, আয় ব্রত করি, আবার তোর সব হবে।’ হাড়িনী কিছু না বলে চুপ করে রইল।

উমনো তাকে স্বহস্তে স্নান করিয়ে, নূতন কাপড় পরিয়ে, কাছে করে নিয়ে ব্রতকথা শোনাতে বসলেন। কথা সাঙ্গ হতে বললেন, ‘বর মেগে নে মা, যেন তোর সব আবার তেমনি হয়।’ হাড়িনী তখন বললে, ‘মা ইতুলক্ষী! আমার আঠারো বেটা ফিরে আসুক, আমার চোখ হোক, আমাদের দুঃখ নিবারণ করো মা!’ দেখতে দেখতে হাড়িনীর দুটি চোখ হল। রানি বললেন, ‘এই এক গামলা ভাত তরকারি নিয়ে যা, তোর ছেলেরা খাবে।’ হাড়িনী আবার চীৎকার করে কেঁদে উঠল। ‘আহা, বাছারা কি আমার আছে মা! তাদের যে মহারাজ কেটে ফেলেছেন।’ উমনো বললেন, ‘দেখগে যা, তোর ছেলেরা বেঁচেছে।’ হাড়িনী তখন কাঁদতে কাঁদতে ভাতের গামলা মাথায় করে বাড়ি গেল। যেতেই ছেলেরা বললে, ‘ওমা, কোথায় গিয়েছিলি মা! আমরা না খেতে পেয়ে মরে গেলুম, দে বলছি খাবার দে।’ এই রকম করে আঠারো ছেলে হাড়িনীর কাছে এল। হাড়িনী বললে, ‘চুপ কর বাবা! এই নে ভাত খা, তোরা কি ছিলি বাছা! রাজা যে তোদের মাথা নিয়েছিলেন। রানি মা কি ব্রত জানেন, সেই ব্রত করে তবে তোদের বাঁচিয়েছেন।’

রাত না পোহাতেই হাড়িনী আহ্লাদে আটখানা হয়ে রাজবাড়ি পরিষ্কার করতে লাগল। রাজা উঠে হাড়িনীর হাত ধরে বললেন, ‘ছি রানি, তুমি কেন এসব কাজ করছ? তোমার জন্যে আঠারো হাড়ি গিয়েছে, আমি আঠারো হাজার হাড়ি আনিয়ে দেব।’ হাড়িনী লজ্জায় জড়সড় হয়ে বললে, ‘মহারাজ, আমায় ছুঁলেন কেন? আমি যে হাড়িনী।’ রাজা বললেন, ‘এ্যাঁ, তুমি হাড়িনী? তুমি কী করে এত সুন্দরী হলে? আর তোমার চোখ হল কী করে?’ হাড়িনী তখন উমনোর ব্রতের কথা বলতে লাগল। ‘মহারাজ, আমার আঠারো বেটা বেঁচেছে, আর আমাদের কোনও দুঃখ নেই। মা ইতুলক্ষ্মী আমাদের অনেক ধনদৌলৎ দিয়েছেন।’

রাজা তখন উমনোকে গিয়ে বললেন, ‘তুমি যদি এমন ব্রত জানো রানি, তবে আমরা মর্ত্যে থাকি কেন? চল স্বর্গে যাই।’ তখন রাজা ছেলে মেয়ের বিয়ে দিলেন, পাত্রও ছেলে মেয়ের বিয়ে দিলেন, ব্রাহ্মণ ছেলের বিয়ে দিলেন, হাড়িনী আঠারো ছেলের বিয়ে দিয়ে বউ আনলে। সকলেই ছেলেদের সংসার বুঝিয়ে দিয়ে, ঝি বউদের ইতুর ব্রত করতে বললেন। তারপর উমনো, ঝুমনো, রাজা, পাত্র, ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণী এবং সেই হাড়িনী একত্র হয়ে ইতুপুজো করলেন। ইতুলক্ষ্মী দেখা দিয়ে বললেন, ‘তোমরা কী বর চাও?’ সকলেই বললেন, ‘মা! আমাদের সংসারে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য সবই হয়েছে, আর এখানে থাকব না। আমাদের স্বর্গে নিয়ে চল।’ তখন চুয়া চন্দনের ছড়া পড়তে লাগল; আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হল, স্বর্গ থেকে রথ এল। সকলে, ছেলে মেয়েদের বুঝিয়ে রেখে, আশীর্বাদ করে, ইতুর রথে চড়ে স্বর্গে গেলেন।

কাটি মুটি কুড়াতে গেলাম,
ইতুর কথা শুনে এলাম।
এ শুনলে কী হয়?
নির্ধনের ধন হয়,
অপুত্রের পুত্র হয়,
আইবুড়োর বিয়ে হয়,
অস্মরণের স্মরণ হয়,
অন্ধের চক্ষু হয়,
অন্তকালে স্বর্গে যায়।

অঘ্রাণ মাসের ইতুর কথা সমাপ্ত।

রালদুর্গার ব্রতকথা

চিত্রকূট পাহাড়ে বসে লক্ষ্মী-নারায়ণ পাশা খেলছিলেন। সেইখানে একজন বুড়ো ব্রাহ্মণ ফুল তুলতে আসতেই নারায়ণ তাঁকে ডেকে বললেন, ‘ওহে, তুমি পাশা খেলতে জানো?’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘জানি।’ তখন নারায়ণ বললেন, ‘আমায় যদি হারাও, তোমায় কুটে আতুর করে দেব।’ লক্ষ্মী বললেন, ‘আমায় যদি হারাও, তবে তোমায় ভস্ম করব।’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘আমি ভস্ম হতে পারব না, বরং কুটে হব সেও ভালো।’ এই বলে লক্ষ্মীকে খেলা বলে দিতে লাগলেন। নারায়ণের হার হল। তিনি বুড়ো ব্রাহ্মণকে শাপ দেবামাত্র ব্রাহ্মণ কুটে আতুর হয়ে গেলেন। ব্রাহ্মণ হাতজোড় করে কাঁদতে লাগলেন। বললেন, ‘প্রভু দয়াময়, আপনি নিজে না হারলে আপনাকে কে হারাতে পারে? হরি! কেন আমাকে নিমিত্তের ভাগী করলেন? এখন কীসে আমি এই ঘোর যাতনা হতে মুক্ত হব?’ নারায়ণ বললেন, ‘যাও, এই পাহাড়ের নীচে রাজপথে গিয়ে শুয়ে থাকো। রাজার মেয়ে ইচ্ছামতী সূর্যের ব্রতদাসী, সেই রাজকন্যা যদি তোমার গলায় মালা দেয়, তা হলে তোমার দুঃখ দূর হবে।’

তখন বুড়ো ব্রাহ্মণ নারায়ণকে প্রণাম করে গড়াতে গড়াতে রাজপথে পড়ে গেলেন। তিনি রাজপথ জোড়া করে পড়ে থাকেন, কত লোক ডিঙিয়ে যায়, মাড়িয়ে যায়। একদিন রাজকন্যা ইচ্ছামতী শিবপুজো করতে যাচ্ছেন, হাতে পঞ্চপাত্র, ফুলের সাজি। ব্রাহ্মণকে বললেন, ‘ঠাকুর, একটু সরে যাও।’ ব্রাহ্মণ কোনও উত্তর দিলেন না। রাজকন্যা আবার বললেন, ‘ঠাকুর! পথ ছেড়ে দাও।’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘ওই যে সকলে ডিঙিয়ে যাচ্ছে, তুমিও যাও না, আমার নড়বার শক্তি নেই।’ রাজকন্যা বললেন, ‘ওরা অজ্ঞান, তাই তোমায় ডিঙিয়ে যাচ্ছে, আমি ব্রাহ্মণকে ডিঙিয়ে যেতে পারব না। দয়া করে আমায় একটু পাশ দাও, আমি চলে যাই।’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘তবে আমার কাছে একটি সত্য করো যে, ‘আমায় বিয়ে করবে,’ তাহলে তোমায় পথ ছেড়ে দেব।’ রাজকন্যা তিন সত্য করে বললেন, ‘আমি তোমার গলায় মালা দেব।’ ব্রাহ্মণ অতিকষ্টে একটু পথ দিলেন। রাজকন্যা শিবপুজো করে বাড়ি গেলেন।

ইচ্ছামতী সেদিন আর কিছুই খেলেন না, নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে রইলেন। রাজকন্যার সখীরা অনেক সাধ্যসাধনা করাতে তিনি বললেন, ‘দেখো, আমার চোদ্দ-পনেরো বছর বয়েস হল, এখনও আমার বিয়ে হল না। আমায় যে দেখে সেই নিন্দে করে, আমি লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারি না। তোমরা আমার বাবাকে বলো যেন শিগগির আমার স্বয়ম্বরের আয়োজন করেন।’ রাজা এই কথা শুনে তৎক্ষণাৎ রাজ্যে রাজ্যে লোক পাঠালেন। কত রাজা, কত রাজপুত্র উপস্থিত হলেন। স্বয়ম্বরের দিন ধার্য হল। সেইদিন বুড়ো ব্রাহ্মণ অতি কষ্টে রাজসভার একটি পাশে গিয়ে পড়ে রইলেন। রাজকন্যা যখন মালাচন্দন নিয়ে রাজসভায় এসে দাঁড়ালেন, তখন রাজারা সব চিৎকার করে বলতে লাগলেন, দেখো, আমি রূপে বড়ো, কেউ বললেন আমি গুণে বড়ো, কেউ বললেন, আমি ধনে বড়ো, কেউ বললেন আমি মানে বড়ো। রাজকন্যা কারো পানে না চেয়ে একেবারে সেই বুড়ো ব্রাহ্মণের গলায় মালা দিয়ে হাত ধরে তুলে নিলেন। তখন যত রাজা হো হো করে হাততালি দিয়ে উঠে বললেন, ‘ছি: ছি:, রাজার মেয়ের এমন নীচ প্রবৃত্তি?’ এই বলে সভা ভঙ্গ করে যে যার দেশে চলে গেলেন। রাজা অপমানিত হয়ে মেয়ে-জামাইকে বনবাসে পাঠালেন।

ইচ্ছামতী বনে গিয়ে অতিকষ্টে দিন কাটাতে লাগলেন। প্রাণপণে কুটের সেবা করেন আর দিনান্তে যেমন জোটে তেমনি খান। একদিন মা লক্ষ্মী একটি অশোকপাতায় রালদুর্গার পুজো প্রণালীটি লিখে বুড়ো ব্রাহ্মণের গায়ে ফেলে দিলেন। ইচ্ছামতী কাঁদছেন আর বলছেন:

কুটে নাড়ি, কুটে চাড়ি, বারো বৎসর কুটের সেবা করি।
তবু না কুটে ভালো করতে পারি।।

আমি রাজার মেয়ে, কোথায় রাজার বউ হব, সোনার খাটে শোব, রুপোর খাটে পা দেবো, তা না হয়ে কুটে ব্রাহ্মণকে বিয়ে করে আজ আমার এই দুর্দশা! আর এত সেবা করছি তবু তো কুটে ভালো করতে পারলুম না, ভগবানের কী বিচার!’ বুড়ো ব্রাহ্মণ বলছেন, ‘ও ইচ্ছামতী, দেখতো আমার গায়ে কী একটা পড়ল।’ ইচ্ছামতী গিয়ে দেখেন একটা পাতা। সেটি নেড়েচেড়ে দেখলেন যে, তাতে রালদুর্গার ব্রত-মাহাত্ম্য লেখা আছে। ইচ্ছামতী সেটি পড়ে খুশি হলেন। তখন অঘ্রাণ মাস, অমাবস্যা এল। ইচ্ছামতী সতেরো ধান, সতেরো দুর্বা দিয়ে, কলা গাছের মাজ পাতার অর্ঘ করে, সিন্দুর, চন্দন, ওড় ফুল, জোড়া কলা, রক্তচন্দন, জবার মালা দিয়ে তাবার টাটে রাখলেন। প্রতিদিন তাতে জল দেন, ফুল দেন, এমনি করে একপক্ষ গেল। পূর্ণিমার দিন ষোড়শোপচারে রালদুর্গার পুজা করে সতেরো মুঠো চালের ওলি সুলি খেলেন। এমনি করে আবার পৌষ মাসের পূর্ণিমায় ঘট স্থাপনা করে রালদুর্গার পূজো করলেন। তাবার টাটে সূর্যের পুজো করে সতেরো মুঠো চালের পায়েস করে খেলেন। মাঘ মাসে পুজো করে সতেরো মুঠা চালের দই ভাত খেলেন।

ফাল্গুন মাসে পুজো করে সতেরো মুঠো চালের পুলি পিঠে করে খেলেন। ওড় ফুল, জোড়া কলা, রক্তচন্দন, জবার মালা, তাবার টাটে সূর্যকে অর্ঘ দিয়ে পাত্র নিয়ে জলে ভাসালেন। সূর্যদেব সাক্ষাৎ হয়ে বললেন, ‘ইচ্ছামতী! কী বর চাও?’ ইচ্ছামতী বললেন, ‘আমার কুটে স্বামীর কন্দর্পের মতো চেহারা হোক।’ দেখতে দেখতে কুটে ব্রাহ্মণের কাঞ্চন মূর্তি হল। আবার কিছুদিন পরে ইচ্ছামতী টাকার জন্যে দুঃখ করতে লাগলেন। তখন আবার দৈববাণী হল:

যে ব্রত করে তোমার সুন্দর হয়েছে পতি।
সেই ব্রত করো তোমার ঘুচিবে দুর্গতি।।

তখন আবার অঘ্রাণ মাস হতে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত ওই রকম রালদূর্গার ব্রত করলেন। তাবার টাটে সূর্যকে অর্ঘ দিয়ে পাত্র নিয়ে জলে ভাসালেন। সূর্যদেব সাক্ষাৎ হয়ে বললেন, ‘কী ইচ্ছামতী! আবার কী বর চাও?’ ইচ্ছামতী বললেন, ‘আমার হাতিশালে হাতি হোক, ঘোড়াশালে ঘোড়া হোক, ঔরি চৌরি, দক্ষিণ দুয়ারি বাড়ি হোক, দাস-দাসী হোক, সোনা-দানা হোক, ধন-দৌলৎ হোক।’ সূর্যদেবের কৃপায় তখনি সেই সব হল। তারপর ইচ্ছামতী একদিন বললেন, ‘দেখো, আমার এত ঐশ্বর্য হল, কিন্তু একটি ছেলে হল না।’ তখন ব্রাহ্মণ বললেন:

যে ব্রত করে তোমার সুন্দর হয়েছে পতি,
যে ব্রত করে তোমার ঘুচেছে দুর্গতি,
সেই ব্রত করো তুমি হবে পুত্রবতী।

আবার অঘ্রাণ মাস। অমাবস্যা এল, ইচ্ছামতী নিয়মিত চার মাস ব্রত করলেন; তাবার টাটে সূর্যকে অর্ঘ দিয়ে পাত্র নিয়ে জলে ভাসালেন। সূর্যদেব সাক্ষাৎ হয়ে বললেন, ‘বলো ইচ্ছামতী! কী বর চাই?’ ইচ্ছামতী বললেন, ‘আমরা অপুত্রক আছি, আমাদের একটি পুত্রসন্তান হোক।’ ‘তথাস্তু’ বলে সূর্যদেব অন্তর্ধান হলেন। তারপর দশ মাস দশ দিনে ইচ্ছামতীর একটি চাঁদের মতো ছেলে হল। ইচ্ছামতীর আর কোনও কষ্ট নেই। ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লাভ হল, সোনার সংসারে সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটতে লাগল।

একদিন রাজার মনে হল, ইচ্ছামতীকে যে বনবাস দিয়েছি—সে কি অবস্থায় আছে দেখি। এই মনে করে তিনি বললেন, ‘কোটাল সেই বনে ইচ্ছামতীর সন্ধান লও।’ কোটাল সেখানে গিয়ে কোনো সন্ধান না পেয়ে ফিরে এসে বললেন, ‘মহারাজ! সে বনে ইচ্ছামতী নেই, আর কুটে ব্রাহ্মণও নেই। কোনো রাজা সেখানে রাজ্য স্থাপনা করেছেন।’ সে কথা শুনে রাজার মুখ শুকিয়ে গেল, কাঁদতে লাগলেন। রাজা বললেন, ‘চল কোটাল, আমায় সেইখানে নিয়ে চল।’ কোটাল রাজাকে সঙ্গে করে নিয়ে সেই বনে গেলেন। রাজা যাকে দেখতে পান তাকেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘হাঁ বাপু! এ নগর কার?’ সকলেই বলে ‘এ এক বুড়ো ব্রাহ্মণের।’ দেবালয় কার? বুড়ো ব্রাহ্মণের। নহবতখানা কার? বুড়ো ব্রাহ্মণের। এ বাগান কার? বুড়ো ব্রাহ্মণের। এ দিঘি কার? বুড়ো ব্রাহ্মণের। শুনতে শুনতে রাজবাড়ির কাছে গেলেন, দ্বারবানকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ বাড়ি কার?’ তারা বললেন, ‘বুড়ো ব্রাহ্মণের।’ রাজা বললেন, ‘বুড়ো ব্রাহ্মণ কে বাপু?’ দ্বারবান বললে, ‘আপনি কোথা থেকে এলেন মহাশয়? বুড়ো ব্রাহ্মণ কে জানেন না? এক রাজার মেয়ে ইচ্ছামতী সত্যপালনের জন্য কুটে ব্রাহ্মণের গলায় মালা দিয়েছিলেন। সেই অপরাধে আহাম্মক রাজা মেয়ে-জামাইকে বনবাস দিয়েছিল। সেই পতিব্রতা সতী ইচ্ছামতী আতুর স্বামীর সেবা করে পুণ্যের জোরে তাঁর এখন এই সকল সুখসম্পত্তি হয়েছে।’ এমন সময়ে ইচ্ছামতী এসে বললেন, ‘ওরে তোরা কার সঙ্গে কথা কচ্ছিস? ওঁদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে আয়।’

তখন রাজাকে আর কোটালকে সঙ্গে করে দ্বারবান বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। ইচ্ছামতী রাজাকে প্রণাম করে নিজে হাত-পা ধোবার জল এনে দিলেন। রাজা বললেন, ‘মা ইচ্ছামতী, তোমার সুখ দেখে আমি অবশ্যই সুখী হয়েছি, কিন্তু আমি তোমার জলে পা ধোব না।’ ইচ্ছামতী বললেন, ‘কেন বাবা! আমি কী অপরাধ করেছি? আপনার যে সন্দেহ হচ্ছে তা আমি বুঝতে পেরেছি। ওই দেখুন আপনার সেই কুটে জামাই। আমি রালদুর্গার ব্রত করে সূর্যদেবের কৃপায় আমার এই সব হয়েছে।’ জামাই এসে তখন শ্বশুরকে প্রণাম করলেন। রাজা জামাইয়ের সঙ্গে কোলাকুলি করে নাতিকে কোলে করে নিলেন। তারপর নানা কথার পর স্নানাহার করে বললেন, ‘মা ইচ্ছামতী, তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। তোমার মা তোমার জন্য বড়োই ব্যাকুল হয়েছেন।’ এই বলে তিনি মেয়ে, জামাই, নাতি নিয়ে ধুমধাম করে বাড়িতে গেলেন। মেয়ে, জামাই ও নাতিকে দেখে রানির আর আহ্লাদের সীমা নেই। মেয়েকে বললেন, ‘মা! তুমি যদি এমন ব্রত জানো, তবে তোমার একটি ভাই হোক না।’

তখন ইচ্ছামতী মাকে রালদুর্গার ব্রত করালেন, তারপর তাঁর মায়ের একটি ছেলে হল। ইচ্ছামতী কিছুদিন থেকে নিজের বাড়ি চলে গেলেন। এখানে কতকদিন থাকেন, ওখানে কতকদিন থাকেন। ইচ্ছামতীর আর আদর ধরে না। ছেলেটি বড়ো হল, ভাইটিও বড়ো হল। তারপর তাদের বিয়ে দিয়ে ঘরকন্না বুঝিয়ে দিয়ে, রালদুর্গার ব্রত করালেন। উঠোনে আলপনা দিয়ে ঘট স্থাপনা করে রালদুর্গার পূজো করলেন, সূর্যের অর্ঘ দিলেন, লক্ষ্মী-নারায়ণকে স্মরণ করে পাত্র নিয়ে জলে ভাসালেন। লক্ষ্মী-নারায়ণ সাক্ষাৎ হয়ে বললেন, ‘তোমরা কী চাও?’ ইচ্ছামতী বললেন, ‘প্রভু, আপনাদের কৃপায় মর্ত্যের ভোগবাসনা সব পূর্ণ হয়েছে, এখন স্বর্গে যেতে বাসনা করি।’ তখন স্বর্গ থেকে রথ এল, চুয়া চন্দনের ছড়া পড়তে লাগল; রাজা, রানি, ইচ্ছামতী, বুড়ো ব্রাহ্মণ চারিজনে লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল রূপ দেখতে দেখতে সশরীরের স্বর্গে চলে গেলেন। তখন ইচ্ছামতীর ছেলে ও ভাই দুজনে রালদুর্গার ব্রত রাজ্য মধ্যে প্রচার করলেন। সেই অবধি চতুর্দিকে রালদুর্গার পুজো হতে লাগল।

রালদুর্গা বা পূর্ণিমার ব্রতকথা সমাপ্ত।

মৌনী অমাবস্যার ব্রতকথা

এক গ্রামে এক বিধবা ব্রাহ্মণী আর এক গোয়ালিনী বাস করত। তাদের দুজনের খুব ভাব থাকায় সই পাতিয়েছিল। গোয়ালিনী ধন, ঐশ্বর্য, স্বামী পুত্র নিয়ে খুব সুখে ছিল। ব্রাহ্মণীর কেবল একটি মেয়ে। স্বামী, পুত্র, ধন, ঐশ্বর্য কিছুই ছিল না। একদিন একজন অতিথি এসে ভিক্ষা চাইলে, ব্রাহ্মণীর মেয়েটি ভিক্ষা দিতে গেল। ভিক্ষা দেবামাত্র অতিথি বললে, ‘আহা এমন কন্যার অদৃষ্টে বৈধব্য-যন্ত্রণা!’ এই কথা বলে অতিথি চলে গেল। মেয়েটি তার মায়ের কাছে এসে বললে, ‘মা! অতিথি কী বলে গেল আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।’ তার মা এই কথা শুনে বড়োই চিন্তিত হলেন, আর বললেন, ‘আবার যদি সে অতিথি কখনও আসে তো আমায় বলিস।’ কিছুদিন পরে আবার সেই অতিথি এসে ভিক্ষা চাইলে। ব্রাহ্মণী একটু আড়ালে থেকে মেয়েটির হাতে ভিক্ষে দিয়ে অতিথির কাছে পাঠালেন। মেয়েটি ভিক্ষা দেবামাত্র অতিথি বললে, ‘আহা এমন মেয়েটির কপালে বৈধব্য-যন্ত্রণা!’ এই কথা শুনে ব্রাহ্মণী অতিথির পায়ে পড়ে বললেন, ‘প্রভু! আমার কন্যার দুঃখ যাতে না হয়, তার উপায় আপনি করুন।’

এই কথা শুনে অতিথি বললে, ‘যদি কেউ মৌনী অমাবস্যার সাতটি ব্রত করে থাকে, সে যদি সেই ফল তোমার মেয়েকে বিয়ের রাতে উৎসর্গ করে দেয়, তাহলে তোমার জামাই আবার জীবন পাবে। কিন্তু যে ওই ব্রতের ফল উৎসর্গ করে দেবে, তার বড়ো অমঙ্গল হবে।’ এই কথা শুনে ব্রাহ্মণী আবার অতিথিকে বললেন, ‘তার দুঃখ দূর হবার কি কোনো উপায় নেই প্রভু?’ তখন অতিথি বললে, ‘নিকটে এই বনের ভেতরে একজন কুটে রোগী বসে আছে, তার মাথায় এক ভাঁড় দই ঢেলে দিয়ে, আবার জিব দিয়ে চেটে সেই দইয়ের ভাঁড় পূর্ণ করলে তার আবার ধন, ঐশ্বর্য, স্বামী, পুত্র লাভ হবে।’

এই কথা শুনে ব্রাহ্মণী মনে মনে ভাবলেন, আমার গোয়ালিনী সই সাতটি ব্রত করেছে; তাকে সন্তুষ্ট করতে পারলে তবে আমার মেয়ের মঙ্গল হবে। এই ভেবে রোজ ভোরের বেলায় সইয়ের বাড়িতে গিয়ে তাদের ঘর-দোর সব পরিষ্কার করে আসে। গোয়ালিনী ভাবে রোজ আমার ঘরদোর কে পরিষ্কার করে যায়, আজ আমাকে লুকিয়ে দেখতে হবে। ব্রাহ্মণী যেমন ভোরের বেলায় ঘর-দোর সব সেই রকম করে পরিষ্কার করছে, এমন সময় গোয়ালিনী ব্রাহ্মণীকে ধরে বললে, ‘এ কি সই! তুমি এ রকম করছ কেন? তুমি ব্রাহ্মণের মেয়ে, আমি হলুম গোয়ালার মেয়ে, আমার যে ছেলেপুলের অকল্যাণ হবে।’ এই কথা শুনে ব্রাহ্মণী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার একটি বিপদ থেকে তোমায় রক্ষা করতে হবে। তোমার মনস্তুষ্টির জন্যে আমি রোজ এই রকম করি, আর চিরকাল তোমার হুকুমে চলব। আমার মেয়ে বিবাহের রাত্রে বিধবা হবে, তুমি যদি অনুগ্রহ করে মৌনী অমাবস্যার ব্রতফল সাতটি আমার কন্যাকে দান করো, তবে আমার জামাই আবার বেঁচে উঠবে।’ গোয়ালিনী শুনে বললে, ‘সেকী সই! কেন দেব না! তোমার মেয়ে আর আমার মেয়ে কি তফাৎ?’ গোয়ালিনী রাজি হল।

কিছুদিন পরে ব্রাহ্মণী মেয়ের বিয়ে দিলেন, বিয়ের রাতে জামাই-এর হঠাৎ মৃত্যু হল। ওই সময়ে গোয়ালিনী তাকে সাতটি ব্রত উৎসর্গ করে দিলে। ব্রাহ্মণীর জামাই তখন আবার বেঁচে উঠল, কিন্তু গোয়ালিনীর বড়ো অমঙ্গল হল। ধন, ঐশ্বর্য সব গেল, স্বামী পুত্রের মৃত্যু হল। তখন ব্রাহ্মণী গিয়ে গোয়ালিনীকে বললেন, ‘সই, তুমি, কেঁদো না, এক ভাঁড় দই নিয়ে আমার সঙ্গে এসো; বনের ভেতরে যেখানে ওই কুটে অতিথি আছে, সেখানে চল।’ ব্রাহ্মণীর কথায় গোয়ালিনী কাঁদতে কাঁদতে সেইখানে গেল। তখন ব্রাহ্মণী বললেন, ‘এর মাথায় দই ঢেলে দিয়ে চেটে আবার দইয়ের ভাঁড় পূর্ণ করো।’ এই কথা শুনে গোয়ালিনী কিছুমাত্র ঘৃণা না করে, সেইরকম করে দইয়ের ভাঁড় পূর্ণ করলে। অমনি সেই কূটের শরীর ভালো হল। তখন কুটে ব্রাহ্মণ বললেন, ‘আমি তোমাদের একাগ্রতা আর বারব্রতে ও ধর্মে বিশ্বাস আছে কি না দেখবার জন্যে এরকম ছলনা করে বসে আছি। তোমার মৌনী অমাবস্যার ব্রতফলে তোমার স্বামী, পুত্র বেঁচে উঠেছে, তোমার ধন-ঐশ্বর্য যেমন ছিল তেমনি হয়েছে। আমিই সেই ব্রতের ফলদাতা নারায়ণ।’ তখন ব্রাহ্মণী ও গোয়ালিনী তাঁর পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল, অমনি তিনি শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধরে চতুর্ভুজ মূর্তিতে তাদের দুজনকে দেখা দিয়ে বললেন, ‘ধর্মে মতি রেখো, দিনান্তেও একবার আমাকে ডেকো।’ এই বলে তিনি অন্তর্হিত হলেন। তার পর দুই সইয়ে বাড়ি এসে দেখলেন গোয়ালিনীর সব ঠিক হয়েছে। তখন তাঁরা মৌনী অমাবস্যার মাহাত্ম্য প্রচার করলেন। তাঁরা কিছুদিন সুখে স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে, ছেলেমেয়েদের বারব্রত করবার উপদেশ দিয়ে, সংসার বুঝিয়ে দুজনে স্বর্গে গেলেন।

মৌনী অমাবস্যার ব্রতকথা সমাপ্ত।

জিতাষ্টমীর ব্রতকথা

শালিবান নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি বড়ো নিষ্ঠাবান ও ধার্মিক ছিলেন। কিন্তু তাঁর ছেলে কি মেয়ে কিছুই ছিল না। বিপুল ধন-ঐশ্বর্য থাকলেও রাজা-রানির মনে সুখ ছিল না। প্রতিমাসেই পুত্র কামনায় একটি করে যজ্ঞ করতেন, কবচ, মাদুলি, যে যা বলত তাই ধারণ করতেন। তবুও রাজার সন্তান হল না। রাজা-রানির মনঃকষ্টের সীমা নেই। একদিন রানি স্বপ্ন দেখলেন, হংস-বাহনে এক দেবতা এসে বলছেন, ‘তুমি জিতাষ্টমীর ব্রত করো, তোমার ছেলে হবে।’

রানি ঘুম ভেঙে রাজার কাছে সব কথা খুলে বললেন। রাজা আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ অষ্টমীর দিন উঠানে একটি ক্ষুদ্র পুকুর কাটালেন। পুকুরের মাঝখানে কলাগাছ আর বেলগাছ পুঁতে মটর ও ফলের নৈবেদ্য করলেন। রাজা-রানি উপবাসী থেকে সন্ধ্যার সময় জীমুতবাহনের পুজো করে, সেই প্রসাদ সকলকে বিতরণ করলেন। পরদিন প্রভাতে উঠে স্নান করে রাজা-রানি সেই পুকুরের ধারে গিয়ে পুজো করে পুত্র-বর চেয়ে নিলেন। কিছুদিন পরে শালিবানের একটি পুত্র আর একটি কন্যা হল। রাজা পুত্রের নাম রাখলেন জীমূতবাহন ও কন্যাটির নাম রাখলেন সুশীলা। জীমূতবাহন বড়ো হল, অন্য রাজার মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হল।

বউটি বড়ো হলে, তার যত ছেলে হয়, সব মরে যায়। শাশুড়ি উঠানে পুকুর কেটে জিতাষ্টমীর ব্রত করতেন, বউটি তাই দেখে উপহাস করত। বলত, মায়ের এখনও ছেলেখেলা গেল না। সেই পাপেই বউটির মৃতবৎসা দোষ হয়েছিল। শাশুড়ি বললেন, ‘বউমা! আজ আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ অষ্টমী, এসো আমরা শাশুড়ি-বউয়ে পুকুর কেটে ছেলেখেলা করি।’ বউ হেসে গড়াগড়ি দিয়ে বললে, ‘তা খেলা বরং করব; কিন্তু তোমার মতন শুকিয়ে থাকতে পারব না বাছা!’ শাশুড়ি বললেন, ‘তা হবে না; তোমায় আজ উপবাস করতেই হবে। তবে বলি শোনো, আমার অনেক বয়স পর্যন্ত ছেলে হয়নি, কত যাগ-যজ্ঞ, ব্রত করেছি, কিছুতেই আমার ছেলে হয়নি। তারপর এই ছেলেখেলা করে তবে আমি সোনার চাঁদ ছেলে পেয়েছি। তুমিও আমার সঙ্গে আজ উপবাস করে জিতাষ্টমীর ব্রত করো। তোমার সন্তান হয়ে রক্ষা পাবে, আর কখনও তোমাকে পুত্রশোক পেতে হবে না।’

তখন বউ উপবাস করে, শাশুড়ির সঙ্গে জিতাষ্টমীর ব্রত করলেন। বউয়ের ছেলে-মেয়ে হয়ে বেঁচে রইল, জীমূতবাহন খুব ধুমধাম করে প্রজাদের কাছে জিতাষ্টমীর ব্রতমাহাত্ম্য প্রচার করলেন।

জিতাষ্টমীর ব্রতকথা সমাপ্ত।

বারমেসে অমাবস্যার কথা

এক গরিব ব্রাহ্মণের একটি ছেলে। ছেলেটি ষোলো বছরের হতেই ব্রাহ্মণ তার বিয়ে দিলেন। তারপর ছেলেটি একদিন কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে চলে গেল। তার বাপ, মা ও বউ সব কেঁদে-কেটে পাড়া মাথায় করলে। কিছুদিন পরে ব্রাহ্মণেরও মৃত্যু হল। ব্রাহ্মণী বউটিকে নিয়ে দুঃখ-কষ্টে কাল কাটাতে লাগলেন। একদিন একজন অতিথি এসে বললেন, ‘মাগো, আমায় চারটি ভাত দিবি মা।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘আমার এমন কি কপাল বাবা। যে, অতিথির সেবা করব? শাক-ভাত আমার যা আছে চারটি খেয়ে যাও।’ বউ তেল এনে দিলেন, অতিথি তেল মেখে স্নান করে এলেন।

তারপর অতিথি বললেন, ‘মা! তোমার ছেলের কাপড়খানি আমায় দাও না, আমি পরি; আর তোমার ছেলের খড়ম দুখানিও দাও।’ ব্রাহ্মণী কাঁদতে কাঁদতে খড়ম এনে দিয়ে বললেন, ‘এই বাবা বুকে করে রেখেছি, তুমিই পরো।’ ভাত দিতে গেলে অতিথি বললেন, ‘আমায় তোমার ছেলের থালে ভাত দাও, আর সেই গেলাসে জল দাও, তা না হলে আমি ভাত খাব না।’ বউ তখন রাগ করে বলতে লাগলেন, ‘অতিথির এত আবদার কেন? না খাবে নাই খাবে, চলে যাক।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘দাও বউমা, থালা গেলাস বার করে দাও মা! ও থালায় আর কে খাবে? তবু অতিথির সেবা হলেও সার্থক হবে।’ বউ রাগে গরগর করতে করতে থালা গেলাস বার করে দিলেন। অতিথি ভাত খেয়ে ঘরে বিছানায় শুয়ে বললেন, ‘মা! তোমার বউকে পাঠিয়ে দাও, আমার একটু পা টিপে দেবে।’ বউ রাগ করতে লাগলেন। শাশুড়ি বললেন, ‘যাও মা, অতিথির সেবা করলে পরকালে ভালো হবে।’ বউ যেমন ঘরের ভেতর গেলেন, অমনি আপনি কপাট বন্ধ হয়ে গেল। গিন্নি দরজা ঠেলাঠেলি করতে লাগলেন, বউ অনেক চেষ্টা করলেন, কিছুতেই খোলা গেল না। বউকে দুঃখিত দেখে অতিথি বললেন, ‘তুমি কি আমায় চিন্তে পাচ্ছ না? আমি যে তোমার স্বামী!’ ব্রাহ্মণের ছেলেটির নাম ছিল সূর্য। বউ তখন পদসেবা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে বউকে সান্ত্বনা করে অতিথি চলে গেলেন। বউ বাহিরে এসে সব কথা শাশুড়িকে বললেন; আরও বললেন, ‘মা, তিনি মধ্যে মধ্যে আসবেন।’

ব্রাহ্মণী তখন কর্তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। পাড়ার লোক সব জড় হল, ঘটনা জানতে পেরে কেউ বা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল, কেউ কেউ বা বিশ্বাস করে বলতে লাগল, ‘আহা! সে যেখানে থাক বেঁচে থাক। আবার আসবে, কাঁদিসনি।’ এই বলে সবাই বাড়ি চলে গেল। তারপর শাশুড়ি-বউয়ে ভাত খেয়ে ওই সকল কথাই কইতে লাগলেন। দিন-রাত সেই সূর্যের কথা। আবার এক দিন সূর্য এসেছেন। যাবার সময় যখন চলে যান, তখন ব্রাহ্মণী চুপি চুপি পেছনে পেছন যেতে লাগলেন।

সূর্য পিছন ফিরে দেখে বললেন, ‘মা! তুমি কোথায় আসছো? যাও মা, ঘরে ফিরে যাও।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘বাবা! আজ আমি তোর সঙ্গে যাব, তুই কোথায় থাকিস আমি দেখো আসব। আমি খেতে পাই না, পরের মেয়ে বিয়ে করেছিস, তাকে নিয়ে আমি কি করব?’ সূর্য তখন এক সের আন্দাজ বড়ো বড়ো মুক্তা মায়ের কাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘যাও, ঘরে যাও, এতে তোমাদের অনেকদিন চলবে।’ ব্রাহ্মণী তাই নিয়ে ঘরে গেলেন। তার পরদিন, বউ উনুন জ্বেলে মুক্তাগুলি সিদ্ধ করতে লাগলেন। এক বোঝা কাঠ পুড়ে গেল, মুক্তা সিদ্ধ হল না। তখন শাশুড়িকে ডেকে বললেন, ‘ওমা! এ কি কড়াই মা! কিছুতেই সিদ্ধ হচ্ছে না।’ শাশুড়ি বললেন, ‘তবে এক কাজ করো, কড়াইগুলি ছেঁকে নিয়ে বেশ করে খোলায় ভাজ; তাহলে খাওয়া যাবে।’ বউ তাই করলেন, তাতেও খেতে পারলেন না।

তখন হামানদিস্তাতে কুটে খেতে গেলেন, তাও খাওয়া গেল না। তখন সবগুলি নিয়ে সারকুড়েতে ফেলে দিলেন। সেদিন আর তাঁদের খাওয়া হল না। আবার কিছুদিন পরে সূর্য এসে দেখেন—তাঁদের যে কষ্ট সেই কষ্ট। সূর্য বললেন, ‘মা! তোমাকে যে ধন দিয়ে গেলাম, এর মধ্যে সব ফুরিয়ে গেল?’ ব্রাহ্মণী সেদিনকার সব ঘটনা বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন। সূর্য বললেন, ‘মা! সেগুলি কী করলে? কোথায় ফেলে দিয়েছ?’ গিন্নি বললেন, ‘সারকুড়ে।’ তখন তিনজনে গিয়ে দেখেন—সেখানে কতকগুলি গাছ হয়েছে, তাতে রাশি রাশি মুক্তা ফলে আছে। সে সমস্ত গুলি তুলে এনে মাকে বললেন, ‘দেখো! এর এক একটি বাজারে বেচলে তোমাদের ছমাসের খোরাক হবে। এ জিনিস সিদ্ধ করেও খাবার নয়, কুটে ছাতু করেও খাবার নয়।’ এই বলে সূর্য চলে গেলেন। তারপর ব্রাহ্মণী মুক্তা বেচে বেচে বাড়ি করলেন, মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন, পুকুর প্রতিষ্ঠা করলেন। বাগান, বাড়ি, পুকুর যা কিছু সব সূর্যকুমারের নামে হল। বলেন, ‘আমার সূর্যকুমার যদি কখনও ঘরবাসী হয়, তো এই সকল ভোগ করবে।’ একদিন সূর্য এসে যেমন ঘরের ভিতর প্রবেশ করেছেন, অমনি ব্রাহ্মণী এসে একেবারে চাবি বন্ধ করে দিলেন। সূর্য কত মিনতি করে বললেন, তবুও দরজা খুলে দিলেন না। তিন চার দিন বন্ধ করে রাখলেন। এদিকে পৃথিবীশুদ্ধ হাহাকার পড়ে গেল। আকাশে সূর্য উদয় হয় না, পৃথিবী অন্ধকার। ব্রাহ্মণী বললেন, ‘আকাশে মেঘ নাই, রোদও নাই, এ কী হল?’ সূর্য বললেন, ‘মা! আমাকে ছেড়ে দাও, এখনি রোদ হবে।’ ব্রাহ্মণী বললেন, ‘না বাবা! আমার রৌদ্রে কাজ নেই। তুমি আমার ঘরে থাকো। চিরকালটা কি অমনি করে বেড়াবে বাবা! আমার এসব কে ভোগ করবে! তোমায় আর কোথাও যেতে দেবনা।’ বলতে বলতে এমন সময়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর এসে উপস্থিত। ব্রাহ্মণী থতমত খেয়ে বললেন, ‘তোমরা কে বাপু! কোথা হতে এসেছ?’ তাঁরা বললেন, ‘আমাদের তুমি চিনতে পারবে না। তোমার ছেলেকে ডেকে দাও।’

ব্রাহ্মণী বললেন, ‘তা ডেকে দিচ্ছি; কিন্তু তোমাদের সঙ্গে আর যেতে দেব না। বোধ হচ্ছে, তোমরাই আমার ছেলেটির পরকাল খেয়েছ।’ দরজা খুলে দিতেই সূর্য করলেন, ‘মা! আমাকে ছেড়ে দাও, ওই দেখো, স্বয়ং ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আমাকে নিতে এসেছেন। আমি শাপে তোমার ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলুম। আমি আবদ্ধ থাকলে পৃথিবী রসাতলে যাবে। ব্রাহ্মণী ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকে প্রণাম করে বললেন, ‘আমার এসব কে ভোগ করবে?’ দেবতারা বললেন, ‘তোমার ছেলের ঐশ্বর্য কী তোমরা দেখতে চাও? তবে চল।’ সূর্যকে বললেন, ‘তোমার মাকে আর তোমার স্ত্রীকে নিয়ে চল। তোমার এভাবে মর্ত্যে আবদ্ধ থাকলে চলবে না।’ সূর্য তাতে সম্মত হলেন। স্বর্গ থেকে পুষ্পরথ এল, চুয়া চন্দনের ছড়া পড়তে লাগল। ধন-দৌলৎ যা কিছু ছিল ব্রাহ্মণকে দান করে, দেবগণের সঙ্গে ব্রাহ্মণী সূর্যের হাত ধরে অমাবস্যার দিন বউকে নিয়ে স্বর্গে চলে গেলেন। তাই দেখে পাড়াশুদ্ধ লোক ধনি ধন্যি করতে লাগল। তারাও অমাবস্যার দিন সূর্যের পূজো করে উপবাস করতে লাগল। ক্রমে ক্রমে চতুর্দিকে অমাবস্যার কথা প্রচার হল। সেই থেকে পৃথিবীর লোক বারমেসে অমাবস্যার ব্রত করতে লাগল।

বারমেসে অমাবস্যার কথা সমাপ্ত।

সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রতকথা

পুরাকালে আমাদের দেশে অশ্বপতি নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর সুশাসনে প্রজারা তাঁকে পিতার মতো ভক্তি করত। কিন্তু রাজার মনে সুখ ছিল না। তিনি ছিলেন নি:সন্তান।

অবশেষে একদিন সন্তান-কামনায় তিনি রাজ্য ছেড়ে বনে গিয়ে সাবিত্রী দেবীর আরাধনায় প্রবৃত্ত হলেন। দীর্ঘ আঠারো বৎসর ধরে চলল তাঁর কঠোর তপস্যা। তখন দেবীর কৃপা হল। দেহজ্যোতিতে অন্ধকার বনভূমি আলোকিত করে রাজার সম্মুখে আবির্ভূতা হয়ে তিনি তাঁকে বর প্রার্থনা করতে বললেন। রাজা করজোড়ে দেবীকে তাঁর মনোবাসনা নিবেদন করতে, দেবী বললেন, ‘তথাস্তু। ভগবান ব্রহ্মদেবের আদেশে সত্বরই তোমার এক অলৌকিক রূপলাবণ্যময়ী কন্যাসন্তান লাভ হবে।’

‘তাই হোক!’ বলে দেবীকে প্রণাম করে মাথা তুলতেই রাজা দেখেন দেবী কখন অন্তর্দ্ধান করেছেন।

প্রফুল্লচিত্তে রাজা আবার রাজধানীতে ফিরে এলেন। তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পাটরানি মালবীর কোল আলো করে এল একটি মেয়ে। ঊষার মতো তার রূপের ছটা। রাজ্যময় আনন্দ-উৎসব পড়ে গেল। সাবিত্রীদেবীর বরে কন্যাসন্তান লাভ হয়েছে বলে রাজা-রানি আদর করে নাম রাখলেন তার সাবিত্রী।

বহু আরাধনার এই একটিমাত্র সন্তান। আদরে যত্নে দিনদিন শশিকলার মতো বাড়তে লাগল সে। ক্রমে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে এসে পদার্পণ করলে সাবিত্রী। পূর্ণিমার চাঁদও ম্লান হয়ে যায় তার রূপের ছটায়। কন্যার বিয়ের জন্যে স্বয়ংবর-সভা ডাকলেন রাজা। দেশ-দেশান্তর থেকে এলেন তরুণ রাজা আর রাজকুমারগণ। কিন্তু সাবিত্রীর দিকে চোখ তুলে চাইতেই তাঁদের সব চোখ ঝলসে যায় তার রূপের ছটায়। মনে হয় সদ্য স্বর্গ থেকে নেমে এলেন বুঝি কোনো দেবী। করজোড়ে ‘মা’ বলে নমস্কার করে তাড়াতাড়ি সরে পড়েন তাঁরা সবাই।

দুশ্চিন্তায় মুষড়ে পড়তে থাকেন রাজা অশ্বপতি আর রানি মালবী। এত রূপ, এমন গুণ, তাই কি শেষে হল মেয়ের কাল?

দিনের পর দিন গড়িয়ে চলে। প্রভাতসূর্যের রশ্মিমালার মতো ঝলমল করে যেন প্রহরে প্রহরে বেড়ে উঠতে থাকে সাবিত্রীর রূপ। যৌবনে এসে পদার্পণ করেন তিনি। দেবর্ষি নারদ এসে রাজাকে পরামর্শ দেন, ‘মহারাজ! দেবকন্যার মতো আপনার এ মেয়ে। তাকেই দিন মনমতো স্বামী খুঁজে নেবার অধিকার। প্রেরণ করুন মেয়েকে দেশভ্রমণে।’

তাই হয়। রাজ্যময় পড়ে যায় ‘সাজ সাজ’ রব। দাসদাসী, লোকজন সঙ্গে করে একদিন শুভক্ষণে গৃহদেবতা ও পিতামাতার চরণ বন্দনা করে দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন সাবিত্রী।

কত নগর, কত জনপদ ভ্রমণ করেন তিনি, করেন কত তীর্থ পর্যটন। যেখান দিয়ে চলে যায় তাঁর রথ, করজোড়ে তাঁর উদ্দেশ্যে নমস্কার করে সরে যায় যত পথের লোক—এমনি তাঁর রূপবৈভব, এমনি তাঁর মহিমময় গাম্ভীর্য।

এমনি করে চলতে চলতে একদিন তিনি এলেন এক তপোবনে। মহারাজ দ্যুমৎসেন রাজ্যহারা হয়ে অন্ধ অবস্থায় মহিষী শৈব্যা আর পুত্র সত্যবানকে নিয়ে তাপসজীবন যাপন করছিলেন সেখানে। তরুণ সূর্যের মতো ভাস্বর সত্যবান। তাঁরই সঙ্গে চার চোখের মিলন হল সাবিত্রীর। মনে মনে তাঁকে পতিত্বে বরণ করলেন তিনি।

আর দেশভ্রমণের প্রয়োজন কী? গৃহে ফেরার আদেশ দিলেন সাবিত্রী সঙ্গের লোকজন সবাইকে।

নয়নের নিধি একমাত্র কন্যা ফিরে এসেছে ঘরে। রাজা-রানির আনন্দ আর ধরে না। তবুও মনে জাগে সংশয়,—অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে তো? এমন সময় সংবাদ এল দেবর্ষি নারদ মহারাজ অশ্বপতির সাক্ষাৎপ্রার্থী।

ত্রস্তব্যস্ত হয়ে রাজসভায় ছুটে এসে পাদ্যঅর্ঘ্য দানে দেবর্ষিকে অভ্যর্থনা করলেন রাজা। যথারীতি কুশল প্রশ্নাদির পর সাবিত্রীর কথা জিজ্ঞেস করলেন দেবর্ষি। মহারাজ অশ্বপতি অন্তঃপুরে সংবাদ প্রেরণ করতেই, সাবিত্রী এসে পিতা ও দেবর্ষির পাদবন্দনা করে নতমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আশীর্বাদের পালা সাঙ্গ হল। সংশয়াতুর কন্ঠে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন রাজা, ‘অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছে, মা?’

মনে মনে লজ্জায় মরে গিয়ে নতমুখে উত্তর দিলেন সাবিত্রী, ‘হ্যাঁ, বাবা।’

আশায় উদবেলিত হয়ে উঠল রাজার প্রাণ। ‘তাঁর পরিচয়?’—সানন্দে প্রশ্ন করলেন তিনি মেয়েকে।

তেমনি নতমুখেই অতি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন সাবিত্রী, ‘মহারাজ দ্যুমৎসেনের পুত্র সত্যবান। কুমারের যখন শৈশবকাল তখনই শত্রুকতৃক বিতাড়িত হয়ে, আজ প্রায় এই বিশ বছর যাবৎ অন্ধ অবস্থায় মহিষী ও কুমারের সঙ্গে তপোবনবাসী হয়ে আছেন মহারাজ দ্যুমৎসেন…

‘আ-হা-হা!’ —সাবিত্রীর কথা শেষ না হতেই খেদোক্তি বেরিয়ে এল দেবর্ষি নারদের কন্ঠ থেকে।

চমকিত হয়ে সভাজন সবাই চোখ তুলে চাইলেন নারদের দিকে। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে রাজার দিকে চেয়ে বলতে লাগলেন নারদ, ‘মহারাজ! মহা ভুল করেছেন মা সাবিত্রী আমার।’

‘কেন?’—জিজ্ঞেস করলেন রাজা, ‘কুমার সত্যবান কি বিজ্ঞ ও বীরপুরুষ নন? হৃদয়বান ও রূপবান নন কি তিনি?’

‘সকল রকম সদগুণেই বিভূষিত তিনি’—উত্তর দিলে দেবর্ষি নারদ, ‘রূপবানও বটেন—তরুণ সূর্যের মতো। কোথায় তাঁর সমকক্ষ ক্ষত্রিয়কুমার এই মর্ত্যলোকে? কিন্তু স্বল্প তাঁর পরমায়ু; আজ থেকে ঠিক বৎসরকাল পূর্ণ হলেই কালপূর্ণ হবে তাঁর।’

হতাশায় প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন রাজা অশ্বপতি। ‘অপর কোনো তরুণকে পতিত্বে বরণ করো তুমি, মা আমার।’—কাতরকন্ঠে উপদেশ দিলেন তিনি কন্যাকে।

এ কথায় সংকোচের বাঁধ কেটে গেল সাবিত্রীর। নম্র অথচ দৃঢ়কন্ঠেপ্রত্যুত্তর দিলেন তিনি, ‘বাবা, ‘দিলুম’ কথাটা লোকে শুধু একবারই বলে। যা দিলুম তা আর কখনও ফিরিয়ে নিতে পারিনে—লোভেও নয়, ভয়েও নয়। নারী একবারই হৃদয় দান করে থাকে। পতিই নারীর একমাত্র গতি। এ দান আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।’

সাবিত্রীর মুখে সতীধর্মের মাহাত্ম্য শুনে দেবর্ষি নারদ পরম পরিতুষ্ট হয়ে এ বিয়েতে মত দিয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করে চলে গেলেন। তারপর শুভদিনে রাজা অশ্বপতি তপোবনে গিয়ে ধূমধাম করে সত্যবানকে কন্যাদান করে চোখের জল মুছতে মুছতে ফিরে এলেন নিজ রাজধানীতে।

রাজকন্যার বেশ খুলে ফেলে তপোবনবাসিনী সাবিত্রী ধরলেন তাপসীর বেশ। বসন-ভূষণ সব বিলিয়ে দিলেন তাপসকন্যা আর তাপসবধূদের মধ্যে। শ্বশুর, শাশুড়ি, আর স্বামীর সেবায় সম্পূর্ণভাবে নিজেকে উৎসর্গ করে দিলেন তিনি। ‘বৎসরকাল পূর্ণ হলেই কালপূর্ণ হবে তাঁর’ —দেবর্ষির এই কথা অনুক্ষণ তাঁর হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বেজে বেজে ফিরতে লাগল নীরব শোকের মূর্চ্ছনার মতো। মনের ভয় তবুও মনেই রইল চাপা। সারাক্ষণ শুধু তাঁর এক চিন্তা— কী করে হবে এ নির্মম বিধিলিপির খন্ডন!

কতটুকু সময় আর একটি বৎসর! দিনের পর দিন গড়িয়ে চলতে চলতে প্রায় পূর্ণ হয়ে এল কালচক্রের আবর্তন। আর তিনটি দিন মোটে বাকি। শ্বশুর-শাশুড়ির অনুমতি নিয়ে ত্রিযামা ব্রত গ্রহণ করলেন সাবিত্রী। তৃতীয় দিনের দিন যথারীতি সমিধ আহরণের জন্যে পিতামাতার অনুমতি নিয়ে বনগমনের উদ্যোগ করলেন সত্যবান। সাবিত্রীর পণ এক মুহূর্তও সেদিন চোখের আড়াল করবেন না তিনি স্বামীকে। তিনিও চাইলেন সঙ্গে যেতে। তাঁর উপবাস-খিন্ন দেহলতার দিকে চেয়ে সস্নেহে তাঁকে নিবৃত্ত করতে চাইলেন সত্যবান। কিন্তু সাবিত্রীর আগ্রহাতিশয্যে তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁকে স্বামীর সঙ্গে বন-গমনের অনুমতি দিলেন। কী জানি কোথা থেকে আচম্বিতে এসে দেখা দেয় কোন ঘোর বিপদ! তাই স্বামীর একেবারে পাশ ঘেঁষে দুর্গম বনপথে পথ চলতে লাগলেন সাবিত্রী। তাঁর ব্রতশুদ্ধ দেহপ্রভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল বনপথ।

ক্রমে গভীর অরণ্যে এসে উপনীত হলেন দুজনে। সেখানে সাবিত্রীকে নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে, কুঠার হাতে বড়ো একটা গাছে গিয়ে উঠলেন সত্যবান। শুরু হল কাঠ কাটা। নীচে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন সাবিত্রী কর্মরত স্বামীর দিকে। হঠাৎ মাথার মধ্যে যন্ত্রণা বোধ হল সত্যবানের। দেখতে দেখতে বেড়ে চলল সে যন্ত্রণা। নিরুপায় হয়ে শেষে অতি কষ্টে গাছ বেয়ে নীচে নেমে পড়লেন তিনি। পা টলছিল তখন সত্যবানের। ছুটে গিয়ে তাঁকে ধরে ফেললেন সাবিত্রী। তারপর আসনপিঁড়ি হয়ে বসে সত্যবানকে শুইয়ে দিয়ে সযত্নে কোলের পরে টেনে নিলেন তাঁর মাথা। সঙ্গে সঙ্গেই অচৈতন্য হয়ে পড়লেন সত্যবান। নিরুপায়ের মতো আকাশের দিকে চোখ তুলে চাইতে গিয়েই সাবিত্রী দেখেন, সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন স্বয়ং যমরাজ!

‘ভদ্রে! আমি যম,’—সাবিত্রীর মুখে কোনও কথা ফোটবার আগেই বললেন যমরাজ, ‘মরণের অধিপতি আমি। নিয়ে যেতে এসেছি তোমার স্বামীকে। ছেড়ে দাও তাঁকে।’

ব্রতশুদ্ধা সাবিত্রীর আজ যমরাজকেও কোনও ভয় নেই। করজোড়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘ধর্মরাজ! আপনি স্বয়ং এসেছেন আমার স্বামীকে নিয়ে যেতে?’

যমরাজ বললেন, ‘সত্যবানের মতো পবিত্রাত্মাকে আমার দূতেরা স্পর্শ করতে পারে না। তাই আমি নিজেই এসেছি।’

এই বলে যমরাজ সত্যবানের দেহ থেকে অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ তাঁর আত্মাকে বার করে এনে তাকে পাশবদ্ধ করলেন, তারপর চলতে লাগলেন দক্ষিণদিকে।

সাবিত্রীও চলতে লাগলেন তাঁর পিছু পিছু। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে যমরাজ পিছু ফিরে বললেন সাবিত্রীকে, ‘ভদ্রে! গৃহে ফিরে যাও। আমাকে অনুসরণ করে কোনও ফল নেই।’

করজোড়ে নিবেদন করলেন সাবিত্রী, ‘ধর্মরাজ! শাস্ত্রবাক্য এই যে, একত্রে সপ্তপদ গমন করলে পরস্পরের মধ্যে মৈত্রী হয়। আমাকে তাই আপনার মিত্র বলে গণনা করতে হবে। মিত্রবাক্য ধীরভাবে শ্রবণ করা কর্তব্য। সুতরাং আমার কথা শ্রবণ করুন। নারীর কর্তব্য স্বামীর অনুগমন করা। আপনার আর আমার মধ্যে যখন মৈত্রী ঘটেছে তখন আপনার পক্ষে আমাকে আমার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হবার উপদেশ দান করা ধর্মসংগত কাজ হবে না।’

সাবিত্রীর কথায় পরম প্রীতিলাভ করে যম বললেন, ‘মা, তোমার মতো ধর্মজ্ঞান মরজগতে সুদুর্লভ। তোমার কথায় আমি পরম প্রীতিলাভ করেছি। একমাত্র তোমার স্বামী সত্যবানের জীবন ছাড়া আর যে বর তোমার ইচ্ছা তুমি গ্রহণ করতে পারো।’

যমরাজের কথায় কথঞ্চিৎ আশ্বস্ত হয়ে সাবিত্রী বললেন, ‘আমার শ্বশুর ঠাকুর বৃদ্ধ বয়সে অন্ধ হয়ে বড়োই কষ্টে কালযাপন করছেন। আপনি যদি আমার প্রতি প্রসন্ন হয়ে থাকেন তবে এই বর দিন যে, তিনি যেন তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।’

‘তথাস্তু’ বলে যমরাজ আবার দক্ষিণদিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়েই পিছন ফিরে তিনি দেখেন সাবিত্রী তাঁর অনুসরণ করছেন। তাঁর দিকে চেয়ে তিনি তখন বললেন, ‘তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছো, মা। এবার ঘরে ফিরে যাও।’

সাবিত্রী বললেন, ‘ভগবান! স্বামী সঙ্গে পথ-পর্যটনে সতী নারীর ক্লান্তি কোথায়? তিনি যেখানে যাচ্ছেন আমিও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে সেখানেই যাচ্ছি। এই তো নারীধর্ম, ধর্মরাজ।’

এ কথায় যমরাজ আরও প্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘মা, তোমার স্বামীর জীবন ছাড়া আর যে বর তুমি চাইবে তাই আমি দেব। তুমি বর প্রার্থনা করো।’

সাবিত্রী বললেন, ‘আমার শ্বশুর ঠাকুর বৃদ্ধবয়সে রাজ্যহারা হয়ে বড়োই কষ্টে জীবনযাপন করছেন। তিনি যেন তাঁর হৃতরাজ্য ফিরে পান।’

‘তথাস্তু’ বলে যমরাজ আবার যমপুরীর পথ ধরলেন। কিন্তু সাবিত্রী তাঁর অনুসরণে বিরত হলেন না। যমরাজ তখন সত্যবানের জীবন ছাড়া তাঁকে অন্য যে-কোনও বর প্রার্থনা করতে বললেন। সাবিত্রী বললেন, ‘আমার পিতা অপুত্রক। আপনার বরে তাঁর যেন শতপুত্র লাভ হয়।’

‘তথাস্তু’ বলে যমরাজ আবার যমপুরীর দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই ফিরে দেখেন সাবিত্রী আগের মতোই তাঁর অনুসরণ করে চলেছেন। তিনি সাবিত্রীকে বললেন, ‘মা, এবার গৃহে ফিরে যাও।’

সাবিত্রী বললেন, ‘ধর্মরাজ! শাস্ত্রে বলে স্বামীহীন গৃহ শ্মশানতুল্য। স্বামীই স্ত্রীর গৃহ। আমি সেই স্বামীর সঙ্গে সঙ্গেই চলেছি। আপনি সাক্ষাৎ ধর্ম। আমি সেই ধর্মেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছি। স্বামীসঙ্গ এবং ধর্মসঙ্গ ত্যাগ করে, সাক্ষাৎ ধর্ম আপনি, আমাকে বলছেন স্বামীহীন শ্মশান-গৃহে ফিরে যেতে?’

সাবিত্রীর কথায় প্রসন্ন হয়ে যমরাজ তাঁকে তাঁর স্বামীর জীবন ছাড়া অন্য যে-কোনও বর প্রার্থনা করতে বললেন। করজোড়ে সাবিত্রী তখন নিবেদন করলেন, ‘ধর্মরাজ! আপনার বরে আমার স্বামীর ঔরসে আমি যেন শতপুত্রের জননী হতে পারি।’

‘তথাস্তু’ বলে পুনরায় যমরাজ যমপুরীর পথ ধরলেন। তবুও সাবিত্রী তাঁর সঙ্গ পরিত্যাগ করলেন না। কিছুদূর গিয়ে যমরাজ তাঁর দিকে ফিরে বললেন, ‘আর কেন আমায় অনুসরণ করছ, মা? এবার গৃহে ফিরে যাও স্বামীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা কর গে।’

করজোড়ে সাবিত্রী বললেন, ‘সে কী কথা, ধর্মরাজ। আপনাতেও কি মিথ্যা সম্ভবে? আমার স্বামীর জীবন ভিক্ষা না দিলে কী করে তাঁর ঔরসে আমার গর্ভে শতপুত্র জন্মগ্রহণ করবে, ধর্মরাজ?

তাই তো! সাবিত্রীর কথায় যেন চমকে উঠলেন যমরাজ নিজেই। ধর্মের স্খলন কি কখনও সম্ভবপর! ‘তবে তাই হোক!’—বলে যমরাজ সত্যবানের আত্মাকে পাশমুক্ত করে দিয়ে বললেন, ‘মা, এই আমি তোমায় তোমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিলুম। তোমার সতীধর্মের তেজঃপ্রভাবে আজ সাক্ষাৎ ধর্মও তোমার কাছে পরাভূত। আমার বরে তোমরা দুজনে চারশো বছর পরমায়ু লাভ করে সুখে শান্তিতে তোমাদের মর্ত্যলোকের জীবনযাত্রা নির্বাহ করবে। এবার গৃহে ফিরে যাও, মা।’

এই বলে প্রফুল্লচিত্তে যমরাজ অন্তর্ধান করলেন। সাবিত্রী ত্বরিতপদে ফিরে চললেন যেখানে গভীর বনের মধ্যে পড়ে ছিল সত্যবানের শবদেহ। সেখানে এসেই সযত্নে আবার তিনি কোলের পরে টেনে নিয়ে বসলেন সত্যবানের মাথা। অল্পক্ষণের মধ্যেই সত্যবানের জ্ঞান ফিরে এল। চোখ মেলে তিনি চেয়ে দেখেন—নিশীথ রাতের অন্ধকারে আবৃত হয়ে পড়েছে বনস্থলী। তারই মধ্যে অপলক বিদ্যুৎশিখার মতো তাঁর শিয়রে জেগে রয়েছেন উপবাস-খিন্না সতী সাবিত্রী।

‘উঃ কী ঘুম ঘুমিয়েছি আমি!’—অস্ফুষ্ট স্বরে বললেন সত্যবান; ‘জাগাওনি কেন আমায়? অন্ধকার হয়ে গেছে কখন চারধার।’ অন্ধকারের কথার সঙ্গে সঙ্গে কী যেন মনে পড়ল তাঁর; দুর্বল দেহে খেলে গেল আতঙ্কের শিহরণ; বলতে লাগলেন তিনি মুখ ফুটে, ‘উঃ, কী এক দুঃস্বপ্ন দেখছিলুম এতক্ষণ! কে এক আদিত্যবর্ণ শ্যামকান্ত মহাপুরুষ, পরিধানে তাঁর রক্ত পট্টবসন, কর্ণে কুন্ডল, বাহুতে বলয় ও অঙ্গদ, মস্তকে মণিমন্ডিত স্বর্ণমুকুট, হস্তে পাশ, আমায় বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি দক্ষিণ দিকে। আর তুমি, মণিহারা ফণীর মতো চলেছ তাঁর পিছু-পিছু। সত্যি? না, শুধু স্বপ্ন? বলো তো আমায় ঠিক করে। কে তিনি মহাপুরুষ?’

‘তিনি আমাদের পরম বন্ধু’—বলে তাঁর উদ্দেশ্যে করজোড়ে প্রণতি জানালেন সাবিত্রী। তারপর স্বামীর দিকে চেয়ে বললেন, ‘অনেক রাত হয়ে গেছে, প্রিয়তম। কী জানি কত কী ভেবে ভেবে সারা হচ্ছেন সবাই তপোবনে। এসো আমার কাঁধে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে চলো গৃহপানে কাল প্রত্যুষে সব কথা খুলে বলব তোমায়।’

সংক্ষেপে এই হল সাবিত্রী ব্রতকথা। বলা বাহুল্য ধর্মরাজ যমের সব কটি বরই অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠেছিল।

জ্যৈষ্ঠ মাসে কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে উপবাস করে যে নারী বটবৃক্ষমূলে সাবিত্রীর পুজো করে, সে কখনও বিধবা হয় না।

এই পুজোয় পাঁচ রঙের গুঁড়ো (পঞ্চবর্ণ গুঁড়িকা) দিয়ে মন্ডল এঁকে, তার মধ্যে ঘট স্থাপন করতে হয়। তাছাড়া পুঁততে হয় বটগাছের ডাল; তাতে থাকা চাই পাতা।

এসব ছাড়া সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রতপালনে আরও অনেক রকমের আয়োজন দরকার। সেজন্যে পুরোহিত ডেকে সব বিধিব্যবস্থা করতে হয়।

পুজো শেষ হলে পর সতী-শিরোমণি সাবিত্রীকে স্মরণ করে এই স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করতে হয়:

এ তিন ভুবনে তুমি সতী পতিব্রতা।
পবিত্র হইবে লোক শুনি তব কথা।।
বিশেষ করিলে ব্রত চতুর্দশী দিনে।
পাইলে এ চারি বর তাহার কারণে।।

সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রতকথা সমাপ্ত।

শিবব্রত

বৈশাখ মাসের ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রতচারিণী—চৈত্র সংক্রান্তি (চৈত্র মাসের শেষ দিন), অর্থাৎ চড়কপূজার দিন শিবব্রত আরম্ভ করে বৈশাখ সংক্রান্তি, অর্থাৎ বৈশাখ মাসের শেষ দিন অবধি রোজ ভোরে (অথবা সকালবেলায়) ব্রত করতে হবে। রোজই গড়তে হবে নতুন শিব, রোজই দিতে হবে আলপনা। পাঁচ বৎসর বয়সে কুমারী প্রথম নেবে এই ব্রত; তারপর চার বৎসর ব্রত পালন করে নয় বৎসর বয়সে করবে ব্রত উদযাপন। ব্রত উদযাপনের সময় চাই সোনার বেলপাতা (অভাবে কাঞ্চন মূল্য)। ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে দক্ষিণার সঙ্গে সেই সোনার বেলপাতাও দান করতে হবে তাঁকে।

ব্রতের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি—ব্রতের জন্য দরকার:

১. শিব গড়বার গঙ্গামাটি (যেখানে গঙ্গা নেই সেখানে পুকুর কি অন্য কোনো ভালো জায়গার এঁটেল মাটি হলেই চলবে);

২. শিব বসাবার তামার টাট একখানি;

৩. আকন্দ ফুল;

৪. ধুতুরা ফুল;

৫. বেলপাতা;

৬. দূর্বা;

৭. বেলের খোলা;

৮. শ্বেত চন্দন;

৯. আলো চাল ও

১০. নৈবেদের আলো চাল আর কলা।

মূর্তি গঠন ও মূর্তি স্থাপন—নিজের বুড়ো আঙুলের মাপে কুমারী নিজ হাতে শিব গড়বে।

পুজোর জায়গা বেশ করে ধুয়ে-পুঁছে পিটুলি দিয়ে নিজ হাতের মাপে আঁকতে হবে একটি (চৌকো) বর্গক্ষেত্র, তার মধ্যে থাকবে একটি (গোল) মন্ডল, সেই মন্ডলের মধ্যে থাকবে একটি ত্রিভুজ (ত্রিকোণ)।

এবার তামার টাটখানিকে ঠিক তার মাঝখানে বসিয়ে তার মধ্যে পেতে দেবে একটি বেলপাতা। শিবকে বসাবে সেই বেলপাতার উপর।

শিবপূজা—মূর্তি স্থাপনের পর বেলের খোলায় করে তিনবার মন্ত্র পড়ে শিবের মাথায় জল ঢেলে দেবে।

শিবের মাথায় জল দেবার মন্ত্র:

শিল শিলাটন শিলে বাটন শিল অঝঝর ঝরে।
স্বর্গ হতে মহাদেব বলেন গৌরী কি বের্ত করে।।
আশ নড়ে পাশ নড়ে নড়ে সিংহাসন।
হরগৌরী কোলে করে গৌরী আরাধন।।

এইভাবে জল ঢেলে শিবকে স্নান করানো হলে পর ফুল, বেলপাতা, দূর্বা, চন্দন, আলো চাল, সব একসঙ্গে নিয়ে মন্ত্র পড়ে তিনবার অঞ্জলি দেবে।

অঞ্জলির মন্ত্র:

কাল পুষ্প তুলতে গেলাম সেখানে লতা পাতা।
শিবের চরণ দেখা হল শিবের মাথায় জটা।।
অখন্ড বিল্বপত্র তোলা গঙ্গাজল।
এই পেয়ে তুষ্ট হলেন ভোলা মহেশ্বর।।

অঞ্জলি দানের পর ‘নমঃ শিবায় নমঃ’ বলে নৈবেদ্যতে ফুল আর বেলপাতা দেবে।

তারপর প্রণাম করবে।

প্রণামের মন্ত্র:

নমঃ শিবায় নমঃ নমঃ শিবায় নমঃ।
নমঃ শিবায় নমঃ নমঃ হরায় বজ্রায় নমঃ।

শিবব্রত সমাপ্ত।

পুণ্যি-পুকুর ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রতচারিণী—পুণ্যি-পুকুর ব্রতও নিতে হয় চৈত্র সংক্রান্তিতে; সেদিন থেকে বৈশাখ মাসের শেষ দিন অবধি রোজ সকালবেলায় ব্রতপালন করে যেতে হয়। পরপর চার বৎসর ব্রতপালনের শেষে হয় ব্রত উদযাপন। ব্রত উদযাপনের সময় ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে ষোড়শদান দক্ষিণার সঙ্গে ব্রাহ্মণকে দিতে হয় সোনার বেল (অভাবে কাঞ্চন-মূল্য)। কোথাও কোথাও চারজন ব্রাহ্মণকে খাওয়ানোর বিধিও আছে।

ব্রত দ্রব্যাদি: শ্বেত পুষ্প, চন্দন, দূর্বা, আর একঘটি জল।

ব্রতানুষ্ঠান: পুকুরপাড়ে কি বাড়ির উঠোনে একহাত চৌকো পুকুর করবে। শানের মেজেয় পুকুর করতে হলে আল দেবে, গর্ত খুঁড়তে হবে না। পুকুরে করতে হবে চারটে ঘাট; ঘাটের দুই পাশে কড়ি সাজিয়ে দেবে। মাঝখানে পুঁতবে একটি তুলসী গাছ। (অনেকে ডাল আর পাতা শুদ্ধ বেলও দেয়)।

তারপর পূর্বমুখ কি উত্তরমুখ হয়ে বসে মন্ত্র পড়ে গাছে আর পুকুরে একঘটি করে জল ঢালবে। গাছে জল ঢালবার মন্ত্র:

তুলসী তুলসী নারায়ণ।
তুমি তুলসী বৃন্দাবন।।
তোমার মাথে ঢালি জল।
অন্তিমকালে দিও স্থল।।

পুকুরে জল ঢালবার মন্ত্র:

পুণ্যি-পুকুর পুষ্পমালা।
কে পুজেরে দুপুর বেলা।।
আমি সতী লীলাবতী।
সাত ভেয়ের বোন ভাগ্যবতী।।

তারপর মন্ত্র পাঠ করে তিনবার পুকুরে ফুল, চন্দন, আর দূর্বা দেবে।

ফুল-চন্দন-দূর্বা দিবার মন্ত্র:

এ পূজলে কী হয়।
নির্ধনীর ধন হয়।।
সাবিত্রী-সমান হয়।
স্বামী আদরিণী হয়।।
স্বামীর কোলে পুত্র দোলে।
মরণ হয় যেন একগলা গঙ্গাজলে।।

এবার গলায় কাপড় দিয়ে প্রণাম করে ব্রত সমাপন করবে।

চতুর্থ বৎসরে ব্রত উদযাপনের সময় এক কাহন কড়ি দিতে হয়; সে কড়ি ভাই পেয়ে থাকে।

পুণ্যি-পুকুর ব্রত সমাপ্ত।

দশ-পুত্তল ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রতচারিণী—দশ-পুত্তল ব্রতও করতে হয় চৈত্র সংক্রান্তি থেকে বৈশাখের শেষ অবধি। তবে এর অনুষ্ঠান হয় রোজ বৈকাল বেলায়। এ ব্রতও কুমারী প্রথম নেবে পাঁচ বৎসর বয়সে, চার বৎসর ব্রত করে নয় বৎস বয়সে করবে ব্রত উদযাপন।

ব্রতানুষ্ঠান—পিটুলি দিয়ে দশটি পুতুল এঁকে এক-একটি মন্ত্র বলে এক-একটি পুতুলে ফুল কি দূর্বা দেবে।

মন্ত্র:

মরিয়ে মনুষ্য হব, ব্রাহ্মণ কুলে জন্ম লব।
সীতার মতো সতী হব, রামের মতো পতি পাব।।
লক্ষ্মণের মতো দেবর পাব, কৌশল্যার মতো শাশুড়ি পাব।
দশরথের মতো শ্বশুর পাব, দুর্গার মতো মা পাব।।
শিবের মতো বাপ পাব, লক্ষ্মী সরস্বতী বোন পাব।।
কার্তিক গণেশ ভাই পাব, কুন্তীর মতো ধীরা হব।।
দ্রৌপদীর মতো রাঁধুনি হব, কলা বউয়ের মতো লজ্জাবতী হব।
বিউলির ডালের বর্ণ হব, দূর্বার মতো লতিয়ে যাব।।

দশ-পুত্তল ব্রত সমাপ্ত।

হরির চরণ ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রতচারিণী—বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে কুমারী হরির চরণ ব্রত নিয়ে সারা মাস ব্রতপালন করবে। এইভাবে চার বৎসর ব্রত করার পর হবে ব্রত উদযাপন। উদযাপনের সময় সোনা, রূপা আর তামার তিন জোড়া চরণ গড়িয়ে পুজো করতে হবে। তারপর তিনজন ব্রাহ্মণকে খাইয়ে তাঁদের প্রত্যেককে কাপড় আর গামছা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চরণ কয় জোড়াও (অভাবে কাঞ্চন-মূল্য) দান করবে।

ব্রত-দ্রব্য: তামার টাট একখানি, শ্বেত চন্দন, ধান, দূর্বা আর ফুল।

ব্রতানুষ্ঠান: তামার টাটে বেশ ভালো করে চন্দন মাখিয়ে আঙুল দিয়ে দুখানি চরণ (পা) আঁকবে। তারপর বুড়ো আঙুল আর মাঝের আঙুল দিয়ে ফুল, দূর্বা, আর ধান ধরে মন্ত্রপাঠ করে সেসব সেই চরণ দুখানির উপর দেবে। কেউ কেউ আবার বুড়ো আঙুল, তার পরের আঙুল (তর্জনী), আর মাঝের আঙুল (মধ্যমা) দিয়ে মল্লিকা ফুল—অভাবে তুলসী পাতা ধরে মন্ত্রপাঠের পর তা চরণ দুখানিতে দিয়ে থাকে। তিনবার মন্ত্র পড়ে তিনবার এইভাবে পুজো করতে হয়।

মন্ত্র:

চন্দনে ডুবু ডুবু হরির পা।
হরি বলেন—মা গো মা।
আজ কেন আমার শীতল পা।।
মা বলেন—
কোন সতী ভাগ্যবতী
সেই পূজেছেন তোমার পা।।
সে কি বর চায়—
আপনাকে সুন্দর চায়, রাজরাজেশ্বর স্বামী চায়।
গুণবতী ঝি চায়, সভা-উজ্জ্বল জামাই চায়।।
অমর বরপুত্র চায়, গিরিরাজ বাপ চায়।
মেনকার মতো মা চায়, দুর্গার মতো আদর চায়।।
রামের মতো পতি,
সীতার মতো সতী,

আলনা-ভরা কাপড়, মরাই-ভরা ধান,
গোয়াল-ভরা গোরু, পাল-ভরা মোষ,
পায়ে আলতা মুখে পান,
পট্টবস্ত্র পরিধান।।
সূক্ষ্ম মল্লিকার ফুলে পূজব হরি গঙ্গাজলে,
থাকব হরির চরণতলে।।
উযোতে পারি তো ইন্দ্রের শচী,
না পারি তো শ্রীকৃষ্ণের দাসী।।
স্বামীর কোলে পুত্র দোলে,
মরণ হয় যেন একগলা গঙ্গাজলে।।
হরির চরণ ব্রত সমাপ্ত।

অশ্বত্থ পাতা ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রতচারিণী—চৈত্র মাসের শেষ দিন (চড়ক পূজার দিন) কুমারী অশ্বত্থ পাতা ব্রত গ্রহণ করে সেদিন থেকে সারা বৈশাখ মাস ভোরে কিংবা সকালবেলায় ব্রতপালন করবে। এ ব্রত কয় বৎসর করতে হবে তার খুব বাঁধাবাঁধি নিয়ম নেই। ব্রত উদযাপনের সময় চাই সোনার পাতা পাঁচটি, রূপার ফল একটি, ভুজ্যি পাঁচটি, আর পাঁচ কলসি জল। পাঁচজন ব্রাহ্মণকে খাইয়ে দক্ষিণার সঙ্গে সোনার পাতা, রুপার ফল, এসবও দিতে হয়; অভাবে মূল্য ধরে দেওয়া যায়।

ব্রতের দ্রব্যাদি: পাঁচটি অশ্বত্থ পাতা। তার একটি কচি, একটি কাঁচা, একটি পাকা, একটি শুকনো, আর একটি ঝুরঝুরে হওয়া চাই।

ব্রতানুষ্ঠান: ভোরে কী সকালবেলায় স্নানের সময় পাতা পাঁচটি নিয়ে কুমারী জলে নামবে। তারপর ডুব দেবার সময় সেগুলো মাথায় হাত দিয়ে চেপে ধরে মন্ত্র পড়বে; ডুব থেকে উঠবার সময় হাত সরিয়ে নেবে, পাতা ভেসে যাবে।

ডুব দিবার মন্ত্র:

অশ্বত্থ পাতা, কুঞ্জলতা, শ্যাম পন্ডিতের ঝি, সাকারা সুন্দরী।।
সাত বউ যায় সাত দোলাতে, সাত বেটা যায় সাত ঘোড়াতে।
কর্তা যান গজহস্তীতে, গিন্নি যান রত্ন সিংহাসনে।।
ঠাকুর ঠাকরুণ যান দোলনে।।

ভগবতী বলছেন:

পাকা পাতাটি মাথায় দিলে পাকা চুলে সিঁদুর পরে।
কাঁচা পাতাটি মাথায় দিলে কাঁচা সোনার বর্ণ ঝরে।
শুকনো পাতাটি মাথায় দিলে সুখ-সম্পত্তি বৃদ্ধি হয়।
ঝুরঝুরে পাতা মাথায় দিলে মণিমুক্তার ঝুড়ি পায়।
উযাইতে পারিলে ইন্দ্রের শচী না পারিলে ভগবানের দাসী।।

কোথাও কোথাও মন্ত্রের প্রথম কয় চরণ (‘অশ্বত্থ পাতা…ঠাকুর ঠাকরুণ যান দোলনে’) বলার পর পাঁচটি মন্ত্র পড়ে পাঁচবার ডুব দেবার বিধি আছে।

মন্ত্র:

ভগবতী বলছেন:

১. পাকা পাতাটি মাথায় দিলে পাকা চুলে সিঁদুর পরে।

২. কাঁচা পাতাটি মাথায় দিলে কাঁচা সোনার বর্ণ ঝরে।

৩. শুকনো পাতাটি মাথায় দিলে সুখ-সম্পত্তি বৃদ্ধি হয়।

৪. ঝুরঝুরে পাতা মাথায় দিলে মণিমুক্তার ঝুড়ি পায়।

৫. কচি পাতাটি মাথায় দিলে কমল-সম পুত্র কোলে পায়।

তারপর একঘটি জল অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় ঢেলে নমস্কার করতে হয়। অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় জল ঢালবার সময় বলবে:

উযাইতে পারিলে ইন্দ্রের শচী।

না পারিলে ভগবানের দাসী।।

অশ্বত্থ পাতা ব্রত সমাপ্ত।

গো-কল ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রতচারিণী—চৈত্র মাসে চড়ক সংক্রান্তির দিন থেকে সারা বৈশাখ মাস রোজ গো-কল ব্রত করতে হয়। পাঁচ বৎসর বয়সে কুমারী এই ব্রত নেবে, চার বৎসর পালনের পর ব্রত উদযাপন করবে।

ব্রত-দ্রব্যাদি—গো-কল ব্রতের জন্য চাই:

১. দূর্বা ঘাস তিন আঁটি, ২. পাকা কলা তিনটি, ৩. পাখা একখানি, ৪. একঘটি জল, ৫. ছোটো একটি বাটিতে কিছুটা সরষের তেল, ৬. কিছুটা হলুদ বাটা, ৭. একটু সিঁদুর গোলা, ৮. একটু চন্দন, ৯. একখানি আরশি, ১০. একখানি চিরুনি।

ব্রত-অনুষ্ঠান: কুমারী গাই-গোরুর শিঙে তেল মাখিয়ে মাথায় একটু জলের ছিটে দেবে। তারপর গোরুর কপালে দেবে হলুদ, সিঁদুর, আর চন্দনের ফোঁটা। চার পায়ে তেল-হলুদ মাখিয়ে জল দিয়ে পা ধুইয়ে দেবে, তারপর আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দেবে পা; চিরুনি দিয়ে গোরুর মাথা আঁচড়ে দিয়ে আরশিতে দেখাবে তার মুখ।

এভাবে গোরুর পরিচর্যা করার পর এক আঁটি দূর্বা ঘাসে একটি আস্ত কলা দিয়ে মন্ত্র পড়ে গোরুকে খেতে দেবে।

মন্ত্র:

গো-কল গোকুলে বাস।
গোরুর মুখে দিয়ে ঘাস
হয় যেন মোর স্বর্গে বাস।।

এইভাবে তিন আঁটি দূর্বা ঘাস আর তিনটি কলা তিনবার মন্ত্র পড়ে খাওয়ানোর পর গোরুকে পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বলবে:

মন্ত্র:

রোগ-শোক দূর হোক
কীট-পতঙ্গ দূর হোক।
মশা-মাছি দূর হোক।।
তোমাকে ঘুরিয়ে পাখা
আমার হাতে হোক সোনার শাঁখা।।
তারপর গোরুকে নমস্কার করবে।

উদযাপন দ্রব্য: গো-কল ব্রত উদযাপনের সময় চাই:

১. সোনার শিং দুইটি, ২. রূপার খুর চারটি, ৩. কাপড় একখানি, ৪. লাঠি একগাছা, ৫. ছাতা একটি। কাপড়, লাঠি, আর ছাতা পাবে রাখাল। শিং আর খুর পাবে ব্রাহ্মণে।

গো-কল ব্রত সমাপ্ত।

পৃথিবী ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রতচারিণী—পৃথিবী ব্রত করে চৈত্র সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ সংক্রান্তি পর্যন্ত রোজ। পাঁচ বৎসরে আরম্ভ করে নয় বৎসর বয়সে ব্রত উদযাপন করাই প্রশস্ত। তবে এ বিষয়ে খুব বাঁধাবাঁধি নেই। উদযাপনের সময় চাই সোনার পদ্মপাতা। ব্রাহ্মণভোজনের পর দক্ষিণার সঙ্গে ব্রাহ্মণ তা পেয়ে থাকেন। অভাবে দাম ধরে দিতে হয়।

ব্রত-অনুষ্ঠান: পিটুলি দিয়ে মাটিতে আঁকবে পদ্মের একটি ঝাড়; তার মাঝখানে থাকবে ফোটা শতদল পদ্ম। সেই ফোটা শতদল পদ্মের উপরে আঁকবে পৃথিবী—যেন পৃথিবীকে বসানো হয়েছে শতদলের উপর।

তারপর ছোটো শাঁখের মধ্যে, কিংবা ছোটো ছোটো বাটিতে মধু, দুধ, আর ঘি একসঙ্গে নিয়ে সেই আলপনার সুমুখে পূর্বমুখ কি উত্তরমুখ হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে মন্ত্র পড়ে আলপনার উপর ঢেলে দেবে সে-সব। তিনবার মন্ত্র পড়ে তিনবার ঢালবে। কোথাও কোথাও মধু, দুধ, ঘি-এর বদলে দেয় ফুল আর দূর্বা। মন্ত্র:

এসো পৃথিবী বসো পদ্মে,
শঙ্খচক্র ধরি হস্তে।
খাওয়াব ক্ষীর মাখন ননী,
আমি যেন হই রাজার রানি।।

পৃথিবী ব্রত সমাপ্ত।

যমপুকুর ব্রত

কার্তিক মাসের ব্রত

ব্রতকাল ও ব্রত উদযাপন—আশ্বিন সংক্রান্তি (আশ্বিন মাসের শেষ দিন), অথবা কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকে কার্তিক সংক্রান্তি পর্যন্ত রোজ যমপুকুর ব্রত করতে হয়। চার বৎসর পরে হয় ব্রত উদযাপন। ব্রত উদযাপনের সময় চারজন ব্রাহ্মণকে ভোজন করিয়ে দক্ষিণা দিতে হয়, আর এক কাহন কড়ি দিয়ে ব্রত উদযাপন করে সেই কড়ি দিতে হয় ভাইকে। কোথাও কোথাও রাখালকেও দেয় কাপড়, জুতো, ছাতা, পাঁচনবাড়ি, আর দশকড়া কড়ি।

ব্রত-অনুষ্ঠান: বাড়ির উঠোনে, কী বাগানে, নয় তো পুকুরপাড়ে কুমারী নিজ হাতের একহাত চৌকো পুকুর কাটবে। চারপাশে করবে চারটি ঘাট। পুকুরের মাঝখানে পুঁতে দেবে কচুগাছ, হলুদগাছ, হিংচে, কলমি আর সুষনি গাছ। (কলাগাছ, মানকচুগাছ, আর তুলসীগাছও দেওয়া যায়) তারপর জল ঢেলে পুকুর ভরাবে। ছোটো-ছোটো পুতুল গড়িয়ে পুকুরের চারধারে বসাবে সে সব,—দক্ষিণদিকের ঘাটের উপর থাকবে যমরাজ, যমরানি আর যমের মাসির পুতুল; উত্তরদিকের ঘাটের উপর থাকবে মেছো আর মেছুনি যেন মাছ ধরছে এই রকমের পুতুল; পূর্বদিকের ঘাটের উপর পুতুল থাকবে যেন ধোপা আর ধোপানি কাপড় কাচছে আর শেকো-শেকোনী আছে বসে; পশ্চিমদিকের ঘাটে থাকবে কাক, বক, চিল, কুমির, কচ্ছপ, আর হাঙরের পুতুল।

তারপর ব্রত অনুষ্ঠানের সময় পুকুরের চারকোণে পুঁতে দেবে চারকড়া কড়ি, চারখানা হলুদ, আর চারটি সুপারি। পুকুরপাড়ে জ্বেলে দেবে প্রদীপ (কোথাও কোথাও প্রদীপ দেয় না)।

এবার পুকুরপাড়ে পূর্বমুখ কি উত্তরমুখ হয়ে বসে পূজা আরম্ভ করবে।

পূজার মন্ত্র

১. পুকুরে জল দেবার মন্ত্র:

সুষনি কলমি লহ লহ করে।
রাজার বেটা পক্ষী মারে।।
মারণ পক্ষী সুকোর বিল।
সোনার কৌটো রুপোর খিল।
খিল খুলতে হাতে গেল ছড়।
আমার বাপ-ভাই হোক লক্ষেশ্বর।।

২. গাছে জল দেবার মন্ত্র:

কালো কচু সাদা কচু লহ লহ করে।
রাজার বেটা পক্ষী মারে।।
মারণ পক্ষী সুকোর বিল।
সোনার কৌটো রুপোর খিল।।
খিল খুলতে হাতে গেল ছড়।
আমার বাপ-ভাই হোক লক্ষেশ্বর।।
লক্ষ লক্ষ দিলে বর।
ধনে-পুত্রে বাড়ুক ঘর।।

এবার মন্ত্র পড়ে ফুল দিয়ে একে একে সব কয়টি পুতুলের—এমনকী কাক, বক, চিলেরও পুজো করবে।

৩. ফুল দেবার মন্ত্র:

যমরাজা সাক্ষী থেকো যম-পুকুরটি পুজি।
যমরানি সাক্ষী থেকো যম-পুকুরটি পুজি।
যমের মাসি সাক্ষী থেকো যম-পুকুরটি পুজি।।
যম-পুকুর পুজ্যন।
সোনার থালে ভুজ্যন।।
সোনার থালে ক্ষীড়ের নাড়ু।
শাঁখার উপর সুবর্ণের খাড়ু।।
চারিকোণা পুকুরটি টুবু টুবু করে
ভবানীর পাখিটি আনাগোনা করে।।
এ পুকুরটি কী?
ভাগ্যবতী পুজেছিল জল ঘটিটি দি।।

যমপুকুর ব্রত সমাপ্ত।

যমপুকুর ব্রতকথা

এক ছিল বুড়ি। তার ছিল এক ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল—আর কারও সঙ্গে নয়—একেবারে সাক্ষাৎ যমরাজের সঙ্গে। শ্বশুরবাড়ি তার যমপুরী। যমরাজ সেই যে তাকে বিয়ে করে নিয়ে গেলেন, আর মর্ত্যে বাপের বাড়ি পাঠালেন না।

বুড়িকে কে আর মেয়ের মতো যত্নআত্তি করে? বুড়ি তাই ছেলের বিয়ে দিয়ে টুকটুকে বউ ঘরে আনলে। যেমন সুন্দরী বউ, তেমনি তার মিষ্টি স্বভাব। রাতদিন প্রাণপাত করে বউ শাশুড়ির সেবা করে। সংসারের কাজেকর্মেও বউ যেন দশভুজা। কুটোগাছটি নড়তে পায় না।

দেখতে দেখতে কার্তিক মাস এসে পড়ল। উঠোনের মাঝখানে পুকুর করে বউ বসল পুজোয়। তাই না দেখে শাশুড়ির মনে জাগল সন্দেহ—বউ বুঝি কি তুকতাক করতে বসেছে। ভাবলে মনে মনে—তাই যদি না হবে তবে কী গুণে কাক, চিল অবধি বউ-এর এমন বশ হয়েছে। বাজখাঁই গলায় হাঁকলে তখন বুড়ি, ‘ওলো, ও পোড়ারমুখী, কী হচ্ছে ও? কী হিল বিলচ্ছিস, কী বিড় বিড়চ্ছিস, শুনি? বলি আমায় খাবি, না আমার মেয়েকে খাবি? বল দেখি, লা পোড়ারমুখী ডাইনি?’

বউ উত্তর দিলে, ‘মা যমপুকুর ব্রত করছি।’

যমপুকুর ব্রত! জন্মেও শোনেনি বুড়ি সে কথা। রেগে আগুন তেলে বেগুন বুড়ি ছুট্টে এসে বউকে মারলে এক লাথি, দিলে ছাই-পাঁশ দিয়ে পুকুর বুঁজিয়ে, ধমক দিয়ে বললে, ‘খবরদার’! ফের যদি দেখি তবে তোরই একদিন কি আমারই একদিন।’

হাপুস নয়নে কেঁদে যমরাজকে সাক্ষী মেনে বউ বললে, ‘হে ধর্মরাজ! তুমি সাক্ষী রইলে—আমি এক বছর যমপুকুর ব্রত করলুম।’

এমনি করে দিন যায়। দেখতে দেখতে বছর ঘুরে আবার আসে কার্তিক মাস। বউ কী করে? শাশুড়ির ভয়ে পুকুর পাড়ে গিয়ে ছোট্ট পুকুর কাটে; কলাগাছের আড়ালে লুকিয়ে বসে সেখানে করে যমপুকুর ব্রত। একটি একটি করে শেষ হয়ে আসতে থাকে কার্তিক মাসের দিনগুলো।

বুড়ির মাথায় বুঝি টনক নড়ে। একদিন বউকে ডেকে সাড়া না পেয়ে লাঠিগাছায় ভর দিতে দিতে বুড়ি এসে হাজির হয় পুকুরপাড়ে। সেখানে এসে দেখে বউ কলাগাছের আড়ালে বসে কী যেন করছে একমনে। সন্দেহ জাগে বুড়ির মনে। কিছু না বলে চুপি চুপি গিয়ে বউ-এর পেছনে লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়ায় বুড়ি; দেখে—বউ মন্ত্র পড়ে কাক, বক, চিল, কত কীসের পায়ে ফুল দিচ্ছে। সব দেখে শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে বুড়ি, হাঁক দিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ লা, সর্বনাশী! হচ্ছে কী ও সব? কী হিল বিলচ্ছিস? কী বিড় বিড়চ্ছিস? বলি—আমায় খাবি, না আমার ছেলেকে খাবি?’

ভয়ে ভয়ে মুখ তুলে বউ বলে, ‘কিচ্ছু নয়, মা, যমপুকুর ব্রত করছি।’

আরও রেগে যায় বুড়ি। বউকে মারে লাথি; জঞ্জাল দিয়ে, থুতু ফেলে পুকুর বুঁজিয়ে দেয়। তারপর রাগে গরগর করতে করতে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে ফিরে আসে ঘরে।

হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে মাথা খুঁড়ে যমরাজকে ডেকে বলে বউ, ‘হে ধর্মরাজ। সাক্ষী রইলে তুমি—এই দুবছর আমি যমপুকুর ব্রত করলুম।’

এইভাবে কাটতে থাকে দিন। দেখতে দেখতে বছর ঘুরে আশ্বিন গিয়ে ফের আসে কার্তিক মাস। বউ এবার লুকিয়ে হেঁসেলে উনুনের পাশে বসে যমপুকুর ব্রত করতে লাগল। কার্তিক মাসও শেষ হয় হয়, আর মোটে কটা দিন বাকি, এমন সময় একদিন বুড়ি সব দেখতে পেয়ে বউকে এই মারে তো এই মারে! তারপর অকথ্য কুকথ্য বলতে বলতে লাথি মেরে পুকুর ভেঙে বুঁজিয়ে দেয়।

তিন তিন বছর এই অলক্ষুণে কান্ড! বউ-এর চোখের জল আর বাঁধ মানে না। হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে গলায় আঁচল জড়িয়ে জোড়হাত করে বউ বলে, ‘হে ধর্মরাজ! তুমি সাক্ষী রইলে—আমি তিন বছর যমপুকুর ব্রত করলুম।’

এমনি করে দেখতে দেখতে সেবছরও গেল কেটে; আবার এল কার্তিক মাস। নির্জন জায়গা খুঁজে বাড়ির পেছন দিকে ছাইগাদার ধারে এসে বউ পুকুর করলে সেখানে বসে করতে লাগল যমপুকুর ব্রত।

কার্তিক মাসের সঙ্গে সঙ্গে বুড়ির মাথায়ও টনক নড়েছে। বাড়ির চারদিক খুঁজে দেখলে বুড়ি—না:, এবার কোথাও আর পুকুর হয়নি। হয়নি যাক, বাঁচা গেছে! স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললে বুড়ি। কিন্তু তবুও কেন মনের খুঁতখুতুনি যায় না? অবাক হয়ে ভাবে বুড়ি, আর মনে মনে শাপশাপান্ত করে বউ-এর উদ্দেশ্যে।

মাস শেষ হতে আর একদিন মোটে বাকি। হঠাৎ বুড়ির চোখে পড়ল বউ ফুল, জল নিয়ে চলেছে কোথায়। চুপি চুপি তার পেছু নিলে বুড়ি; এসে দেখলে বউ ছাইগাদার ধারে বসে পুকুর করে পুজো করছে।

আর যায় কোথা! লাঠি ঠকঠক করতে করতে তেড়ে এসে বউকে মারলে এক লাথি, শুরু করে দিলে বউ-এর বাপ-মা তুলে গালাগাল, লাথি মেরে পুকুর ভেঙে ছাই দিয়ে তা বুঁজিয়ে দিয়ে রাগে গজর গজর করতে করতে ফিরে এল ঘরে।

বুড়ো হাড়ের কী তেজ! বেদম লেগেছিল বউ-এর। যন্ত্রণায় কাতরে উঠে কাঁদতে কাঁদতে পুকুর ভাসিয়ে দিলে বউ বেচারা। অনেকক্ষণ কাঁদবার পর উঠে বসে গলায় আঁচল দিয়ে কাতরসুরে বললে বউ, ‘হে ধর্মরাজ! সাক্ষী রইলে তুমি—চার বছর যমপুকুর ব্রত করে আজ ব্রত উদযাপন করলুম আমি।’

তারপর নমস্কার করে গায়ের মাথার ছাই ঝেড়ে ফেলে আস্তে আস্তে ঘরে ফিরে এল সে। দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে এইভাবে হল তার ব্রত উদযাপন।

তারপর একে একে কেটে গেল কয়েকটা বছর। বুড়িকে ধরলে কঠিন রোগে। বেটা আর বেটার বউ-এর সেবাশুশ্রূষার তিলমাত্র বিরাম নেই। খবর পেয়ে যমপুরী থেকে মেয়েও এসেছে ছুটে। রাতদিন চলছে ঝাড়-ফুঁক, টোটকা-টাটকা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না—একদিন দুপুরবেলা বুড়ি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে চলে গেল।

বাড়িময় উঠল কান্নার রোল। পাড়াপড়শিরা সব ছুটে এল। সবাই বোঝাতে লাগল—‘উপযুক্ত বয়সে গেছেন, সেজন্যে শোক করতে নেই; এখন পরলোকে তাঁর তৃপ্তির জন্যে শ্রাদ্ধ শান্তির ব্যবস্থা করো।’

এক মায়ের এক ছেলে, ঘটা করে মায়ের শ্রাদ্ধ করলে। এক মায়ের এক মেয়ে, মায়ের শ্রাদ্ধশান্তির পর শ্বশুরবাড়িতে ফিরে গেল। তবুও বেটার বউ-এর চোখের জল বাঁধ মানে না। কেন তা ধি সে নিজেই জানে?

মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যমপুরী। সেখানে গিয়ে পৌঁছুতেই যমরাজ তাকে ডেকে বললেন, ‘দেখো, তোমার মায়ের অসুখের সময় অনেক দিন তুমি মর্ত্যে তোমার বাপের বাড়িতে ছিলে; তাই এখন দিন কতক যমপুরীর দক্ষিণ দুয়োরের দিকে যেও না,—আর তিনদিকে আগের মতোই স্বচ্ছন্দে বেড়িয়ে বেড়িয়ো, তাতে কোনও বাধা নেই।’

বুড়ির মেয়ে যমরাজের বউ এ কথা শুনে ঘাড় তুলে একবার স্বামীর চোখে চোখে চাইলে, তারপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মাটির দিকে চেয়ে আস্তে করে একবার মাথা নাড়লে—সায় দিলে, কী দিলে না ঠিক বুঝতে পারা গেল না।

এমনি করে দু-চার দিন কেটে গেল। বুড়ির মেয়ের মনে থেকে থেকে জাগতে লাগল সেই একই প্রশ্ন—যমরাজ কেন দক্ষিণ দুয়োরের দিকে যেতে বারণ করলেন। শেষে আর কৌতূহল দমন করতে পারল না সে,—একদিন লুকিয়ে দেখতে পেল কী আছে যমপুরীর দক্ষিণ দুয়োরের দিকে।

তখন বিকেলবেলা। বুড়ির মেয়ে যমরাজের বউ যেই না যমপুরীর দক্ষিণ দুয়োর পার হয়েছে অমনি তার চোখে পড়ল এক ভীষণ নোঙরা কৃমিকুন্ড, কানে এল সেখানকার লক্ষ লক্ষ পাপীর বুকফাটা কান্না আর কাতর আর্তনাদ! শিউরে উঠে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে সরে যাবে সে এমন সময় থমকে দাঁড়াল সে চেনা গলার আওয়াজ পেয়ে। স্পষ্ট শুনতে পেল তার মা তার ভাইয়ের নাম ধরে চেঁচিয়ে বলছে, ‘ওরে, আমায় বাঁচা! এ নরককুন্ডে পচে মরছি আমি! বাঁচা, আমায় বাঁচা! আর কখখনো এমন কাজ করব না।’

ভালো করে নিরীখ করে দেখলে বুড়ির মেয়ে—কাতারে কাতারে পাপী হাবুডুবু খাচ্ছে সেই ভয়ানক নরককুন্ডের মধ্যে। কাৎরে কাৎরে ডাকছে এই ভাবে, আর ঠিক তার পরমুহূর্তেই ভীমের মতো জোয়ানমর্দ যত যমদূতের ডাঙস খেয়ে তলিয়ে যাচ্ছে সে নরককুন্ডের তলায়! আবার খাবি খেয়ে যেই না মাথা তুলে চেঁচিয়েছে অমনি যমদূতেরা তাদের মাথায় দুম করে মেরেছে ডাঙস, আর অমনি তলিয়ে যাচ্ছে ডাঙস খেয়ে। একতিল বিরাম নেই এই ওঠা-নামার, একতিল বিরাম নেই তাদের কাৎরানির!

এই ভয়ানক কান্ড দেখেশুনে হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধুলো বুড়ির মেয়ের। মায়ের জন্যে প্রাণ করতে লাগল আকুলি বিকুলি। কোনোরকম পা টেনে টেনে চলতে চলতে ফিরে এল সে যমপুরীর ভেতর। বিছানায় শুয়ে ছটফট করে কাটাল সারারাত।

পরদিন দুপুরবেলা যমরাজ যখন খেতে বসেছেন তখন আস্তে আস্তে এসে গলায় আঁচল দিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে যোড়হাতে সামনে দাঁড়াল সে। বউ-এর চোখে জল দেখে যমরাজ অভয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তাকে, ‘তোমার চোখে জল কেন? কী দুঃখ তোমার, নির্ভয়ে বলো আমায়।’

ধরা গলায় ধীরে ধীরে নিবেদন করলে সে স্বামীর পায়ে, ‘তোমার পায়ে অপরাধিনী আমি। আমায় ক্ষমা করো। তুমি আমায় দক্ষিণ দুয়োরের দিকে যেতে বারণ করেছিলে। তাইতেই বুঝি কৌতূহল বাঁধ মানল না আমার, সেখানে গেলুম আমি। গিয়ে যা দেখলুম তা বলতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে আমার! দেখলুম দূতেরা সব আমার মায়ের মাথায় ডাঙস মেরে মেরে বারবার তাঁকে ডুবিয়ে দিচ্ছে নরককুন্ডের মধ্যে, আর পর মুহূর্তেই খাবি খেয়ে মা আমার মাথা উঁচিয়ে কাৎরে চেঁচাচ্ছেন—‘ওরে, আমায় বাঁচা বাপধন! আর কখনো এমন পাপ করব না।’ দয়া করে আমায় বলে দাও কী করলে এ নরকযন্ত্রণা থেকে উদ্ধার পাবেন আমার মা। বলে দাও গো, পায়ে পড়ি তোমার।’ বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে উঠল বুড়ির মেয়ে যমরাজের বউ।

বউয়ের কান্নায় নরম হয়ে পড়লেন যমরাজ। ভেবেচিন্তে বললেন, ‘তোমার মা আমার শাশুড়ি। তাঁকে নরক যন্ত্রণা দেওয়া কি আমার সাধ? কিন্তু কী করি? আমি যে ধর্মরাজ। ধর্মের বিধির একচুল এদিক ওদিক করি সে সাধ্য আমার নেই। তোমার মা তাঁর পাপের ফলভোগ করছেন।’

বউ জিজ্ঞেস করলে, ‘পাপের ফলভোগ থেকে উদ্ধারের উপায় কী?’

যমরাজ বললেন, ‘উপায়? উপায় হচ্ছে পুণ্যকর্মের অনুষ্ঠান।’

বউ জিজ্ঞেস করলে, ‘কোন পুণ্যকর্মের অনুষ্ঠানে মা উদ্ধার পাবেন বলে দাও। যত কঠিনই হোক আমি তা করবই।’

যমরাজ বললেন, ‘দেখো, তোমার বউ ঠাকরুণ বিয়ের কনে হয়ে এসে বছর বছর যমপুকুর ব্রত করতেন, আর তোমার মা তাঁকে লাথি মেরে গালাগাল করে থুতু, জঞ্জাল—এসব ফেলে যমপুকুর বুঁজিয়ে দিতেন, ব্রত করে দিতেন লন্ডভন্ড। সেই পাপে তাঁর এই সাজা।’

এ কথা শুনে বউ স্বামীর পা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘একটা কিছু উপায় তোমায় করতেই হবে, নইলে এ মুখ আর তোমায় দেখাব না।’

যমরাজ তখন ভেবেচিন্তে বললেন, ‘দেখো, তোমার বউ-ঠাকরুণ যদি তোমার মায়ের নামে সঙ্কল্প করে যমপুকুর ব্রত করেন তবেই তোমার মায়ের উদ্ধার হবে। কিন্তু তোমার মা মিছিমিছি তাঁকে যে কষ্ট দিয়েছেন তাতে তিনি কি তোমার মায়ের নামে সঙ্কল্প করে ব্রত করতে রাজি হবেন? দেখো চেষ্টা করে।’

এ কথা শুনে বুড়ির মেয়ের বড়ো ভাবনা হল—বউ-ঠাকরুণ যদি রাজি না হয়!

তার মনের কথা আঁচ করে যমরাজ বললেন, ‘দেখো, একটা উপায় হতে পারে। তুমি বাপের বাড়ি গিয়ে বউ-ঠাকরুণের সেবাশুশ্রূষা করে তাঁর সঙ্গে খুব ভাব জমিয়ে বসো। তিনি এখন পোয়াতি। দশমাসে প্রসব-বেদনা হলে তাঁকে যমপুকুর ব্রত করতে বলবে। তাতে তিনি রাজি হবেন মনে হয়।’

খানিকটা আশ্বস্ত হল বুড়ির মেয়ে যমরাজের বউ। পরক্ষণেই আবার মনে উদয় হলো এক ভাবনা। জিগ্যেস করলে সে স্বামীকে, ‘কিন্তু আমার যত্ন-আত্তিতেও যদি বউ-ঠাকরুণ রাজি না হয়? যে জ্বালা জ্বালিয়েছে তাকে মা!’

যমরাজ বললেন, ‘সেজন্যে ভেবো না। প্রসব-বেদনা উঠলেই আমি গিয়ে বউ-ঠাকরুণকে ভর করে থাকব; ব্রত শেষ না হওয়া অবধি তাঁর পেটের ছেলে বার হবে না। তিনি ব্রত শুরু করলেই তোমার মা নরককুন্ড ছেড়ে উঠতে থাকবেন, ব্রত শেষ হলেই তাঁর উদ্ধার পূর্ণ হবে, আর সঙ্গে সঙ্গে বউ-ঠাকরুণের কোল-আলো-করা চাঁদপানা ছেলে হবে।’

এ কথায় সম্পূর্ণ আশ্বস্ত হয়ে বুড়ির মেয়ে যমরাজের বউ শুভক্ষণ দেখে বাপের বাড়ি যাত্রা করলে। সেখানে এসে ভাইকে সে বললে, ‘বউ-ঠাকরুণ একা মানুষ, তায় পোয়াতি; তাই এলুম তোমাদের দেখাশুনো করতে।’ তারপর সংসারের ভার নিজের হাতে নিয়ে, বউকে সে খুব যত্ন-আত্তি করতে লাগল। বউকে আর নিজ হাতে কুটোগাছটিও নড়াতে হয় না, সব কাজই করে ননদ। ননদের যত্নে বউ ভারি খুশি হল।

পাঁচ মাস পড়তেই ননদ দিলে বউয়ের কাঁচা সাধ, আট মাসেতে দিলে ভাজা সাধ, তারপর নয় মাসেতে খুব ধূমধাম করে পঞ্চামৃত সাধ দিলে।

দশমাস দশদিনে বউয়ের প্রসব-বেদনা দেখা দিল। এতদিনে ননদ পাড়লে তাঁর কাছে আসল কথা। তাকে খুব আদর করে বললে, ‘দেখ, বউ, তুই মার নামে সঙ্কল্প করে চারটি যমপুকুর কর।’

ননদের কথায় বউ মুখ ভার করে বললে, ‘মা গো মা, ফের যমপুকুর করব! তুমি তো জানো না, ঠাকুরঝি, যমপুকুর করার জন্যে কী কষ্ট আমায় দিয়ে গেছেন মা। সে কি ভোলবার জিনিস, ঠাকুরঝি? মর্মে মর্মে গাঁথা হয়ে গেছে সে সব—চিরজন্মের মতো। যখনই ব্রত করতে বসতুম, মা এসে থুথু দিয়ে, জঞ্জাল দিয়ে…’

তাড়াতাড়ি বউয়ের মুখ চাপা দিয়ে ননদ বললে, ‘সব জানি, বউ, সব জানি। কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেছে, তা নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ কী বল? মা তো আর ইহলোকে নাই। এখন যদি তুই…’

ননদের কথা শেষ করতে দেয় না বউ। মুখ ঘুরিয়ে বলে, ‘তা হয় না, ঠাকুরঝি।’

অনেক সাধ্যসাধনা করে বুড়ির মেয়ে, কিন্তু বউয়ের সেই এককথা—‘তা হয় না, ঠাকুরঝি।’

দু-চোখে অন্ধকার দেখে বুড়ির মেয়ে, মনে মনে স্মরণ করে স্বামীকে। টনক নড়ে যমরাজের। হঠাৎ ব্যথা ওঠে বউয়ের, দেখতে দেখতে আসতে শুরু করে জোর ব্যথার পর জোর ব্যথা, তবু ছেলে বেরোয় না পেট থেকে, ব্যথায় কাঁদতে থাকে বউ। ননদ বলে, ‘তুই যমপুকুর কর, বউ; এক্ষুণি ছেলে হবে।’

যমপুকুর! রাগে মুখ ঘুরিয়ে নেয় বউ, তেজ করে বলে, ‘কখখনো নয়, প্রাণ গেলেও নয়।’

ব্যথা বেড়েই চলে। ধাক্কায় ধাক্কায় ব্যথা, জোর জোর ব্যথা। মুষড়ে পড়তে থাকে বউ। ‘যমপুকুর কর, বউ! যমপুকুর কর,’—বারবার বলতে থাকে ননদ। শুনেই রাগে মুখ ঘোরায় বউ, ফের ককিয়ে ওঠে ব্যথার ধাক্কায়। ‘মিছে কেন কষ্ট পাচ্ছিস, বউ?’—বুঝিয়ে বলে ননদ, ‘পুজো কর, এক্ষুণি খালাস হবি, এক্ষুনি ছেলে হবে।’

যন্ত্রণায় কাটা ছাগলের মতো ছটফট করছে তখন বউ। ননদের কথায় এবার ধড়মড় করে উঠে পড়ে, তাড়াতাড়ি উঠোনে এসে করে চারটে পুকুর, শাশুড়ির নামে করে যমপুকুর ব্রত।

যেমনি ব্রত শেষ হয় অমনি আসে যেন এক জোর ধাক্কা, ইনিয়ে বিনিয়ে যায় বউয়ের সারাশরীর, চাঁদের মতো কোল আলো করা ছেলে হয় বউয়ের, সুখের আবেশে ঘুমের পাহাড় ভেঙে পড়ে তার চোখদুটিতে, তারই মধ্যে কানে আসতে থাকে ছেলের ওঁয়া ওঁয়া কান্নার মধুর রব।

এদিকে নরককুন্ড থেকে বউয়ের শাশুড়িও পায় মুক্তি, মর্ত্যের দিকে চাইতেই চোখ পড়ে তার নাতির মুখেরপরে, নাতির মুখ দেখে হাসতে হাসতে স্বর্গে উঠে যায় বুড়ি।

উলু দিয়ে ওঠে বুড়ির মেয়ে যমরাজের বউ।

পাড়াপড়শিরা সব আসে ছুটে। ছেলে দেখে পঞ্চমুখে করতে থাকে সুখ্যাতি।

প্রাণপাত করে বউয়ের সেবা করে ননদ। দেখতে দেখতে এসে পড়ে ষষ্ঠীপুজোর দিন। ঘটা করে হয় ষষ্ঠীপুজো। দাদা-বউদিকে প্রণাম করে বুড়ির মেয়ে ফিরে যায় তার শ্বশুরবাড়ি।

তাই কথায় বলে যমপুকুর ব্রত করলে যমের তাড়না সইতে হয় না; শ্বশুর-শাশুড়ি জল পায়, হাসতে হাসতে স্বর্গে যায়।

যমপুকুর ব্রতকথা সমাপ্ত।

সেঁজুতি ব্রত

ব্রতকাল: সেঁজুতি ব্রত আরম্ভ হয় কার্তিক সংক্রান্তির দিন সকালবেলায়। তারপর অঘ্রান মাসের শেষ পর্যন্ত প্রত্যহ বৈকালে ব্রত পালন করে যেতে হয়। চার বৎসর এভাবে ব্রত পালন করার পর হয় ব্রত উদযাপন।

ব্রত উদযাপন: ব্রত উদযাপনের সময় চাই তিন জোড়া কাপড়, তিন জোড়া চাদর, আর মধুপর্কের বাটি তিনটি। তাতে থাকবে দই, মধু, চিনি, দুধ, ঘি আর চন্দন। তিনজন ব্রাহ্মণকে পরিতোষের সঙ্গে ভোজন করিয়ে, প্রত্যেককে দক্ষিণার সঙ্গে এক-এক জোড়া কাপড়-চাদর আর এক-একটি মধুপর্কের বাটি দান করতে হবে।

ব্রত অনুষ্ঠান: ব্রত অনুষ্ঠানের জন্যে দালানে, নয়তো বাড়ির উঠোনে, কী ঘরের ছাদে পিটুলির আলপনা দিতে হবে। আলপনায় অনেক কিছু আঁকা যায়, যেমন—দোলা, কোঁড়া, শিব, পুতুল, ষোলঘর, গোয়াল, তেকোণা প্রদীপ, বেনা গাছ, ঢেঁকি, রান্নাঘর, গোলা, পাকা পান, কাজল-লতা, শাঁখ, পাখি, খাট-পালঙ্ক এবং এই রকমের আরও অনেক জিনিস। তবে যে কয়টি জিনিস না আঁকলেই নয় সে কয়টি হচ্ছে শিব, দুটি পুতুল, কোঁড়া, দোলা, এইসব। মূল আলপনা হবে এই রকমের:

ঘট স্থাপন করতে হবে ওপরে শিব আর নীচে পুতুলের মাঝখানে চৌকো জায়গাটিতে অর্থাৎ সেঁজুতির কোঁড়ার ওপরে।

ঘটের সামনে জ্বেলে দেবে তেকোণা প্রদীপ। তারপর মন্ত্র পড়ে দূর্বা দেবে:

সাঁঝ ভোজন সেঁজুতি
ষোলো ঘরের ষোলো বতি
তার মধ্যে আমি এক বতি
বতি হয়ে মাগি বর
ধন পুত্রে বাড়ুক বাপ-মার ঘর।
আবার সাঁঝ ভোজন সেঁজুতি…ধন পুত্রে বাড়ুক আমার বরের ঘর।

এইভাবে সেঁজুতির পুজো হলে পর গঙ্গা-যমুনার পুজো করবে। গঙ্গা- যমুনা আলপনা দিয়ে সেই ঘরটি ধরে মন্ত্র পড়ে দূর্বা দেবে।

গঙ্গা যমুনা পুজোর মন্ত্র:

গঙ্গা যমুনা যোড়া হয়ে,
সাত ভাইয়ের বোন হয়ে,
সাবিত্রী-সমান হয়ে,
নিসোতা নিলবতি
সাত ভাইয়ের বোন পুত্রবতী।
গঙ্গা যমুনা পূজ্যন,
সোনার থালে ভুজ্যন।।
সোনার থালে ক্ষীরের নাড়ু,
শাঁখের ওপর সুবর্ণের খাড়ু।।
তারপর করবে চন্দ্র-সূর্য পুজো।

চন্দ্র সূর্য পুজোর মন্ত্র:

চন্দ্র সূর্য পূজ্যন,
সোনার থালে ভুজ্যন।
সোনার থালে ক্ষীরের নাড়ু
শাঁখের উপর সুবর্ণের খাড়ু।।

তারপর হাট, ঘাট, গো-গোয়ালের পুজো করতে হয়।

মন্ত্র:

হাট ঘাট পূজ্যন ইত্যাদি।

গোল গঙ্গা পুজ্যন ইত্যাদি।

তারপর সংসারের সবকিছুকে স্মরণ করে করজোড়ে বলতে হয়:

বেণা বেণা বেণা, আমার ভাই গাঁয়ের সোনা।
সোনা সোনা ডাক পাড়ে, গা গুচি গুয়ো পড়ে।
আমার ভাই চিবিয়ে ফেলে, অন্যের ভাই কুড়িয়ে খায়।।
শর শর শর, আমার ভাই গাঁয়ের বর, আমার ভাই লক্ষেশ্বর।
লক্ষেশ্বর লক্ষেশ্বর ডাক পাড়ে, গা গুচি গুয়ো পড়ে।
আমার ভাই চিবিয়ে ফেলে, অন্যের ভাই কুড়িয়ে খায়।।
সোনা পাখি ময়না, সতীন যেন হয় না
ঢেঁকি পড়ন্ত, গাই বিয়ন্ত, উনুন জ্বলন্ত।
সরু ধানে কালো পুতে
জন্ম যায় যেন এয়তে এয়তে।
কাজললতা কাজললতা বাসর ঘর
যাও গো মেলানি আনো গিয়ে বর
সব সপাতা পাকা পান
আমার স্বামী নারায়ণ
যখন যাবে রণে
থাকে যেন আমার কথাটি মনে।
কুঁচ কুঁচুতি কুচুই বন
কেন রে কুচুই এতক্ষণ।
ভাই এনেছে টাকার ছালা
তাই গুণতে এত বেলা।
শ্বশুর এনেছে টাকার ছালা
তাই গুণতে এত বেলা।
বর এনেছে টাকার ছালা
তাই গুণতে এত বেলা।
সাঁঝ পূজনী। সাঁঝ পূজনী।
তোমাকে দিলাম পিটুলির বালা,
আমি যেন পাই সোনার বালা।
অরুন্ধতী রাজ্যপতি
বের্ত করেন পার্বতী
বের্ত করলে কী হয়
নির্ধনের ধন হয়
অপুত্রের পুত্র হয়
সাত ভাইয়ের বোন হয়।
কোঁড়ার মাথায় দিয়ে ফুল
ঘর সংসার হুল থুল।
কোঁড়ার মাথায় দিয়ে ঘি
আমি হই রাজার ঝি।
কোঁড়ার মাথায় দিয়ে মৌ
আমি হই রাজার বৌ।
কোঁড়ার মাথায় দিয়ে ফাগ
আমি হই রাজার মাগ।

পুজো হয়ে গেলে দূর্বা কুড়োতে কুড়োতে মন্ত্র বলবে :

অরুণ ঠাকুর বরণে
ফুল ফুটেছে চরণে।
যখন ঠাকুর দেবেন বর
ফুল কুড়িয়ে যাব ঘর।

সেঁজুতি ব্রত সমাপ্ত।

তুঁষ-তুঁষুলি ব্রত

ব্রতকাল—অঘ্রান মাসের সংক্রান্তি থেকে আরম্ভ করে সারা পৌষ মাস ভোর রোজ তুঁষ-তুঁষুলি ব্রত করতে হয়। চার বৎসর পালন করার পর হয় ব্রত উদযাপন।

ব্রত উদযাপন—উদযাপনের সময় কোথাও কোথাও ব্রাহ্মণকে দিয়ে করানো হয় নারায়ণ-শিলার পুজো আর হোম। ষোড়শোপচারে পুজোই প্রশস্ত, অভাবে পঞ্চোপচারে পুজো করাও চলে। পুজোর পর ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে, ব্রাহ্মণকে দিতে হয় কাপড়, চাদর, আর একটি টাকা দক্ষিণা।

ব্রত অনুষ্ঠান—ব্রত অনুষ্ঠানের জন্যে চাই আলোচালের তুঁষ, এক রঙের কালো গাইয়ের গোবর, সরষে ফুল, আর দূর্বা। কোথাও কোথাও এসব জিনিসের উপর আবার দেয় মুলোর ফুল।

গোবরের সঙ্গে তুঁষ মিশিয়ে ভালো করে মাখবে, তারপর তা দিয়ে নাড়ু তৈরি করবে ছবুড়ি ছগণ্ডা অর্থাৎ ১৪৪টা। প্রত্যেকটি নাড়ুর মাথায় পাঁচগাছি করে দূর্বা গুঁজে দিয়ে, নাড়ুগুলো রাখবে একটা মালসায়। কোথাও কোথাও সেঁজুতির কিছু দুর্বা তুলে রাখার বিধি আছে; তা থেকে দেয় পাঁচগাছি দূর্বা।

নাড়ু তৈরির নিয়মও সব জায়গায় এক রকমের নয়—কোথাও নাড়ু করে ৩১টি, কোথাও ৬২টি, কোথাও বা ১৪৪টি।

পূব কী উত্তরমুখে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে পুজো করতে হয়। যারা ৩১টি নাড়ু করবে তারা রোজ একটি করে নাড়ু নিয়ে পুজো করবে। যারা ৬২টি নাড়ু করবে তারা পুজো করবে রোজ দুটি নাড়ু দিয়ে। আর যারা ১৪৪টি নাড়ু করবে তারা রোজ নেবে ৪টি করে নাড়ু। কোথাও কোথাও আবার শনি-মঙ্গলবারে ৬টি নাড়ু নিয়ে পুজো করে।

নাড়ু আর সরষের ফুল (এবং তার সঙ্গে মুলোর ফুলও) হাতে নিয়ে মন্ত্র পড়বে। মন্ত্র:

তুঁষ-তুঁষুলি কাঁধে ছাতি

বাপ মার ধন যাতাযাতি

স্বামীর ধন নিজবতী।

ঘর করব নগরে

মরব গিয়ে সাগরে

জন্মাব উত্তম ব্রাহ্মণ কুলে।

তুঁষুলি গো রাই, তুঁষুলি গো ভাই,

তোমায় বেত্ত করে কী বর পাই

ছবুড়ি ছগণ্ডা ক্ষীরের নাড়ু খাই।

বেত্ত করলে কী হয়

আড়ি মাপা সিঁদুর চায়।

দরবার আলো পুত পায়।

হেঁসেল আলো বউ পায়।

সভা আলো জামাই পায়।

মেঝে আলো ঝি পায়।

আলনায় কাপড় দলমল করে,

সিঁথে সিঁদুর ঝকমক করে,

মুখে পান টপ টপ করে।

গোয়ালে গোরু মরাই ধান

বৎসর বৎসর পুত্র দান।

হবে পুত্র মরবে না

চক্ষের জল পড়বে না।

স্বামীর কোলে পুত্র দিয়ে

মরণ হয় যেন একগলা গঙ্গাজলে।

পুজো হয়ে গেলে নাড়ুগুলো একটা আলাদা হাঁড়িতে তুলে রাখবে।

তারপর মন্ত্র পড়ে নমস্কার করবে। মন্ত্র:

গৌরী গো মা, তোমার কাছে

মাগি এই বর,

স্বামী-পুত্র নিয়ে যেন

সুখে করি ঘর।।

এইভাবে সারা মাস পুজোর পর পৌষ-সংক্রান্তির দিন ৪টি নাড়ু বেশি থাকবে সে কয়টিকেও ফুল-দুর্বা দিয়ে পুজো করে রেখে দেবে সেই আলাদা হাঁড়িটাতে।

তারপর সেই পৌষ-সংক্রান্তির দিনই চাল কী ময়দা দিয়ে ছোটো ছোটো ছবুড়ি ছগণ্ডা (১৪৪টি) নাড়ু করে, নতুন হাঁড়িতে দুধ দিয়ে হাঁড়ি উনুনে চড়িয়ে দেবে। দুধ ফুটলে নাড়ুগুলো দেবে তার মধ্যে ছেড়ে। বেশ সেদ্ধ হয়ে গেলে পর নাবিয়ে নেবে।

তারপর সুবিধেমতো সময় নাড়ু খাবে। খাবার সময় নাড়ুর হাঁড়ি থাকবে পেছন দিকে, তাতে দেবে আগুন। কোথাও কোথাও কুলকাঠের আগুন দেবার নিয়ম আছে।

নাড়ু খাবার সময় মন্ত্র বলবে। মন্ত্র:

তুঁষুলি গো রাই, তুঁষুলি গো ভাই,

তোমার দৌলতে আমি ছবুড়ি ছগণ্ডা খাই।।

খাওয়ার পর সেই আগুনের হাঁড়ি মাথায় করে নিয়ে গিয়ে পুকুরে (বা নদীতে) ভাসিয়ে দিয়ে বলবে। মন্ত্র:

তুঁষ-তুঁষুলি গেল ভেসে,

বাপ-মার ধন এল হেসে।।

তুঁষ-তুঁষুলি গেল ভেসে,

আমার স্বামীর ধন এল হেসে।।

তারপর আবার ‘গৌরী গো মা, তোমার কাছে মাগি এই বর’ ইত্যাদি মন্ত্র পড়ে নমস্কার করবে।

তুঁষ-তুঁষুলি ব্রত সমাপ্ত।

এয়ো-সংক্রান্তি ব্রত

বিয়ের বছরই চৈত্রমাসে চড়ক-সংক্রান্তির দিন এয়ো-সংক্রান্তি ব্রত নেওয়া প্রশস্ত। নিতান্তই কোনো কারণে অশক্ত হলে পর বছরও ব্রত নেওয়া যায়।

চড়ক-সংক্রান্তিতে ব্রত নিয়ে এক বছরকাল প্রতি সংক্রান্তির দিনই ব্রতের অনুষ্ঠান করতে হয়। বারোটি সংক্রান্তি এইভাবে করে, পর বছর বৈশাখের বিষ্ণুপদী সংক্রান্তিতে ব্রতের উদযাপন করতে হয়।

চড়ক-সংক্রান্তির দিন নিজের হাতে একজন সধবার পা ধুইয়ে, আলতা পরিয়ে, সুগন্ধ তেল দিয়ে তার চুল বেঁধে, কপালে সিঁদুরের টিপ দিয়ে, হাতে দু-গাছি রুলি ও একগাছি নোয়া পরিয়ে, তার সুমুখে খাবার, পানের খিলি, গোটা পান-সুপুরি আর সাধ্যমতো কিছু পয়সা রেখে প্রণাম করতে হয়।

দ্বিতীয় সংক্রান্তিতে দুজন, তৃতীয় সংক্রান্তিতে তিনজন—এইভাবে বারোটি সংক্রান্তিতে বারোজন এয়ো করতে হয়। ব্রত উদযাপনের দিন বারোটি সংক্রান্তির বারোজন আর উদযাপন দিনের একজন, মোট এই তেরোজন সধবাকে ওইভাবে পা ধুইয়ে, আলতা, নোয়া, রুলি এবং নতুন শাড়ি পরিয়ে কলাপাতায় মাছ, ভাত, পায়েস খাওয়াতে হয়। তারপর সধবাদের প্রত্যেককে মাথা ঘষা, আলতা, সিঁদুর, সিঁদুরচুপড়ি এবং সাধ্য অনুযায়ী দক্ষিণা দিতে হয়। যাকে দিয়ে প্রথম এই ব্রত নেওয়া হয়, তাকে অতিরিক্ত একখানি শাড়ি ও গামছা, সোনার নোয়া, সিঁদুর কৌটো এবং অন্যান্য সধবাদের চাইতে কিছু বেশি দক্ষিণা দিতে হয়।

এয়ো-সংক্রান্তি ব্রত সমাপ্ত।

গুপ্তধন ব্রত

চড়ক-সংক্রান্তির দিন ব্রাহ্মণের কাছে এই ব্রত নিতে হয়। চার বছর নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রত করতে হয়। চড়ক-সংক্রান্তির দিন একটি দু-আনি মিষ্টির মধ্যে পুরে একটি পৈতের সঙ্গে ব্রাহ্মণের হাতে দিতে হবে। তারপর বৈশাখ মাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতিদিনই ওইভাবে মিষ্টির মধ্যে দু-আনি পুরে পৈতের সঙ্গে নিত্য-নতুন এক একজন ব্রাহ্মণের হাতে দিতে হবে।

দ্বিতীয় বছর প্রতিদিন ওইভাবে একটি সিকি, তৃতীয় বছরে একটি আধুলি, এবং চতুর্থ বছরে একটি করে টাকা প্রতিদিন দিতে হবে। চতুর্থ বছরে বৈশাখ-সংক্রান্তির দিন চারজন ব্রাহ্মণকে সাধ মিটিয়ে আহার করিয়ে তাঁদের প্রত্যেককে সাধ্যমতো ভোজন দক্ষিণা, ধুতি, উড়ুনি, পৈতে ও হরীতকী দিতে হবে। যাঁর কাছ থেকে প্রথম ব্রত নেওয়া যায় তাঁকেও সে দিন পাখা, ছাতা, খড়ম, গামছা, পৈতে, মিষ্টি, হরীতকী, ধুতি ও উড়ুনি এবং একটি রুপোর টাকা দিতে হয়।

গুপ্তধন ব্রত সমাপ্ত।

ষোলো-কলা ব্রত

মাত্র একবছর ষোলো-কলা ব্রত করতে হয়। চৈত্রসংক্রান্তির দিন ষোলোটি কলার একটি ছড়া, পৈতে, হরীতকি, মিষ্টি ও সাধ্যমতো দক্ষিণা ব্রাহ্মণকে দিতে হবে। তারপর বৈশাখ-সংক্রান্তিতে দুইজন, জ্যৈষ্ঠ-সংক্রান্তিতে তিনজন, এইভাবে পর বছর বৈশাখ-সংক্রান্তি অবধি তেরোজন ব্রাহ্মণকে এক একটি ষোলো কলার অখন্ড ছড়া, পৈতে, হরীতকি, মিষ্টি ও দক্ষিণা দিতে হবে। ওইদিন ব্রত উদযাপনের সময় ওই তেরোজন ব্রাহ্মণকে পরিতুষ্ট করে খাওয়াতে হবে এবং তাঁদের ভেতর বারোজনকে ষোলটি কলার এক একটি অখন্ড ছড়া, পৈতে; হরীতকী ও মিষ্টি দিতে হবে। যাঁর কাছে প্রথম ব্রত নেওয়া হয় তাঁকে ষোলোটি সোনা অথবা রুপোর একছড়া কলা, পৈতে, হরীতকী, পান, সুপুরি, ধুতি, উড়ুনি, গামছা, মিষ্টি এবং রুপোর টাকা দিতে হবে।

ষোলো-কলা ব্রত সমাপ্ত।

রূপ-হলুদ ব্রত

এই ব্রত করলে মেয়েরা রূপবতী হয়। একজন এয়োর কাছে এই ব্রত নিতে হয় এবং একাদিক্রমে চার বছর করতে হয়।

প্রথম বছর চড়ক-সংক্রান্তির দিন শুরু করে বৈশাখ সংক্রান্তি অবধি প্রতিদিন সকালে একজন এয়োর কপালে বাটা হলুদ ছুঁইয়ে প্রতিদিন বিকেলে তার চুল বেঁধে সিঁথি ও কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয় বছর এইভাবে প্রতিদিন দু-জন, তৃতীয় বছর তিনজন এবং চতুর্থ বছর প্রতিদিন চারজন এয়োকে ওই ভাবে হলুদ ছুঁইয়ে চুল বেঁধে তাদের কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিতে হবে। চতুর্থ বছর ওই চারজন এয়োকে সুগন্ধ তেল দিয়ে চুল বেঁধে, কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে, নতুন কাপড় পরিয়ে পরিতৃপ্ত করে আহার করাতে হবে এবং প্রত্যেককে হলুদে ছোপানো গামছা, কড়, সিঁদুর-চুপড়ি, আলতা, মাথাঘষা, মিষ্টি ও সাধ্যমতো দক্ষিণা দিতে হবে। যার কাছ থেকে প্রথম ব্রত নেওয়া হয় তাকে হলুদে ছোপানো লালপাড় শাড়ি একখানি, আরশি, চিরুনি, রুপোর সিঁদুর কৌটো, পাখা এবং একটি রুপোর টাকা দিতে হবে।

রূপ-হলুদ ব্রত সমাপ্ত।

অক্ষয়-সিঁদুর ব্রত

অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন একজন এয়োর কাছ থেকে ব্রত নিতে হবে। এই ব্রতও চার বছর করতে হয়। প্রথম বছর অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন একজন এয়োর কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে তার হাতে নোয়া, কড়, একপাতা সিঁদুর, আলতা, পান, সুপুরি, মিষ্টি ও সাধ্য অনুযায়ী কিছু পয়সা দিতে হবে।

দ্বিতীয় বছর দুইজন, তৃতীয় বছর তিনজন ও চতুর্থ বছরে চারজন এয়োকে ওইভাবে দিতে হবে। ব্রত উদযাপনের বছর অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন চারজন এয়োকেই পা ধুইয়ে আলতা পরিয়ে, চুল বেঁধে, সিঁদুর ও নতুন কাপড় পরিয়ে পরিতৃপ্ত করে আহার করাতে হবে এবং প্রত্যেককে কড়, রুলি, আলতা, পান, সুপুরি, মাথাঘষা, সিঁদুর-চুপড়ি, সিঁদুর গন্ধদ্রব্য ও সাধ্যমতো পয়সা দিতে হবে। যার কাছে প্রথম ব্রত নেওয়া হয় তাকে সোনার নোয়া, রুপোর সিঁদুর কৌটো, আরশি, চিরুনি, পাখা, নতুন শাড়ি, আলতা, সিঁদুর ও একটি রুপোর টাকা দিতে হবে।

অক্ষয়-সিঁদুর ব্রত সমাপ্ত।

অক্ষয়-ফল ব্রত

এই ব্রতও চার বছর করতে হয়। প্রথম বছর অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন ব্রাহ্মণকে সশিস ডাব, আম, বেল, কলা, হরীতকী, মিষ্টি, পৈতে ও সাধ্য অনুযায়ী দক্ষিণা দিতে হবে। দ্বিতীয় বছর দু-জন, তৃতীয় বছর তিনজন ও চতুর্থ বছর চারজন ব্রাহ্মণকে ওইভাবে অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন ফল, মিষ্টি ইত্যদি দিতে হবে। ব্রত উদযাপনের দিন চারজন ব্রাহ্মণকে পরিতুষ্ট করে আহার করিয়ে তাঁদের ধুতি, উড়ুনি, পৈতে, খড়ম, ছাতা ও দক্ষিণা দিতে হবে। প্রথম বছর যাঁর কাছ থেকে ব্রত নেওয়া হয় তাঁকে ব্রত উদযাপনের দিন ৫টি সোনা অথবা রুপোর ফল এবং একটি রুপোর টাকা দক্ষিণা দিতে হবে।

অক্ষয়-ফল ব্রত সমাপ্ত।

অক্ষয়-কুমারী ব্রত

এই ব্রত করলে ভগবতী অত্যন্ত তুষ্টা হন। ব্রত চার বছর করতে হয়। প্রথম বছর অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন একটি কুমারী কন্যার পা ধুইয়ে আলতা ও রঙিন বা পাছাপেড়ে নতুন শাড়ি পরিয়ে চুল বেঁধে চন্দন, সিঁদুর ও খয়েরের তিনটি টিপ তার কপালে দিয়ে আলপনা দেওয়া পিঁড়িতে তাকে বসিয়ে পরিতৃপ্ত করে আহার করাতে হবে। দ্বিতীয় বছর ওই দিনে দুজন, তৃতীয় বছর তিনজন ও চতুর্থ বছর চারজন ‘কুমারী’ করতে হবে। তারপর ওই চারজন কুমারীকে আগের মতো সাজিয়ে পিঁড়িতে বসিয়ে তাদের হাতে শাঁখা, আলতা, আরশি, চিরুনি, পাখা, মাথাঘষা ও গন্ধদ্রব্য দান করে তাদের সাধ মিটিয়ে আহার করিয়ে দক্ষিণা দিতে হবে। প্রথম বছরের কুমারীটিকে অতিরিক্ত একখানি শাড়ি অথবা গামছা এবং একটি রুপোর টাকা দিতে হবে।

অক্ষয়-কুমারী ব্রত সমাপ্ত।

মধু-সংক্রান্তি ব্রত

কাঁসা, পিতল বা পাথরের একটি বাটি, একটি পৈতে, মিষ্টি, আধপোয়া পরিমাণ মধু ও দক্ষিণা একজন ব্রাহ্মণকে দিয়ে এই ব্রত চড়ক-সংক্রান্তির দিন নিতে হয়। পর পর ১৪টি সংক্রান্তি ব্রত করতে হয়। চৈত্র-সংক্রান্তিতে একজন, বৈশাখে দুইজন, জ্যৈষ্ঠে তিনজন, এইভাবে প্রতি সংক্রান্তিতে এক একজন ব্রাহ্মণের সংখ্যা বাড়বে। পর বছর বৈশাখ মাসের বিষ্ণুপদী সংক্রান্তির দিন চৌদ্দজন ব্রাহ্মণকে খাইয়ে তেরোটি কাঁসা, পিতল, অথবা পাথরের বাটির প্রতিটিতে একপোয়া পরিমাণ মধু দিয়ে, হরীতকী, মিষ্টি, পৈতে ও ভোজন দক্ষিণা তেরোজন ব্রাহ্মণকে দিতে হবে।

যাঁর কাছে প্রথম ব্রত গ্রহণ করা হয় তাঁকে একটি রুপোর মধুপূর্ণ বাটি, ধুতি, উড়ুনি, খড়ম, ছাতা, পৈতে, হরীতকী ও রুপোর টাকা দিয়ে ব্রত উদযাপন করতে হবে।

মধু-সংক্রান্তি ব্রত সমাপ্ত।

ফল-গছানো ব্রত

বিয়ের পর বছর চৈত্র-সংক্রান্তির দিন এই ব্রত নিতে হয়। চার বছর পর করতে হয় ব্রত উদযাপন।

প্রথম বছর চৈত্র-সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে বৈশাখ সংক্রান্তি অবধি নিত্য নতুন এক একজন ব্রাহ্মণকে মিষ্টি, সুপুরি ও সাধ্যমত দক্ষিণা দিয়ে প্রণাম করতে হবে।

দ্বিতীয় বছর কলা, তৃতীয় বছর আম ও চতুর্থ বছর ডাব দিতে হবে, অর্থাৎ প্রতি বছরই করতে হবে ফলের পরিবর্তন।

চতুর্থ বছর চড়ক-সংক্রান্তির দিন চারজন ব্রাহ্মণকে পরিতৃপ্ত করে খাইয়ে ধুতি, উড়ুনি, ছাতা, লাঠি, গামছা, খড়ম, সোনা বা রুপোর আম, ডাব, সুপুরি, কলা, পাখা ও দক্ষিণা দিতে হবে। অভাবে শুধুমাত্র যাঁকে দিয়ে ব্রত গ্রহণ করা হয় তাঁকে রুপোর আম, ডাব, সুপুরি, ধুতি, উড়ুনি, ছাতা, পাখা ও একটি রুপোর টাকা দেওয়া চলে। যাঁর কাছ থেকে প্রথম ব্রত নেওয়া হয়, ব্রত সাঙ্গ হওয়ার আগে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁরই বংশের যে-কোনো লোককে খাইয়ে তার হাতে ফল, বস্ত্র ও দক্ষিণা দিলেও চলে।

ব্রতকালের মধ্যে অশৌচ পড়লে অশৌচের শেষে একই দিনে ওই সময়ের ফল ইত্যাদি ব্রাহ্মণকে দেওয়া যাবে।

ফল-গছানো ব্রত সমাপ্ত।

নিত্য-সিঁদুর ব্রত

এই ব্রত চড়ক-সংক্রান্তিতে শুরু করে তেরোটি সংক্রান্তি করার পর বছর বৈশাখ-সংক্রান্তিতে উদযাপন করতে হয়।

চড়ক-সংক্রান্তির দিন এয়োর পা ধুইয়ে, চুল বেঁধে, পা ঘষে, সিঁদুর, আলতা দিয়ে দুটি গোটা সুপুরি আর পান এবং মিষ্টি দিয়ে প্রণাম করতে হবে।

চৈত্র-সংক্রান্তিতে একজন, বৈশাখে দুইজন, জ্যৈষ্ঠে তিনজন, এইভাবে চৈত্র অবধি তেরোজন এয়ো করতে হবে। তারপর বৈশাখের বিষ্ণুপদী সংক্রান্তিতে চৌদ্দজন এয়োকে একত্রিত করে ওইভাবে তাদের পা ধুইয়ে, চুল বেঁধে, আলতা, সিঁদুর, মাথাঘষা দিয়ে লাল পেড়ে শাড়ি পরিয়ে, নোয়া, রুলি, সিঁদুর চুপড়ি হাতে দিয়ে আলপনা দেওয়া পিঁড়িতে বসিয়ে মাছ, ভাত মিষ্টান্ন খাইয়ে ভোজন-দক্ষিণা দিতে হবে। অসমর্থ হলে যাকে দিয়ে ব্রত নেওয়া হয় তাকেই শুধু শাড়ি দিলে চলবে।

নিত্য-সিঁদুর ব্রত সমাপ্ত।

নিৎ-সিঁদুর ব্রত

এই ব্রত তিন বছর করতে হয়। চতুর্থ বছর বিষ্ণুপদী সংক্রান্তিতে হয় ব্রত উদযাপন। চড়ক-সংক্রান্তির দিন শুরু করে বৈশাখ-সংক্রান্তি অবধি প্রতিদিন সকালে সধবার কপালে সিঁদুর দিয়ে বিকেলে তার হাতে মিষ্টি দিতে হবে। এইভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর করে চতুর্থ বছর বৈশাখ-সংক্রান্তির দিন চারজন সধবাকে পা ধুইয়ে আলতা, সিঁদুর পরিয়ে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াতে হবে এবং তাদের প্রত্যেককে দিতে হবে নোয়া, সিঁদুর-চুপড়ি, আরশি, চিরুনি, কড়, রুলি, সিঁদুর কৌটা, পাখা ও লালপাড় শাড়ি।

যাকে দিয়ে প্রথম ব্রত নেওয়া হয় তাকে সোনার নোয়া, রুপোর সিঁদুর কৌটা, আলতা, মাথাঘষা, সিঁদুর-চুপড়ি, শাঁখা, আরশি, চিরুনি, শাড়ি ও রুপোর টাকা দক্ষিণা দিতে হবে।

অক্ষম হলে অন্য এয়োদের শুধু দক্ষিণা, সিঁদুর-চুপড়ি, আলতা, মাথাঘষা ও মিষ্টি হাতে দিলেও চলবে।

নিৎ-সিঁদুর ব্রত সমাপ্ত।

নখছুটের ব্রত

কুমারী ও সধবাদের জন্য

এই ব্রত করতে হলে মাঘ মাসের সংক্রান্তি থেকে ফাল্গুন মাসের সংক্রান্তি অবধি নখ কাটা এবং চৈত্রমাস থেকে ব্রত করা অবধি তেলমাখা নিষেধ। ব্রতের জন্যে চাই একজন নাপতিনী, ঝামা, পাঁচকড়া কড়ি, পাঁচটি গোটা পান-সুপুরি, পাঁচখানি বাতাসা, পাঁচখানি হলুদ, পাঁচখানি গামছা, কলা, মধু, দুধ, আলতা, কালো রং করা পাট, পটল প্রভৃতি। চৈত্রের শুক্লা চতুর্থীতে ব্রত নিতে হয়। চার বছর পরপর কিংবা একসঙ্গেও চার বছরের ব্রত করা চলে।

চৈত্রের শুক্লাচতুর্থীতে নাপতিনী দিয়ে একটি সধবার নখ কাটিয়ে, ঝামা দিয়ে পা ঘষে, সিঁদুর পরিয়ে হলুদ, পাঁচকড়া কড়ি, পাঁচটি পান-সুপুরি, পাঁচখানি বাতাসা ও গামছা পাঁচখানি তার সামনে রেখে এবং তার পিঠের ময়লা তুলে একটি পুতুল তৈরি করতে হবে। তারপর যে ব্রত করবে তার নখ ও চুলের ডগা কেটে গামছার একখুঁটে বাঁধতে হবে। এয়োর পিঠে মধু দিয়ে পুতুল এঁকে তাকে পিঁড়িতে বসিয়ে সেই আঁকা পুতুলের চোখে একটি পটল ছুঁইয়ে বলতে হবে:

হয় যেন মোর পটল চেরা চোখ।

একটি পান দিয়ে এয়োর মুখ ঢেকে বলতে হবে:

পানের মতো হয় যেন মোর বদনখানি।

এয়োর আঙুল কলা দিয়ে মেপে বলতে হবে:

হয় যেন মোর আঙুল কলার মতো।

তারপর এয়োর চুলে পাট ছুঁইয়ে বলতে হবে:

মোর যেন হয় পাটের মতো দীঘল,
রেশমের মতো কোমল, ঘনকৃষ্ণ-কুঞ্চিত
চুলের গোছা।

তারপর ওইসব গামছার আর একটি খুঁটে বাঁধতে হবে। এইভাবে পরপর তিন বছর করতে হবে।

প্রথম বছর ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে, পিঁড়িতে বসিয়ে নানা রকমের মিষ্টি, ফুটকড়াই, মুড়কি, দ্বিতীয় বছর মিষ্টি, খই, দই, তৃতীয় বছর মিষ্টি, চিঁড়ে, মুড়কি, আর চতুর্থ বছর মিষ্টি, লুচি, নানারকম তরকারি আর মাছ এয়োকে খাওয়াতে হবে। খাওয়ার শেষে প্রদীপটি মাথায় নিয়ে নিজে জলে বিসর্জন দিতে হবে। তারপর এয়োদের নোয়া, সিঁদুর-চুপড়ি, কড়, আলতা, মাথাঘষা, আরশি, চিরুনি, পাখা, গামছা আর রুপোর টাকা দক্ষিণা দিতে হবে। চতুর্থ বছর চারজন এয়োকে লাল পেড়ে শাড়ি পরিয়ে পূব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ মুখে বসিয়ে আগেরই মতো অনুষ্ঠান করে এয়োদের খাওয়ার শেষে সেই ঘিয়ের প্রদীপ মাথায় করে জলে ডুব দিয়ে ব্রতের উদযাপন করতে হবে।

নখছুটের ব্রত সমাপ্ত।

সন্ধ্যামণির ব্রত

চড়ক-সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ-সংক্রান্তি অবধি চার বছর প্রতি সন্ধ্যায় এই ব্রত করতে হয়।

চার বছর ওই সময় বাড়ির ছাদ বা উঁচু কোনো জায়গায় উঠে একটি মাত্র তারা আকাশে দেখতে পেলেই সেই জায়গায় জলের গন্ডি দিতে হয়। তারপর সাতটি তারা দেখা গেলে সিঁদুর দিয়ে পুতুল এঁকে দূর্বা দিয়ে পুজো করতে হয়।

ব্রত উদযাপনের সময় সাতটি সোনার এবং রুপোর তারা নতুন বরকনের হাতে দিতে দিয়ে জলের পাত্র নিয়ে সন্ধ্যেবেলায় ছাত বা উঁচু কোনো জায়গায় দাঁড়াতে হবে। একটি তারা দেখামাত্র সেই জায়গায় জলের গন্ডি দিতে হবে। সাতটি তারা ওঠার পর গন্ডির মাঝখানে সিঁদুরের দুটি পুতুল এঁকে দূর্বা দিয়ে মন্ত্র বলে পুজো করতে হবে। সাতটি তারা না-দেখা অবধি কথা বলা নিষেধ।

মন্ত্র:

সন্ধ্যামণি সোনার তারা।
সন্ধ্যামণি জলের ঝারা।।
সন্ধ্যামণির পুজো করে কে?
সাত ভায়ের বোন হয় যে।।
আলো ধানের কালো পুতে—
জন্ম জন্ম যেন যায় এয়োতে।।

সন্ধ্যামণির ব্রত সমাপ্ত।

কলাছড়া ব্রত

এই ব্রত চার বছর করতে হয়। প্রতিবছর চড়ক-সংক্রান্তি থেকে শুরু করে প্রত্যহ বৈশাখ-সংক্রান্তি অবধি করতে হয়। প্রথম বছর একজন, দ্বিতীয় বছর দুইজন, এইভাবে শেষ বছর চারজন ব্রাহ্মণের হাতে প্রতিদিন একছড়া করে পাকাকলা, পান, সুপুরি, পৈতে, মিষ্টি ও কিছু দক্ষিণা দিতে হয়। শেষ বছর বৈশাখ-সংক্রান্তির দিন চারজন ব্রাহ্মণকে পরিতুষ্ট করে খাইয়ে তাদের তিনজনকে কাপড়, হরীতকী, পৈতে, মিষ্টি, পান-সুপুরি এক এক ছড়া কলা ও দক্ষিণা দিয়ে তুষ্ট করতে হয়।

যাঁর দ্বারা প্রথম ব্রত গ্রহণ করা হয় তাঁকে ধুতি, উড়ুনি, গামছা, খড়ম, পাখা, রুপোর টাকা ও একছড়া সোনার কলা দিতে হবে। ব্রত সাঙ্গ হওয়ার আগে তাঁর মৃত্যু হলে ওই সব তাঁর বংশের অন্য কাউকে দিলেও চলবে।

কলাছড়া ব্রত সমাপ্ত।

আদা-হলুদ ব্রত

এই ব্রত্যও চার বছর প্রতি চড়ক-সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ-সংক্রান্তি অবধি করতে হয়। প্রতিবারই একজন এয়োকে চৈত্র-সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ-সংক্রান্তি অবধি প্রত্যহ একমুঠো ধান ও ধনে, পাঁচখানি হলুদ, আদা এবং ছানার মিঠাই প্রত্যেকটি পাঁচটি করে, এবং পাঁচটি তামার পয়সা দিতে হবে। চতুর্থ বছর বৈশাখ-সংক্রান্তির দিন চারজন সধবাকে কড়, নোয়া, সিঁদুর-চুপড়ি, মাথাঘষা, আলতা, লাল পেড়ে শাড়ি দান করে তাদের পরিতৃপ্ত করে আহার করিয়ে দক্ষিণা দিতে হবে। যাকে দিয়ে প্রথম ব্রত নেওয়া হবে তাকে ওই সব ছাড়াও অতিরিক্ত রুপোর সিঁদুর কৌটা, সোনার নোয়া, চিরুনি, আরশি, পাখা, গামছা ও একটি রুপোর টাকা দিতে হবে।

আদা-হলুদ ব্রত সমাপ্ত।

অক্ষয়-ঘট ব্রত

এই ব্রত চার বছর করতে হবে। প্রথম বৎসর অক্ষয়-তৃতীয়ার দিন পিতলের কলসি বা তামার জলপূর্ণ ঘটে আম্রপল্লব, ফুলের মালা, সিঁদুর ফোঁটা, চন্দন লেপন করে তার ওপর ফল, মিষ্টি, পৈতে, পাখা ও পয়সা দিয়ে একজন ব্রাহ্মণকে দিতে হবে।

পরবছর দুজনকে এবং এইভাবে শেষ বছর চারজন ব্রাহ্মণকে দিতে হবে এবং শেষ বছর ওই চারজন ব্রাহ্মণকে আপ্যায়িত করে খাইয়ে ওই ভাবেই পূর্ণঘট চারটি ও অতিরিক্ত চারখানি ধুতি চারজনকে এবং একটি করে রুপোর টাকা দক্ষিণা দিতে হবে।

অশক্ত পক্ষে তিনজনকে মাটির কলসি এবং প্রথম যাঁকে দিয়ে ব্রত নেওয়া হবে তাঁকে পিতল বা তামার কলসি ওই সব জিনিসের সঙ্গে দিতে হবে।

অক্ষয়-ঘট ব্রত সমাপ্ত।

সৌভাগ্য-চতুর্থী ব্রত

শরৎকালে দেবীপক্ষের শুভ চতুর্থীর দিন এই ব্রত নিতে হয় এবং পরপর চার বছর পালন করে ব্রত উদযাপন করতে হয়।

সৌভাগ্য-চতুর্থীর কথা

এক রাজা, তাঁর ছিল দুই রানি। সুয়ো আর দুয়ো। দুয়োরানিকে ভালোবাসতেন না রাজা মোটেই। এমনকি তাঁর মুখ অবধি দেখতে চাইতেন না তিনি। মনের দুঃখে দুয়োরানি রাজবাড়ি ছেড়ে উঠলেন গিয়ে বাগানের এক গোয়ালঘরে। সেখানেই রইলেন তিনি মনের দুঃখ মনে চেপে। দুয়ো চলে যাওয়ায় সুয়োর আর আনন্দ ধরে না। আমোদ-আহ্লাদ নিয়েই সুয়ো থাকেন মেতে অষ্টপ্রহর। তবুও কিন্তু পারেন না সহ্য করতে রাজ্যের মাঝে দুয়োর অস্তিত্ব। সখীদের সঙ্গে পরামর্শ করে তাই স্থির করলেন সুয়ো রাজাকে হাত করে দুয়োকে বনবাসে পাঠাতে। প্রজাদের কিন্তু ছোটো বড়ো সবাই ভক্তি করতো বড়োরানিকে। ছোটোরানি ছিল তাদের দুচোখের বিষ।

এদিকে বড়োরানি যা পান কোনোরকমে তাই সেদ্ধ করে খান আর একলা ঘরে ছেড়া কাঁথায় শুয়ে নিজের দুঃখের কথা ভগবানকে জানান। কত কষ্টে কাটে তাঁর দিন। দাসী এসে একদিন বড়োরানিকে জানায় ছোটোরানির অভিসন্ধির কথা। শুনে সেদিন বড়োরানির বড়োই দুঃখ হল। তিনি আর রান্না করতে পারলেন না সেদিন। মনের দুঃখে ছেঁড়া কাঁথাখানার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগলেন। রানি কেঁদেই চলেছেন—বিরাম নেই। দিন যায়, সন্ধ্যে হয়, ওঠেন না তিনি—কেঁদেই চলেছেন। সারাদিন খাওয়া হয়নি—শরীর দুর্বল। রাত অনেক হয়ে গেল কিন্তু রানি উঠলেন না। কাঁদতে কাঁদতে শেষে ঘুমিয়ে পড়লেন। শেষরাতে স্বপ্ন দেখেন রানি, অপরূপ সুন্দরী এক মেয়ে এসে তাঁকে বলছে,—‘দুঃখ কেন রে তোর? ওঠ, কাঁদিসনে। এবার হবে তোর দুঃখের শেষ। আজ চতুর্থী। রাত পোহালে চতুর্থীর পারণ করিস—সব দুঃখ কেটে যাবে।’ কথায় যেন স্নেহ-মায়া উপচে পড়ছে—এমন মিষ্টিকথা শোনেননি রানি কোনোদিন। প্রাণ তাঁর জুড়িয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলেন রানি,—‘কে তুমি, মা? তোমার কথায় প্রাণ আমার জুড়িয়ে গেল। কিন্তু আমি তো পারণের কিছুই জানিনে, মা! বলে দাও কী আমায় করতে হবে।’ মেয়েটি বললে,—‘দেখ তোর এই গোয়ালের পেছনে ছাইগাদা থেকে দুখানা মানের পাতা এনে ধুয়ে তার একখানায় সব রকমের গয়নার ছবি পিটুলিগোলা দিয়ে এঁকে তাতে আতপচাপের নৈবেদ্য সাজিয়ে, আর অন্যখানায় ঘি দিয়ে ওই রকম গয়না এঁকে তাতে চিনির নৈবেদ্য সাজিয়ে একমনে মা দুর্গাকে ডেকে তাঁর পুজো করবি। তারপর আতপ চালের ভাত রান্না করে ঘি দিয়ে আঁকা পাতাখানায় ঢেলে সেই ভাত মা দুর্গাকে নিবেদন করে প্রসাদ খাবি। সেই এঁটো পাতা জলে ভাসিয়ে আঁচিয়ে আসবি। এতেই ফিরবে তোর ভাগ্য। মা দুর্গার আশীর্বাদ। এতেই হবে তোর চির সৌভাগ্যের উদয়।’

ব্রহ্মমুহূর্তে জেগে ওঠেন রানি। মা দুর্গাকে স্মরণ করে স্বপ্নের নির্দেশমতোই মানের পাতায় ভোগ নিবেদন করে প্রসাদ পেয়ে পাতা ভাসিয়ে আঁচিয়ে আসেন। এমনি ভাবেই দেবীপক্ষের শুভ চতুর্থীর পারণ করেন রানি তিন বছর। দুঃখের কিন্তু অবসান হয় না। রানি হতাশ হন না। আরও একাগ্রমনে নিষ্ঠার সঙ্গে করে চলেন ব্রত। প্রাণ দিয়ে ডাকেন মা দুর্গাকে।

দিন যায়। রাজ্যে শুরু হয় মহামারি। রাজার হাতি শালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া মরতে থাকে। শুরু হয় রাজ্যময় চুরি, ডাকাতি, লুঠতরাজ। দাস-দাসী ছোটোরানির ব্যবহারে যায় চলে কাজ ছেড়ে। প্রজারা ঘোষণা করে বিদ্রোহ। দেশ হয় অরাজক।

রাজাকে মন্ত্রীর সঙ্গে যেতে হয় প্রজাদের কাছে। তারা সবাই বলে বড়োরানির কথা। বলে তারা, বড়োরানিই ছিলেন রাজ্যের লক্ষ্মী,—তারই অবর্তমানে নাকি হয়েছে রাজ্যের এই দশা। রাজাও ভাবেন সে কথা। ছোটোরানির ব্যাপারে রাজাকে প্রজারা স্ত্রৈণ বলে দেয় ধিক্কার। তারা আবেদন করে বড়োরানিকে ফিরিয়ে আনতে। ভাবতে ভাবতে রাজা ফিরে আসেন রাজ্যে।

আবার আসে শরৎকাল। কিন্তু রাজ্যের শ্রী ফেরে না। বড়োরানি এবারও করলেন মা দূর্গার পুজো—ভোগ দিলেন মানের পাতায়। প্রসাদ পেয়ে রানি পাতা জলে ভাসিয়ে আঁচিয়ে ঘাট থেকে উঠে আসতেই দেখতে পান রাজা তাঁর পথ আগলে রয়েছেন দাঁড়িয়ে। রানি রাজাকে গলবস্ত্র হয়ে প্রণাম করেন। রাজা আদর করে তাঁর হাত ধরে নিয়ে যান রাজপুরীতে।

বড়োরানি এসেছেন ফিরে—সবাই এলো ছুটে। দাস-দাসী, পাত্র-মিত্র-পরিজন সকলেই খুশি। রাজ্যময় আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। সুবৃষ্টি হল, মহামারি গেল, দেশে শান্তি ফিরে এল, বিদ্রোহী বশ্যতা স্বীকার করল,—বড়োরানির জয় জয়কার পড়ে গেল চারিদিকে।

ছোটোরানির কান্নাকাটি, আবেদন-নিবেদনে রাজা মোটেই ভ্রূক্ষেপ করলেন না। তাঁকে বনবাসে যেতে হল।

আবার এল শরৎ। বড়োরানি ঘটা করে মা দুর্গার পুজো করলেন আর প্রচার করে দিলেন দেশে দেশে সৌভাগ্য-চতুর্থী ব্রতের মাহাত্ম্য-কথা। দেখতে দেখতে সব দেশেই এই ব্রত প্রচার হল। ভক্তিমনে সকলে সৌভাগ্য-চতুর্থী ব্রত করতে লাগলেন।

সৌভাগ্য-চতুর্থী ব্রতকথা সমাপ্ত।

আদর-সিংহাসন ব্রত

চড়ক-সংক্রান্তির দিন সকালে সম্ভব হলে কোনো ব্রাহ্মণ দম্পতি অথবা একজন সধবা ও একজন ব্রাহ্মণকে বাড়িতে সমাদর করে ডেকে আনতে হবে। তারপর ব্রাহ্মণকে ধুতি, উড়ুনি, খড়ম, মালা, চন্দন ইত্যাদি উপহার দিয়ে তাঁকে পরিতুষ্ট করে খাইয়ে সাধ্যমতো দক্ষিণা দিতে হবে। ব্রাহ্মণি বা সধবাকে নতুন শাড়ি পরিয়ে, চুল বেঁধে, সিঁদুর, চন্দন ও আলতা দিয়ে সাজিয়ে, সন্তুষ্ট করে খাইয়ে তাকে সিঁদুর চুপড়ি, নোয়া, রুলি, আরশি, চিরুনি, আলতা, মাথাঘষা, মিষ্টি ইত্যাদি হাতে দিতে হবে। বিকেলে বা সন্ধ্যেবেলায় তাঁদের দুজনেরই বাড়িতে ফল, মিষ্টি, দুধ ইত্যাদি পাঠাতে হবে। এইভাবে বৈশাখ মাসে প্রতিদিন করতে হবে। এই ব্রত চার বছর করতে হয়। প্রথম বছর একজন করে ব্রাহ্মণ ও সধবা, দ্বিতীয় বছর দুজন করে, তৃতীয় বছর তিনজন করে এবং চতুর্থ বছর চারজন করে ব্রাহ্মণ ও সধবাকে ওই ভাবে দিতে হবে।

চতুর্থ বছর চারজন সধবাকে ওই ভাবে সিঁদুর চন্দন দিয়ে লালপেড়ে শাড়ি পরিয়ে দিনের বেলায় খাওয়াতে হবে এবং তাদের প্রত্যেককে শাড়ি, গামছা, সিঁদুর চুপড়ি, সিঁদুর কৌটা, নোয়া, কড়, রুলি, মাথাঘষা, আলতা, আরশি, চিরুনি, মালা ও মিষ্টি দিতে হবে। ব্রাহ্মণ চারজনকে পরিতুষ্ট করে খাইয়ে তাঁদের ধুতি, উড়ুনি, গামছা, ছাতা, মালা, চন্দন, ফল, মিষ্টি, হরীতকী, পৈতে ও দক্ষিণা দিতে হবে। এই দিন সধবা এবং ব্রাহ্মণ প্রত্যেককেই অন্তত একটি করে রুপোর টাকা দক্ষিণা দিতে হবে। সন্ধ্যেবেলায় এঁদের প্রত্যেকেরই বাড়িতে ফল, মিষ্টি, দুধ, দই, ক্ষীর, ননী ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে পাঠিয়ে ব্রত সাঙ্গ করতে হবে। এই ব্রত পালন করলে পরিবারস্থ সকলের আদর লাভ হয়। দেশভেদে কোথাও একজন ব্রাহ্মণ এবং একজন সধবাকে দিয়েও পরপর চার বছর ব্রত করা হয়ে থাকে।

আদর-সিংহাসন ব্রত সমাপ্ত।







Comments

Popular posts from this blog

Book 58 || Paradise Regained by John Milton

Book 60 || The Scarlet Pimpernel by Baroness Emmuska Orczy Orczy

Book 9 || Abraham Lincoln's First Inaugural Address by Abraham Lincoln